এজেন্সি
বুশেহর: ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বন্দর।

বুশেহর: ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বন্দর।

বুশেহর: ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বন্দর।

বর্তমানে পারস্য উপসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং রপ্তানি অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সুন্দর উপসাগরটি ইতিহাসজুড়ে ইরানের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি প্রাচীনকাল থেকেই এর তীরে বিভিন্ন বন্দর গড়ে উঠেছিল।

বুশেহর এই বন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা আজও ইরানের বৃহত্তম উপকূলীয় শহরগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বুশেহরের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভূগোল

বুশেহর শহরকে একটি উপদ্বীপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ২ লক্ষ ২০ হাজারেরও বেশি জনসংখ্যার এই শহরটি বুশেহর প্রদেশের রাজধানী। এই প্রদেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে পারস্য উপসাগর অবস্থিত। মাছ ধরা, জাহাজ নির্মাণ এবং বড় আকারের বাণিজ্য এখানকার প্রধান পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি, এই প্রদেশের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে দক্ষিণ পার্স ও উত্তর পার্স গ্যাসক্ষেত্রে থাকা বিশাল তেল ও গ্যাসের মজুদের কারণে। এছাড়াও এই প্রদেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে বুশেহরকে "ইরানের জ্বালানি রাজধানী" নামেও অভিহিত করা হয়।

এই প্রদেশে দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর রয়েছে:

  • বুশেহর বন্দর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল;
  • পার্স এনার্জি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল।

বুশেহর শহরের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮ মিটার। জলবায়ুর দিক থেকে বুশেহরকে উষ্ণ ও অর্ধ-মরু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বুশেহরের আর্দ্র ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার কারণে শীত ও গ্রীষ্মে তাপমাত্রার খুব বেশি ওঠানামা দেখা যায় না।

বুশেহরের বিশেষ অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে এখানে উন্নত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এসব অবকাঠামো শহরটিতে ভ্রমণকে সহজ করেছে।বুশেহর বিমানবন্দর একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত এবং এটি ইরানের তিনটি প্রাচীন বিমানবন্দরের একটি। এখান থেকে নিয়মিতভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল করে। বিমানবন্দরটি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে (১২৯৮ হিজরি শামসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। তেহরান থেকে বুশেহরে আকাশপথে যেতে প্রায় ৯০ মিনিট সময় লাগে।

বর্তমানে বুশেহর বন্দরে সাতটি জেটি রয়েছে, যেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ১,১০০ মিটারের বেশি। এই বন্দর বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক, বিনোদনমূলক ও যাত্রীবাহী জাহাজ গ্রহণ করতে সক্ষম। এছাড়াও এই বন্দরে ১৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা রয়েছে এবং বছরে ৩০ লক্ষ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করা সম্ভব।বুশেহর বন্দরের জেটিগুলোর মধ্যে ওয়ালফজর জেটি মূলত যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়।


বুশেহরের ইতিহাস

বুশেহরের প্রাচীনত্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছর বলে ধারণা করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়ের প্রায় পুরোটা জুড়েই বুশেহর একটি কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে তার গুরুত্ব ধরে রেখেছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনগুলো এলামীয় যুগের (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ) সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ধারণা করা হয়, আর্দাশির বাবাকানের শাসনামলে (২২৪ থেকে ২৪২ খ্রিস্টাব্দ) এই শহরের বিস্তার ঘটে। এই কারণে কিছু ঐতিহাসিক উৎসে বুশেহরকে "রাম আর্দাশির" এবং "বোখত আর্দাশির" নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আধুনিক বুশেহর শহরের প্রতিষ্ঠা ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে (১১১৪ হিজরি শামসি) বলে মনে করা হয়। সেই সময় আল-মাজকুর বংশের আবুমেহরি শহরটি শাসন করতেন।

কাজার যুগে (ঊনবিংশ শতাব্দী) বুশেহর ছিল ইরানের প্রধানতম বন্দর। বলা হয়, সেই সময় এই শহরে ২০টি দেশ তাদের কনস্যুলেট স্থাপন করেছিল।

বুশেহর বন্দরের একটি ছবি — ১৯৭০-এর দশক 

বুশেহরের ঐতিহাসিক পটভূমি এই শহরকে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের অধিকারী করেছে। বুশেহরকে ইরানের প্রথম শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে পাথরের ছাপাখানা, বিদ্যুৎ শিল্প, বরফ তৈরির প্রযুক্তি এবং টেলিগ্রাফের প্রচলন হয়েছিল। বুশেহরের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে—রিশেহর (বুশেহরের প্রাচীনতম পাড়া), কাওয়াম জলাধার, এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বাড়িগুলো যেমন মালেক, গোলশন, কুটি, কাজি, আমিরিয়ে ও দেহদাশতি প্রাসাদ; এছাড়াও রয়েছে সাদাত বিদ্যালয়, ঐতিহাসিক বাজার, গোলেস্তান ও গোলশন ভবন এবং কোলাহফারাঙ্গি প্রাসাদ। বুশেহর শহরের ঐতিহাসিক এলাকা, যা আফশার যুগের (১৮শ শতাব্দী) সঙ্গে সম্পর্কিত, শহরের উত্তরাংশে অবস্থিত এবং এটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়েছে।

বুশেহর ভ্রমণের সময় আরও যেসব দর্শনীয় স্থান দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে—লবণ গম্বুজ, সিরাফের কবরস্থান, গোর দোখতার, শোগাব কবরস্থান, বোরাজান দুর্গ, খোরমুজ দুর্গ, আর্মেনীয় গির্জা, চল্লিশ ঘরের গুহা এবং জাফরেহ জেটি

এই শহরে বেশ কয়েকটি জাদুঘরও রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পারস্য উপসাগর আঞ্চলিক জাদুঘর। এটি দক্ষিণ ইরানের বৃহত্তম জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। রইস আলি দেলোয়ারি জাদুঘর প্রায় ২,৫০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে বুশেহরের ইতিহাস সম্পর্কিত তথ্যের পাশাপাশি এই শহরে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের সময়কার বিভিন্ন নথিপত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। পারস্য উপসাগর সামুদ্রিক জাদুঘরে জাহাজ, সামুদ্রিক মানচিত্র, নৌযান সম্পর্কিত সরঞ্জাম এবং সামুদ্রিক শিল্পের বিভিন্ন তথ্য দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হয়। বুশেহরের পর্যটন উপকূলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের বিনোদন ও সেবামূলক সুবিধা রয়েছে। উপকূলে কিছু সময় কাটানো এবং পারস্য উপসাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য শহরের সমুদ্রতীরবর্তী ক্যাফেগুলো একটি চমৎকার বিকল্প।

 

বুশেহর: ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বন্দর।
বুশেহর
বুশেহর
,Natural

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: