পর্যটন আকর্ষণ স্থান

শেখ আহমদ ফাহাদানের মাজার: আকর্ষণীয় স্থাপত্য ও অনন্য গম্বুজ।

শেখ আহমদ ফাহাদানের মাজার ইয়াজদের মানুষের কাছে সম্মানিত দুইজন সুফি সাধকের সমাধিস্থল। এই মাজারের ওপর একটি গম্বুজ রয়েছে, যার কোনো অনুরূপ উদাহরণ নেই।

ইরানিরা প্রাচীনকাল থেকেই তাঁদের জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্মান করে আসছেন। তাঁদের জন্য মাজার ও সমাধিসৌধ নির্মাণকে এসব মানুষের প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান এবং তাঁদের আদর্শ ও পথকে ভবিষ্যতেও অনুসরণ করার একটি স্মারক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এ কারণেই ইরানের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মাজার দেখা যায়। এর অনেকগুলোই বর্তমানে ঐতিহাসিক গুরুত্ব অর্জন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইয়াজদ শহরের শেখ আহমদ মাজার। এই স্থানটি শুধু এখানে সমাধিস্থ ব্যক্তির কারণে ইয়াজদের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি মরুভূমি অঞ্চলের মানুষের অনন্য স্থাপত্যশিল্পেরও একটি বিশেষ নিদর্শন। এই সমাধিতে গিয়ে এর সরল গম্বুজ এবং কাঁচা ইট দিয়ে নির্মিত জটিল ও মনোমুগ্ধকর নকশা ও কোণগুলো দেখা এক অনির্বচনীয় আনন্দের বিষয়।

শেখ আহমদ মাজার কোথায় অবস্থিত?

আপনি যদি ইয়াজদ শহর ও এর ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা করে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই ফাহাদান নামটির সঙ্গে পরিচিত। এটি ইয়াজদের অন্যতম প্রাচীন মহল্লা, যা শহরের ঐতিহাসিক নগরাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। আশপাশের আরও কয়েকটি মহল্লার সঙ্গে মিলিয়ে এই এলাকা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বলা হয়, সপ্তম হিজরি শতাব্দীতে (ত্রয়োদশ শতাব্দী), ইয়াজদের ওপর শাসনকারী আতাবক বংশের শাসক সুলতান কুতবউদ্দিন ইবনে আজিজউদ্দিন লাঙ্গার সময়ে ফাহাদান মহল্লাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি চিতাবাঘ পালনের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এ কারণে ফাহাদানকে ইউজদারান নামেও অভিহিত করা হতো। এর অর্থ হলো এমন একটি স্থান, যেখানে চিতাবাঘের প্রহরী ও পরিচর্যাকারীরা বসবাস করত।

শেখ আহমদ মাজারে কারা সমাধিস্থ আছেন?

এই মাজারে শেখ আহমদ ও শেখ মোহাম্মদ নামে দুই ভাই সমাধিস্থ আছেন। তাঁরা দুজনই ইয়াজদের বিখ্যাত সুফি সাধক হিসেবে পরিচিত। এই দুই ভাই ইসফানজের্দ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। বর্তমানে এই এলাকা আশকেজর জেলার অন্তর্ভুক্ত। একসময় এটি ইয়াজদের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি ছিল, কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে অজ্ঞাত কারণে পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং বর্তমানে এর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।

দুই ভাই শোমালি পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটি কাপড়ের মসৃণতা ও ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাচীন পেশা, যা বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জীবনের মাঝামাঝি সময়ে দুই ভাই ইয়াজদে চলে আসেন এবং সেখানকার মানুষের কাছে বিশেষ সম্মান অর্জন করেন।

শেখ আহমদ মাজারের বৈশিষ্ট্য ও কাঠামো

এই স্থাপনা-সমষ্টির অন্তর্ভুক্ত ছিল খিজর নামে একটি মসজিদ, যার কিছু ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়। মাজারের ভেতরে একটি মিহরাব রয়েছে, যেখানে পুরোনো টাইলসের কিছু অংশ এখনও চিহ্নিত করা যায়। মাজারের ভেতরের দেয়ালগুলো প্লাস্টার দিয়ে আবৃত। সেখানে নীলাভ-লাজওয়ার্দি রঙের অলংকরণ এবং কোরআনের আয়াত ও আল্লাহর বিভিন্ন নামসংবলিত শিলালিপি দেখা যায়।

মাজারটির একটি ইটের তৈরি জাঁকজমকপূর্ণ গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের ওপর মিনারের মতো একটি কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মসজিদ ও ইমামজাদার প্রচলিত গম্বুজের তুলনায় এই গম্বুজের বিশেষ আকৃতি ব্যবহারের কারণ হলো এখানে সমাধিস্থ ব্যক্তি একজন সুফি সাধক, কোনো ইমামজাদা নন। এই ধরনের কাঠামোর গম্বুজের একমাত্র বিদ্যমান উদাহরণ হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়। গম্বুজের নিচের অংশটি ৭ মিটার × ৮.৫ মিটার আয়তনের একটি স্থান ঢেকে রেখেছে। মাজারের দক্ষিণ দিকে একটি মিহরাব রয়েছে, যেখানে পুরোনো লাজওয়ার্দি টাইলসের কিছু অংশ এখনও অবশিষ্ট আছে। মাজারটির মাত্র একটি প্রবেশপথ রয়েছে, যা ছাদযুক্ত কাঁচা-মাটির একটি করিডোরের মাধ্যমে ভেতরের অংশের সঙ্গে যুক্ত। মাজারে থাকা একটি সমাধিফলক প্রায় ১০০ বছর আগে ১২ ইমামের মাজারে স্থানান্তর করে সেখানে স্থাপন করা হয়।

এছাড়া এই মাজারের আরেকটি কয়েক-খণ্ডে বিভক্ত সমাধিফলক তাকিউদ্দিন হাসান ইসফানজের্দি নামের এক ব্যক্তির। সেটিও এখান থেকে ইয়াজদের জামে মসজিদে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে এই ব্যক্তির পরিচয়, তাঁর মৃত্যুর সাল এবং শেখ আহমদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থাপনাটির অনেক অলংকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও এর স্থাপত্যিক মহিমা আজও আকর্ষণীয় ও দর্শনীয়।

শেখ আহমদ ফাহাদান মাজারের ইতিহাস

ঐতিহাসিক প্রমাণ অনুযায়ী, শেখ আহমদ ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেখ মোহাম্মদ ১৩৩৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এবং এই মাজারে তাঁদের দাফন করা হয়। এই স্থাপনা-সমষ্টিতে একটি মসজিদ ও খানকাহও ছিল। বর্তমানে সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো স্থাপনা-সমষ্টির মধ্যে এখন শুধু সেই ভবনটিই টিকে আছে, যার ওপর গম্বুজটি স্থাপিত। এই মাজারটিকে ইলখানি যুগের (ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী) স্থাপত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শেখ আহমদ ফাহাদান মাজারের জাতীয় নিবন্ধন

এই মাজারটি ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।