বাসমেনজচায় নদী তাবরিজে প্রবেশ করার পর দুটি শাখায় বিভক্ত হয়। উত্তরের শাখাটির নাম আসবেহরিজ এবং দক্ষিণের শাখাটিকে কুরিচায় বলা হয়। পরে এই দুটি শাখা পোল-এ সাঙ্গি এলাকায় একত্রিত হয়ে মেহরানরুদ নদী গঠন করে। মেহরানরুদ তাবরিজ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শহরটিতে প্রাণচাঞ্চল্য ও জীবনের সঞ্চার করে। নদীটি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে তাবরিজ শহরকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এর প্রবাহপথের শেষ প্রান্তে মেহরানরুদ আজিচায় নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
গত কয়েক দশকে এই নদীতে সারা বছর ধরে নিয়মিত পানি প্রবাহিত হয় না; কেবল বর্ষাকালেই এতে পানি প্রবাহিত হয়। তবে বর্তমানে এই নদীর তলদেশে সারা বছর পানি প্রবাহিত রাখার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তাবরিজের নদীগুলোর ওপর প্রাচীনকালেই বেশ কিছু সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে শহরের দুই পাশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়। এসব সেতুর কিছু ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান এবং শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজিচায় সেতু
সাফাভি আমলে (খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে) আজিচায় নদীর ওপর ১০৫ মিটার দীর্ঘ একটি প্রাচীন সেতু নির্মাণ করা হয়। কাজার আমলে, যখন ইরানের যুবরাজ আব্বাস মির্জা এই শহরে বসবাস করতেন, তখন সেতুটির সংস্কার করা হয়। সেতুটিতে ১৬টি খিলান রয়েছে এবং এর প্রস্থ প্রায় ৫ মিটার। আজিচায় সেতুটি ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
কারি সেতু
কারি সেতু একটি পাথরের তৈরি সেতু। তুর্কি ভাষায় ‘কারি’ শব্দের অর্থ ‘বৃদ্ধা নারী’। বলা হয়, সেতুটির নির্মাণে অর্থায়ন করেছিলেন একজন বৃদ্ধা। তিনি নিজের হজযাত্রার জন্য সঞ্চিত অর্থ এই সেতু নির্মাণে ব্যয় করেছিলেন, যাতে মানুষ মেহরানরুদ নদীর দুই তীরের মধ্যে সহজে যাতায়াত করতে পারে।
কিছু সূত্রে এই সেতুটিকে ‘চেরাগ সেতু’ নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই নামকরণের কারণ হলো, কাজার আমলে তাবরিজ শহরের প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির খুঁটিগুলো এই সেতুর ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। তাবরিজ শহরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কারি সেতু শহরটির অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই সেতু পুরোনো শেশগেলান ও শেতেরবান মহল্লাকে শহরের বড় বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সেতুটির দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার এবং প্রস্থ ৫ মিটার। ইট দিয়ে নির্মিত সেতুটির ৮টি খিলান বা তোরণ রয়েছে। খিলানগুলোর পাশাপাশি পাথরের তৈরি স্তম্ভ ও রেলিং সেতুটিকে একটি নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন রূপ দিয়েছে। পাহলভি আমলে পুরোনো সেতুটির পশ্চিম পাশে পথচারীদের চলাচলের জন্য একটি সরু সেতু নির্মাণ করা হয়। কারি সেতুটি ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
হাজি আজিম সেতু
এই সেতুটি মেহরানরুদ নদীর ওপর অবস্থিত। সেতুটির নির্মাণকাল পাহলভি যুগে (খ্রিস্টীয় বিংশ শতাব্দী)। তাবরিজের প্রাচীন সেতুগুলোর অন্যতম হিসেবে হাজি আজিম সেতু ২০০৬ সালে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
পোল-এ সাঙ্গি বা পাথরের সেতু
পাথরের সেতু তাবরিজের প্রাচীন সেতুগুলোর অন্যতম। এটি শেশগেলান মহল্লায়, আসবেহরিজ ও কুরিচায় নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। পাথরের সেতুটি তাবরিজের পুরোনো শহরাঞ্চলের উত্তর-পূর্ব দিকে এবং বর্তমান তাবরিজ শহরের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে।
সেতুর ভিত্তির ওপর স্থাপিত একটি শিলালিপিতে ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ সাল উল্লেখ রয়েছে। তবে সেতুটির মূল নির্মাণ আরও পুরোনো। এই শিলালিপিতে মূলত সেতুটির পুনর্নির্মাণের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে।
তাবরিজের জনগণের সাংবিধানিক বিপ্লব বা মাশরুতিয়াত আন্দোলনের (উনবিংশ শতাব্দী) সময় পাথরের সেতুটি সংবিধানপন্থী ও রাজতন্ত্রের সমর্থক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।
নাম থেকেই বোঝা যায়, সেতুটি নির্মাণের প্রধান উপকরণ হলো পাথর। তবে সেতুর পাঁচটি খিলানের ভেতরের অংশে ইটও ব্যবহার করা হয়েছে। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪৪ মিটার এবং প্রস্থ ৬৮০ সেন্টিমিটার বা ৬.৮ মিটার। প্রাচীন ইরানি স্থাপত্যে বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন সারুজ নামের ঐতিহ্যবাহী মসলা ব্যবহার করা সেতুটির দৃঢ়তার অন্যতম কারণ।
এই স্থাপনাটি ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাথরের সেতুটিতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে, ফলে রাতে সেতুটিকে দেখতে অত্যন্ত মনোরম লাগে। ইরানের সমকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী কবি পরভিন এতেসামি-র বাড়ি পাথরের সেতুর কাছেই অবস্থিত। এছাড়া সেতুর পাশে একই নামে, অর্থাৎ পাথরের মসজিদ, একটি মসজিদও রয়েছে। এই মসজিদটির নির্মাণকালও কাজার যুগের। মসজিদের স্তম্ভগুলো পাথরের তৈরি এবং দেয়াল নির্মাণে ইট ব্যবহার করা হয়েছে।
বিলানকুহ সেতু
বিলানকুহের সম্পূর্ণ পাথরের সেতুটি কাজার আমলে আসবেহরিজ নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়। অতীতে এই সেতুর চারপাশে অনেক বাগান ছিল। বর্তমানে সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি বিশাল ও প্রাচীন গাছ সেই পুরোনো বাগানগুলোর স্মৃতি বহন করছে। বিলানকুহ সেতুটি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।