বাগ-এ আমির, তাবরিজে আমির কবিরের অবস্থানকালের স্মৃতিচিহ্ন
আমির কবির ছিলেন উনিশ শতকের ইরানের একজন প্রগতিশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি জীবনের একটি সময় তাবরিজে বসবাস করেছিলেন। বর্তমানে তাবরিজে বাগ-এ আমির বা আমির কবিরের বাগান নামে একটি বাগান রয়েছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বাগানটির এই নামকরণ করা হয়েছে।
আমির কবির কে ছিলেন?
মির্জা মোহাম্মদ তাকি খান ফারাহানি, যিনি আমির কবির নামে পরিচিত, ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হন। অল্প সময়ের এই জীবনে তিনি ইরানের জন্য এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন, যা তাঁকে এই দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। মোহাম্মদ তাকি ফারাহান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরেই জন্মেছিলেন কায়েম-মাকাম ফারাহানি, যিনি একসময় ইরানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই মোহাম্মদ তাকির বাবা কায়েম-মাকাম ফারাহানির বাড়িতে রাঁধুনি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। শৈশবেই মোহাম্মদ তাকি সে সময়ের রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হতো, তার সুযোগ পান। এর ফলে তাঁর অসাধারণ মেধা ও প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে তিনি সরকারি প্রশাসনে প্রবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।
আমির কবির মোহাম্মদ শাহের শাসনামলে তাঁর বাবার সঙ্গে তাবরিজে অবস্থান করতেন। সে সময় নাসেরউদ্দিন মির্জা ছিলেন ইরানের যুবরাজ ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ শাহের মৃত্যুর পর আমির কবির নাসেরউদ্দিন মির্জার সঙ্গে তেহরানে যান। পরবর্তীতে নাসেরউদ্দিন মির্জাই নাসেরউদ্দিন শাহ নামে পরিচিত হন এবং প্রায় অর্ধশতাব্দী ইরান শাসন করেন।
সে সময় মোহাম্মদ তাকি খান যুবরাজের প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তিনিই নাসেরউদ্দিন মির্জার তেহরান যাত্রার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। তেহরানে পৌঁছানোর পর নাসেরউদ্দিন শাহ দ্রুত মির্জা তাকি খানকে ইরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁকে আমির কবির উপাধি প্রদান করেন। প্রায় তিন বছর তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইরানের তৎকালীন নানা সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। তাঁর উদ্যোগের মধ্যে ছিল দারুলফুনুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ‘ভাকায়ে-এত্তেফাকিয়ে’ পত্রিকা প্রকাশ, দেশের অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারি অর্থ প্রদান ও ব্যয়ের নিয়ম-কানুন সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় উপাধি ও পদবি বাতিল, সামাজিক সংস্কার, সড়কপথে নিরাপত্তা বৃদ্ধি, শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তাবাহিনীকে সুসংগঠিত করা, ধর্মীয় কুসংস্কার ও ভ্রান্ত প্রথার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী করা।
আমির কবিরের কিছু সংস্কার ছিল সে সময়ের তুলনায় অত্যন্ত অগ্রসর চিন্তার পরিচায়ক। যেমন, রাজপরিবারের সদস্য ও দরবারিদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া এবং বিদেশি দেশগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বন্ধ করার উদ্যোগ। এসব পদক্ষেপের কারণে তিনি অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরাগভাজন হন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত নাসেরউদ্দিন শাহ তাঁকে পদচ্যুত করার এবং পরে হত্যার নির্দেশ দেন। আমির কবিরকে কাশানের ফিন গোসলখানায় হত্যা করা হয়। তবে বহু বছর পর নাসেরউদ্দিন শাহ নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে আমির কবিরকে হত্যা করা ছিল তাঁর একটি বড় ভুল। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না ইরান ইতিমধ্যেই তার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যোগ্য রাষ্ট্রনায়ককে হারিয়ে ফেলেছিল।
তাবরিজে আমির কবিরের বসবাস
কাজার শাসনামলে তাবরিজ ছিল ইরানের যুবরাজের আবাসস্থল। আমির কবির তাবরিজে থাকার সময় যুবরাজের বাসস্থান থেকে কিছুটা দূরে নিজের জন্য একটি বাড়ি ও বাগান নির্মাণ করেন। সে সময়ের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাবরিজ শহরের ভেতরেই বসবাস করতেন। তাই এই বাড়ি ও বাগানটি মূলত অবসর কাটানোর স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং আমির কবিরের অস্থায়ী আবাস হিসেবেও কাজে লাগত।
অতীতে এই স্থানটি বাগ-এ ভাজির নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে বাড়ি ও বাগানটি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকাটিও ভাজিরাবাদ নামে পরিচিত। আমির কবির যখন এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন, তখন এর আশপাশে কোনো আবাসিক বাড়ি ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাবরিজ শহর সম্প্রসারিত হওয়ায় বর্তমানে বাগ-এ আমির শহরেরই একটি অংশ হয়ে গেছে।
এই বাড়ি ও বাগানের কারণে এর দিকে যাওয়া সড়কটির নাম রাখা হয়েছে আমির কবির সড়ক। স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীও আমির কবিরের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁদের দোকানের নামে তাঁর নাম ব্যবহার করেছেন, যাতে ইরানের ইতিহাসে তাঁর মর্যাদাপূর্ণ অবদানের কথা স্মরণে থাকে। আমির কবির তেহরানে চলে যাওয়ার পর বাড়িটি আর ব্যবহার করা হয়নি। সময়ের সঙ্গে এর বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে বাড়ি ও বাগানের যে অংশটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেটি তার মূল কাঠামো ও ঐতিহ্যবাহী রূপ বজায় রেখে সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে বাগ-এ আমিরের সামগ্রিক চেহারা অনেকটা একটি আধুনিক পার্কের মতো। তবে এর মধ্যেও একটি কুশক বা ঐতিহ্যবাহী বাগানবাড়ি এবং প্রাচীন ইরানি বাগানের বৈশিষ্ট্য এখনো দেখা যায়।
বাগ-এ আমিরের জাতীয় ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
আমির কবিরের বাড়ি ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
| বাগ-এ আমির, তাবরিজে আমির কবিরের অবস্থানকালের স্মৃতিচিহ্ন | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| তাবরিজ | |
| Registration |







