গোহররিজ কানাত: জোবার শহরের জীবনধারার প্রধান শিরা
কেরমান প্রদেশের জোবার শহরের জীবনযাত্রা ‘গোহররিজ কানাত’ (ভূগর্ভস্থ জলসঞ্চালন ব্যবস্থা)-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই কানাতটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। গোহররিজ কানাতের কারিগরি ও ঐতিহাসিক দিকগুলো বাদ দিলেও, এর সামাজিক গুরুত্বই এটিকে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
গোহররিজ কানাত কোথায় অবস্থিত?
জোবার পর্বত একই নামের শহরের দক্ষিণে অবস্থিত, যেখান থেকে গোহররিজ কানাতের উৎপত্তি হয়েছে। এই পর্বতের উচ্চতা ৪১৩৫ মিটার। জোবার শহর থেকে এর দৃশ্য বিশাল প্রাচীরের মতো খাড়া ঢাল ও অনমনীয় পাথুরে শৃঙ্গের কারণে অত্যন্ত মহিমান্বিত ও দৃঢ়প্রতাপপূর্ণ বলে মনে হয়। এই শহরটি কেরমান শহরের দক্ষিণে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জোবার একটি ছোট শহর, যার জনসংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এখনো গোহররিজ কানাত এই শহরের কৃষিকাজের জন্য পানির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
গোহররিজ জোবার কানাতের বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
গোহররিজ কানাতকে (ভূগর্ভস্থ জলসঞ্চালন ব্যবস্থা) কেন্দ্র করে একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতির ভিত্তিতে স্থানীয় মানুষ কানাতটিকে ‘শেশ মঘাসসেম’ (ছয় বিভাজক) নামেও অভিহিত করেন। এই নামের অর্থ হলো কানাতের পানিকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত করা। কানাতের পানি বণ্টনের এই পদ্ধতি ইরানে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তব উদাহরণ, যেখানে স্থানীয় জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিস্থিতিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই ছয়টি পানি-বিভাজনের মধ্যে একটি ‘মোল্লায়ি’ বা ‘মওলাই’ নামে পরিচিত, যা ওয়াক্ফ সম্পত্তির সেচ ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। আরও দুটি অংশ ‘জোবারি’ নামে পরিচিত ছিল, যা বাগানের সেচের কাজে ব্যবহৃত হতো। দুটি বিভাজন ‘দিওয়ানি’ নামে পরিচিত ছিল, যা সরকারি বাগান ও জমির সেচের জন্য ব্যবহৃত হতো। সর্বশেষ বিভাজনটি ছিল ‘বাজ’, যার পানি ক্রয়-বিক্রয় করা যেত।
বর্তমান সময়েও কানাতের পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা এই বিভাজন পদ্ধতির নিয়ম অনুসারেই পরিচালিত হয়, যা নির্দিষ্ট পানি-বণ্টন কেন্দ্রে (মঘসেম) সম্পন্ন হয়। জোবারের মানুষের মৌখিক সাহিত্য ও লোককথাতেও এই কানাত একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। স্থানীয় মানুষকে ঘিরে নানা গল্প ও কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘সাদা অন্ধ মাছ’-এর কাহিনি, যে মাছ কানাতের ভেতরে বাস করে এবং কেউ তার দিকে তাকালে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে বলে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়াও কেউ কেউ বলে থাকেন, কানাতের ভেতরে একটি ছোট সোনালি মাছ রয়েছে, যা এই কানাতের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হয়। গোহররিজ কানাতের মাধ্যমে জোবার পর্বত থেকে যে পানি প্রবাহিত হয়ে আসে, তা স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। এমনকি কেউ কেউ এই পানিকে পবিত্র বলেও মনে করেন। কানাতের পথে ‘সাহেব আল-জামান’ (ইমাম মাহদীর ) নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। কানাতের ৩৬তম কূপটি এই মসজিদের প্রাঙ্গণের মাঝখানে অবস্থিত এবং এটি ‘সাহেব আল-জামান কূপ’ (ইমাম মাহদীর কূপ) নামে পরিচিত। কূপের ভেতরে একটি সবুজ রঙের বাতি স্থাপন করা হয়েছে এবং এর ওপর একটি কাচের আবরণ দেওয়া হয়েছে, যাতে কূপটি একটি আধ্যাত্মিক আবহ লাভ করে এবং এই অঞ্চলের মানুষের কাছে কানাতের বিশেষ মর্যাদার প্রতিফলন ঘটে। কানাতের পানি স্বচ্ছ ও সুপেয় এবং এর ভূ-পৃষ্ঠে প্রবাহিত হওয়ার পথে বহু প্রাচীন বৃক্ষ জন্মেছে। এর কারণ হলো জোবার শহর ও এর বাগানগুলো জোবার পর্বতের খাড়া ঢালের নিকটে অবস্থিত। তবে এর পরও কানাতটির নির্মাণকৌশল অত্যন্ত জটিল এবং এর পথে বেশ কিছু তীক্ষ্ণ বাঁক দেখা যায়।
কানাত খননকারীরা (ফারসি: কুনাহা) কানাতের পথে মাটির গঠনে পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, কানাত খননের প্রযুক্তি কতটা উন্নত ও সূক্ষ্ম ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাতের কিছু অংশকে ‘কানাত জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সুদৃঢ় করা হয়েছে। সেখানে পরিদর্শনের মাধ্যমে কানাত খননকারীদের পরিশ্রম ও দক্ষতার কিছু নিদর্শন দেখা যায়। তাঁরা কানাত খননের জন্য অন্তত সাত ধরনের কোদাল বা খননযন্ত্র ব্যবহার করতেন। মাটির ওপর তাঁরা তির্যক, অনুভূমিক, উল্লম্ব বা সরাসরি আঘাত করতেন এবং আঘাতের শক্তিও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন করতেন, যাতে ছাদ ও পার্শ্বদেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়।
এছাড়াও কানাত খননকারীদের মধ্যে পানির ধরন সম্পর্কে নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাস ছিল। তাঁরা পানিকে দুই ধরনের ‘পুরুষ’ (নর) ও ‘নারী’ (মাদা) হিসেবে ভাগ করতেন। পানির ধরন অনুযায়ী খালের আকৃতিতেও পরিবর্তন আনা হতো এবং ঢাল এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো, যাতে পানির প্রবাহ খালের তলদেশ ক্ষয় করে না ফেলে। প্রায় দুই দশক আগে কানাতের পলি অপসারণ ও সংস্কারের সময় কয়েকটি স্থানে পানির প্রবাহপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল। যদিও এই কানাতের দৈর্ঘ্য ৩৫৫৬ মিটার, তবুও এর ছয়টি শাখায় মোট ১২৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গোহররিজ কানাত ইরানের একমাত্র কানাত, যার ছয়টি মাদার-কূপ (প্রধান উৎসকূপ) রয়েছে। এই প্রধান কূপগুলো পথে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত পানি-বণ্টন কেন্দ্রে পৌঁছায়। প্রায় ৬০ লিটার প্রতি সেকেন্ড প্রবাহক্ষমতাসম্পন্ন এই কানাত জোবারের প্রায় ৩৩০ হেক্টর কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করে।
এই কানাতটি সফাভি যুগে (ষোড়শ শতাব্দী) খনন করা হয়েছিল। গোহররিজ কানাতের প্রবেশপথের ভূগর্ভস্থ জলপ্রবেশ স্থানে (পায়াব) ঐতিহ্যবাহী নকশার একটি স্থাপনা দেখা যায়। এই পায়াবটি ভূমির ৫৩ মিটার গভীরে অবস্থিত। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পর্যটকদের সহজে কানাত পরিদর্শনের সুবিধার্থে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাতের জলাধার এলাকার ঐতিহাসিক পরিবেশও সংস্কার করা হয়েছে, যাতে পর্যটকদের উপস্থিতি ও কানাতের ব্যবহারিক গুরুত্ব বোঝার জন্য আরও উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়।
গোহররিজ জোবার কানাতের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি
গোহররিজ কানাত ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯৫ হিজরি শামসি) ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩৮৪ হিজরি শামসি) অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কানাত সম্মেলন এই কানাতকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত করার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। এই সম্মেলনের একটি স্মারক কানাতের একটি অংশে স্থাপন করা হয়েছে।
| গোহররিজ কানাত: জোবার শহরের জীবনধারার প্রধান শিরা | |
| কেরমান | |
| জোপার | |
| ,Natural | |
| Registration | Unesco, |







