বিশ্বের বৃহত্তম ইটের গম্বুজ সুলতানিয়েহ গম্বুজ কমপ্লেক্স পরিদর্শন
কোনো পর্যটন আকর্ষণ বা প্রাচীন স্থাপনাকে বিশ্বের মানুষের কাছে অধিক পরিচিত কোনো স্থাপনার সঙ্গে তুলনা করলে, সেটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হতে পারে। বিশেষ করে এমন পর্যটকদের জন্য, যারা অন্য কোনো দেশে ভ্রমণ করছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই সেই দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সমাজ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে কম জানেন। তবে কাজটি এতটা সহজ নয়। কারণ বিশ্বের অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনারই কোনো তুলনা বা সমকক্ষ নেই!
সুলতানিয়েহ গম্বুজ এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর উচ্চতার কারণে এটিকে ফ্লোরেন্সের সান্তা মারিয়া গির্জার গম্বুজ এবং ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া মসজিদের গম্বুজের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে এর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার কোনো নজির পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। এই দর্শনীয় গম্বুজটি প্রাচীন সুলতানিয়েহ শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত টিকে থাকা স্থাপনা এবং এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়ও নিবন্ধিত হয়েছে।
সুলতানিয়েহ গম্বুজের ইতিহাস
কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, সুলতানিয়েহ অঞ্চলে মানুষের বসতির ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে আরঘুন শাহ, যিনি ইলখানি সাম্রাজ্যের চতুর্থ শাসক ছিলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই অঞ্চলের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন এবং এর উন্নয়ন শুরু করেন। কারণ, ইলখানি শাসনের দুটি প্রধান ঘাঁটি মারভ ও মারাগেহ-এর মাঝামাঝি স্থানে সুলতানিয়েহ অবস্থিত ছিল।
ইলখানিরা ১২৫৬ থেকে ১৩৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইরান শাসন করেছিল। বিস্তীর্ণ চারণভূমি ও কৃষিজমির কারণে সুলতানিয়েহ ছিল সেনাবাহিনী ও সরকারি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান। আরঘুন শাহ এখানে একটি গ্রীষ্মকালীন আবাস নির্মাণ করেন। তাঁর পর সুলতান মুহাম্মদ খোদাবান্দে এবং সুলতান আবু সাঈদও সুলতানিয়েহর উন্নয়নে উদ্যোগ নেন। তবে গাজান খান সুলতানিয়েহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে তাবরিজকে কেন্দ্র করে তাঁর কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর ফলে শহরটির উন্নয়ন থমকে যায়।
সুলতানিয়েহর বিস্তার একসময় শহরটিকে ইরানের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করেছিল। এমনকি সাফাভি যুগ (১৬শ ও ১৭শ শতাব্দী) পর্যন্তও এটি কাফেলাগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল ছিল। বিপুল যাতায়াতের কারণে শহরের আশপাশে বেশ কয়েকটি কারাভানসরাই নির্মাণ করা হয়েছিল। সুলতানিয়েহর সমৃদ্ধির পেছনে সুলতান মুহাম্মদ খোদাবান্দে, যিনি উলজাইতু (ওলজাইতু) নামেও পরিচিত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইলখানি সাম্রাজ্যের অষ্টম শাসক ছিলেন এবং ১৩০৪ থেকে ১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইরান শাসন করেন। উলজাইতুর মা ছিলেন খ্রিষ্টান এবং জীবনের প্রথমদিকে তিনিও খ্রিষ্টধর্ম অনুসরণ করতেন। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
বর্তমানে সুলতানিয়েহ শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন হিসেবে পরিচিত সুলতানিয়েহ গম্বুজ একসময় শহরের সরকারি দুর্গ বা আর্গের কেন্দ্রস্থলে ছিল। দুর্গটির চারপাশে ১২ মিটার উচ্চতার একটি বিশাল প্রাচীর নির্মিত ছিল। প্রাচীরটি এতটাই প্রশস্ত ছিল যে চারজন অশ্বারোহী পাশাপাশি এর ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারত! প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার জন্য প্রাচীরের বাইরে একটি পরিখাও খনন করা হয়েছিল।
সুলতানিয়েহতে এই বিশাল সমাধিসৌধ নির্মাণের কারণ সম্পর্কে কেউ কেউ উলজাইতুর শিয়া ইমামদের প্রতি অনুরাগের কথা উল্লেখ করেছেন। বলা হয়, উলজাইতু একটি বিশাল সমাধিসৌধ নির্মাণ করে ইমাম আলী ও ইমাম হুসাইনের পবিত্র দেহাবশেষ সেখানে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু শিয়া আলেমদের বিরোধিতা এবং ইসলামে কবর খনন করে মরদেহ বের করার নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। তবে তিনি স্থাপনাটির নকশায় কিছু পরিবর্তন এনে এর নির্মাণকাজ চালিয়ে যান এবং নির্দেশ দেন যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ স্থাপনাটির ভূগর্ভস্থ কক্ষে সমাহিত করা হবে।
ইলখানি দরবারের বিখ্যাত মন্ত্রী ফজলুল্লাহ হামাদানি স্থাপনাটির নকশার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর সাইয়্যেদ আলি শাহ স্থপতি হিসেবে তিন হাজার শ্রমিকের তত্ত্বাবধান করেন এবং ১০ বছর ধরে নির্মাণকাজ চালিয়ে সুলতানিয়েহ গম্বুজের নির্মাণ সম্পন্ন করেন। এই সুন্দর স্থাপনার শুধু ইটের অলংকরণ ও ইটের কাজ সম্পন্ন করতেই তিন বছর সময় লেগেছিল।
সুলতানিয়েহ গম্বুজ ও সমাধিসৌধের স্থাপত্য
ইলখানি যুগে অনেক উঁচু ও বিশাল স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে অনেক স্থাপনা আজও টিকে আছে এবং মারাগেহের মতো শহরগুলোতে এর কিছু উদাহরণ দেখা যায়। তবে ইলখানি যুগের স্থপতিদের দক্ষতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সুলতানিয়েহ গম্বুজের সঙ্গে অন্য কোনো স্থাপনার তুলনা হয় না। সুলতানিয়েহ গম্বুজ বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ গম্বুজ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ইটের গম্বুজ। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রমাণ করে, সে সময় ইরানে স্থাপত্য এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিজ্ঞান, বিশেষ করে গণিত, কতটা উন্নত ছিল।
সুলতানিয়েহ সমাধিসৌধের চারপাশে আরও কয়েকটি স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল, যেগুলো সময়ের সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে। সুলতানিয়েহ সমাধিসৌধটি ইট ও সারুজ দিয়ে নির্মিত। স্থাপনাটির ভেতরে ইটের কাজ, প্লাস্টারের কাজ, শিলালিপি, টাইলসের কাজ ও চিত্রকর্মসহ বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ দেখা যায়। অভ্যন্তরের অলংকরণের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও সুলতানিয়েহ স্থাপনা পরিদর্শন করলে আজও দর্শনার্থীরা বিস্মিত হন। স্থাপনাটির নকশা আয়তাকার এবং এতে কয়েকটি প্রধান অংশ রয়েছে:
গম্বুজকক্ষ
এই অংশটি অষ্টভুজাকৃতির এবং এর প্রতিটি পাশে একটি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই আটটি দরজা বেহেশতের আটটি দরজার প্রতীক। গম্বুজকক্ষে ইলখানি যুগের স্থাপত্যে ব্যবহৃত সবচেয়ে সুন্দর অলংকরণগুলোর কয়েকটি দেখা যায়। ভবনের ওপরের অংশে প্রতিটি পাশে তিনটি করে কক্ষ রয়েছে এবং প্রতিটি কক্ষে বাইরে মুখ করা একটি করে জানালা রয়েছে। কক্ষগুলোর ছাদে প্লাস্টারের কারুকাজ ও রঙিন ইটের অলংকরণ রয়েছে। নিচতলা থেকে সিঁড়ির মাধ্যমে এসব কক্ষে যাওয়া যায়। প্রথম তলায় একটি উঁচু খিলানসহ বড় মিহরাব রয়েছে। এতে কোরআনের আয়াত উঁচু করে খোদাই করা হয়েছে। সাদা ও স্বচ্ছ মার্বেল পাথর দিয়ে ভবনের মেঝে সাজানো হয়েছে, যা এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গম্বুজটির উচ্চতা ৪৮.৫ মিটার এবং ব্যাস প্রায় ২৫.৫ মিটার। এত বিশাল গম্বুজের ওজন আনুমানিক ২০০ টন। এত বিপুল ওজন বহন করার জন্য স্থাপনার বিভিন্ন অংশে দাঁতযুক্ত কাঠের বিম ব্যবহার করে কাঠামোর অংশগুলো পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে জোড়া দেওয়া হয়েছে। এ কাজে পাইন কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। স্থাপনাটির ভিত্তি মাটির সর্বোচ্চ ৯০ সেন্টিমিটার গভীরে প্রোথিত। তা সত্ত্বেও কয়েক শতাব্দী ধরে সুলতানিয়েহ গম্বুজ বহু বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়েছে এবং এখনো অটুট রয়েছে।
তুরবতখানা
এই অংশটি গম্বুজকক্ষের দক্ষিণ পাশে সংযুক্ত। ধারণা করা হয়, গম্বুজ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর তুরবতখানা নির্মিত হয়েছিল।
একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, উলজাইতু যখন ইমামদের পবিত্র দেহাবশেষ এখানে স্থানান্তরের আশা ছেড়ে দেন, তখন তাঁদের সমাধির মাটি ব্যবহার করে তুরবতখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এই অংশের বিভিন্ন স্থানে ইমাম হুসাইনের সমাধির মাটি ব্যবহার করে থুলুথ ও কুফি লিপিতে পবিত্র কোরআনের কয়েকটি সূরা লেখা হয়েছে। তুরবতখানা সোনালি টাইলস দিয়ে সজ্জিত। অতীতে এই অংশে তামা ও সোনা দিয়ে তৈরি একটি বড় দরজা ছিল, তবে বর্তমানে তার কোনো চিহ্ন দেখা যায় না।
সারদাব
তুরবতখানার নিচে একটি স্থান রয়েছে, যাকে সারদাব বলা হয়। ইলখানিরা মৃতদের সারদাবে সমাধিস্থ করত।
যদিও এই অংশে বর্তমানে কোনো কবরের চিহ্ন নেই, তবুও কেউ কেউ মনে করেন, ইলখানি আমলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তাঁদের মধ্যে সুলতান মুহাম্মদ খোদাবান্দেও, এখানে সমাধিস্থ রয়েছেন।সারদাবের ভেতরে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত কয়েকটি জটিল করিডর নির্মাণ করা হয়েছে।
সুলতানিয়েহ গম্বুজের মিনারগুলো
সুলতানিয়েহ গম্বুজের অষ্টভুজাকার স্থাপনাটির চার কোণে মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। এই মিনারগুলো গম্বুজটিকে ঘিরে রেখেছে এবং এগুলোতে খুব বেশি অলংকরণ দেখা না গেলেও, কমপ্লেক্সের নীল গম্বুজের সঙ্গে এগুলো সুন্দরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও মিনার সাধারণত আজান দেওয়া, ঘোষণা প্রচার এবং প্রহরী বা পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতো, তবে এই মিনারগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গম্বুজটির ওজন অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এটি পাশের দিকে হেলে পড়ার বা সরে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারণে গম্বুজটি যাতে ধসে না পড়ে, সেই উদ্দেশ্যেই মিনারগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। শত শত বছর ধরে মিনারগুলোর একটি বড় অংশ ধসে পড়েছে। তারপরও এগুলো তাদের মূল দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছে এবং গম্বুজটিকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে।
সুলতানিয়েহ গম্বুজ কোথায় অবস্থিত?
প্রাচীন সুলতানিয়েহ শহর ও সমাধিসৌধ, যা সাধারণত “সুলতানিয়েহ গম্বুজ” নামে বেশি পরিচিত, জাঞ্জান শহরের ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। জাঞ্জান–কাজভিন সড়ক এই ঐতিহাসিক স্থাপনার কাছ দিয়ে চলে গেছে।
সুলতানিয়েহ গম্বুজের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
“সুলতানিয়েহ” ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। এছাড়া ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সুলতানিয়েহ ছিল ইরানের সপ্তম নিদর্শন, যা ইউনেস্কোর এই তালিকায় স্থান পায়।
| বিশ্বের বৃহত্তম ইটের গম্বুজ সুলতানিয়েহ গম্বুজ কমপ্লেক্স পরিদর্শন | |
| জাঞ্জন | |
| সোলতানিয়াহ | |
| Registration | Unesco, |







