এজেন্সি
ইসফাহানের জামে মসজিদের অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের এক ঝলক।

ইসফাহানের জামে মসজিদের অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের এক ঝলক।

ইসফাহানের জামে মসজিদের অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের এক ঝলক।

বিশ্বজুড়ে এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা খুব কমই পাওয়া যায়, যেখানে কোনো একটি দেশের বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় দেখা যায়। তবে ইসফাহানের জামে মসজিদ, যা জামে আতীক মসজিদ এবং জুমা মসজিদ নামেও পরিচিত, বিভিন্ন যুগের ইরানি স্থাপত্যকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই মূল্যবান স্থাপনাটি, যা ইরানের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে, ইরানি-ইসলামি স্থাপত্যের ইতিহাসের এক অমূল্য ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিঃসন্দেহে, এমন অনন্য স্থাপনা পরিদর্শন স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং বিশেষ ও স্মরণীয় ঐতিহাসিক নিদর্শনের অনুরাগীদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে।

ইসফাহানের জামে মসজিদের ইতিহাস

ঐতিহাসিকদের মতে, ইসফাহান শহর গড়ে ওঠার আগে এই অঞ্চলকে সেপাহান নামে ডাকা হতো। সেপাহান ছিল জায়ান্দে রুদ নদীর তীরে অবস্থিত ছোট ছোট গ্রামগুলোর একটি সমষ্টি। এই মসজিদের মূল ভিত্তি আনুমানিক ৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইয়াভান নামের একটি গ্রামে স্থাপিত হয়েছিল, যা ওই গ্রামসমষ্টির কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল। সে সময় জায়ান্দে রুদ নদী থেকে বের হওয়া একটি খাল মসজিদের প্রাঙ্গণের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। পরবর্তীতে সেই খালের অবশিষ্টাংশ প্রাঙ্গণের পাথরের মেঝের নিচে চাপা পড়ে যায় এবং বর্তমানে তার কোনো চিহ্ন দেখা যায় না।

৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খিলাফতের তৎকালীন খলিফা মুতাসিম মসজিদের প্রাথমিক স্থাপনা ধ্বংস করে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। এর ফলে কাঠের ছাদযুক্ত স্তম্ভনির্ভর একটি নতুন স্থাপনা তৈরি হয়, যার কিছু অংশ এখনো টিকে আছে। এই সময় মসজিদের ভেতরে একটি গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিভিন্ন ইসলামি অঞ্চল থেকে সংগৃহীত বহু বই সেখানে সংরক্ষিত হয়।

আব্বাসীয় শাসনের দুর্বলতার পর ইসফাহানও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে। অবশেষে ৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে বুয়াইহি (আল বুয়াইহি) রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। এই সময়ে ইসফাহানের জামে মসজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল এর গ্রন্থাগারের ব্যাপক উন্নতি। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, এই গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার খণ্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এরপর ইসফাহানের জামে মসজিদে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে সেলজুক যুগে (১০৩৭ থেকে ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দ)। সেলজুক আমলের কিছু সময় ইসফাহান ছিল ইরানের রাজধানী। এই সময় স্থপতিরা মসজিদ নির্মাণে আরবীয় ঐতিহ্য থেকে সরে এসে চার ইওয়ানবিশিষ্ট একটি নতুন স্থাপত্যশৈলীর উদ্ভাবন করেন।

সেলজুক যুগের পর ইসফাহান আবার অস্থিরতার সময়ে প্রবেশ করে। এই সময় জামে মসজিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১১২১ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, যাতে মসজিদের মূল্যবান গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়ে যায়। মসজিদের উত্তর-পূর্ব অংশে থাকা একটি শিলালিপিতে এই অগ্নিকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী বছরগুলোতে মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করা হয়। ইরানে মঙ্গোল আক্রমণ এবং ইলখানি রাজবংশের প্রতিষ্ঠার (১২৫৬ থেকে ১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দ) পর ইসফাহানের প্রতি আবারও মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। এ সময় ইসফাহানের জামে মসজিদের পশ্চিম অংশে একটি মিহরাব নির্মাণ করা হয়। এই মিহরাব আজও বিদ্যমান এবং এতে পারস্যের গাঁথুনি শিল্প ও ক্যালিগ্রাফির উৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখা যায়। পরবর্তী যুগগুলোতে মসজিদের কাঠামোগত পরিবর্তন খুব বেশি হয়নি। মূলত এর অলংকরণ বৃদ্ধি এবং স্থাপত্যের কিছু অংশের সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ করা হয়েছে।

ইসফাহানের জামে মসজিদ ছিল ইসফাহান নগর অঞ্চলের বিকাশের প্রধান কেন্দ্র। ইসফাহান শহর প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগে বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মসজিদও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে নতুন নতুন অংশ যুক্ত হয়েছে। এই কারণে মসজিদটিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট যুগের স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; বরং এটি বহু শতাব্দীর ইরানি-ইসলামি স্থাপত্যের এক জীবন্ত ইতিহাস।



ইসফাহানের জামে মসজিদের প্রাচীন শাবেস্তান (নামাজের হল/ভূগর্ভস্থ প্রার্থনাকক্ষ)


প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসলাম-পূর্ব যুগের কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি স্তম্ভের ভিত্তি উল্লেখযোগ্য, যেখানে সাসানীয় যুগের নকশা খোদাই করা ছিল। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এসব আবিষ্কার থেকে বোঝা যায় যে ইসলাম আগমনের আগে এই স্থানে একটি অগ্নিমন্দির ছিল, যার ধ্বংসাবশেষের ওপর পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

ইসফাহানের জামে মসজিদের স্থাপত্য ও কাঠামো

ইসফাহানের জামে মসজিদের মোট আয়তন ১০৪০ বর্গমিটার। স্থাপনাটির মূল প্রাঙ্গণের আকার ৬০ × ৭০ মিটার। মসজিদের বিভিন্ন অংশের নকশায় বৃত্তাকার আকৃতির ব্যবহার এর অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য। তবে এর স্তম্ভগুলোর আড়াআড়ি অংশ বর্গাকার এবং সেগুলোর ওপর বিভিন্ন নকশা খোদাই করা রয়েছে।

মসজিদটিতে একাধিক গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে তাজ-উল-মুলক এবং নিজাম-উল-মুলক গম্বুজ দুটি প্রধান গম্বুজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দুটি গম্বুজ সেলজুক দরবারের দুই মন্ত্রীর নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে। বলা হয়, এই দুই ব্যক্তি একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে মসজিদের জন্য দুটি গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। এর মধ্যে নিজাম-উল-মুলক গম্বুজ দক্ষিণ ইওয়ানের ওপর অবস্থিত এবং অন্যটি অর্থাৎ তাজ-উল-মুলক গম্বুজ তার বিপরীত দিকে, মসজিদের উত্তর অংশে অবস্থিত। নিজাম-উল-মুলক গম্বুজকে সেলজুক যুগের স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গম্বুজ নির্মাণে ইট ও প্লাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, তাজ-উল-মুলক গম্বুজকে বিশেষভাবে আলাদা করে তুলেছে এর অভ্যন্তরের জ্যামিতিক নকশা। এই গম্বুজটি অন্যটির তুলনায় ছোট হলেও এর নির্মাণশৈলীতে অসাধারণ সূক্ষ্মতা লক্ষ্য করা যায়।

উভয় গম্বুজই একটি বেলনাকার ভিত্তির ওপর স্থাপিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর নিচের কাঠামো চারকোণা ভিত্তি থেকে পরিবর্তিত হয়ে আট ও ষোলকোণী আকার ধারণ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত বৃত্তাকার রূপে পরিণত হয়েছে।



ইসফাহানের জামে মসজিদের মুগ্ধকর টাইলসের কারুকাজ।

 

ইরানি-ইসলামি স্থাপত্যে কাশিকাজ (টাইলসের অলংকরণ) তার সর্বোচ্চ সৌন্দর্যে পৌঁছেছে। তবুও বলা যায়, ইসফাহানের জামে মসজিদ বিশ্বের অন্যতম সুন্দর টাইলস-সজ্জিত স্থাপত্যসমষ্টির অধিকারী।

এই মসজিদে চারটি ইওয়ান রয়েছে, এবং চারটিই সেলজুক যুগে নির্মিত হয়েছিল:

  • দক্ষিণ অংশের সাহেব ইওয়ান: দক্ষিণ ইওয়ানের আকার ১৩.৫ × ১৩.৮ মিটার। এখানে দুটি মিনারও রয়েছে, যেগুলোর উচ্চতা ৩৫ মিটার। ধারণা করা হয়, এগুলো সম্ভবত সাফাভি যুগে (১৬শ শতাব্দী) নির্মিত হয়েছিল।
  • উত্তর অংশের দরবেশ ইওয়ান: এর আকার ২১.৬ × ৯ মিটার। তাজ-উল-মুলক গম্বুজ ছাড়াও এর ওপর খসরভি নামে আরেকটি গম্বুজ নির্মিত হয়েছে। এই গম্বুজের নির্মাণকাল সাফাভি যুগের বলে মনে করা হয়।
  • পশ্চিম অংশের ওস্তাদ ইওয়ান: এই ইওয়ানটি প্রায় বর্গাকার, যার আকার ১২ মিটার। এখানে অসংখ্য শিলালিপি দেখা যায়। এই অংশেই শাবেস্তান এবং আলজায়তু মিহরাব অবস্থিত।
  • পূর্ব অংশের শগেরদ  ইওয়ান: এর আকার পশ্চিম ইওয়ানের মতোই। এই অংশে দুটি শাবেস্তান, একটি মিহরাব, একটি শাহনেশিন (অত্যন্ত সমৃদ্ধ অলংকরণযুক্ত কক্ষ, যা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রভাবশালী অতিথিদের অভ্যর্থনা ও থাকার জন্য ব্যবহৃত হতো) এবং একটি ধর্মীয় বিদ্যালয় রয়েছে।

ইসফাহানের জামে মসজিদের স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য এতটাই বিস্তৃত যে এটি ভালোভাবে পরিদর্শন করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়।

এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ইসফাহান শহরের কিয়াম স্কোয়ার, মোজলেসি সড়ক এবং গ্র্যান্ড বাজারের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। আগে বাজারের দিক থেকে মসজিদে প্রবেশের একটি পথ ছিল, তবে বর্তমানে স্থাপনাটির সুরক্ষার জন্য সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি সমাধিসৌধ রয়েছে, যেখানে আল্লামা মুহাম্মদ তাকি মাজলেসি এবং আল্লামা মুহাম্মদ বাকের মাজলেসিসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সমাহিত আছেন।

ইসফাহানের জামে মসজিদের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন

এই মসজিদটি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ইরানের অন্যতম প্রথম জাতীয় ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে নিবন্ধিত হয়। এছাড়া, ২০১২ সালে এই স্থাপনাটিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

 

ইসফাহানের জামে মসজিদের অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের এক ঝলক।
ইসফাহান
ইসফাহান
,
RegistrationUnesco,

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: