এজেন্সি
রাফসানজানের হাজি আগা আলীর বাড়ি-অসাধারণ অভ্যন্তরীণ নকশাসহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা ইট (মাটির) নির্মিত স্থাপনা।

রাফসানজানের হাজি আগা আলীর বাড়ি-অসাধারণ অভ্যন্তরীণ নকশাসহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা ইট (মাটির) নির্মিত স্থাপনা।

রাফসানজানের হাজি আগা আলীর বাড়ি-অসাধারণ অভ্যন্তরীণ নকশাসহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা ইট (মাটির) নির্মিত স্থাপনা।

কেরমান প্রদেশ ইরানের অন্যতম ঐতিহাসিক অঞ্চল। এই প্রদেশে বহু প্রাচীন শহর রয়েছে, যেগুলো ইতিহাস ও মনোমুগ্ধকর ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য পরিচিত। রাফসানজান তাদের মধ্যে অন্যতম। শহরটি প্রদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং প্রাদেশিক রাজধানী কেরমান শহর থেকে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দূরে।

তেহরান থেকে ওমান সাগরের তীরবর্তী চবাহার পর্যন্ত বিস্তৃত ট্রানজিট মহাসড়কটি রাফসানজানের কাছ দিয়ে অতিক্রম করায়, এটি শহরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

রাফসানজান মূলত তার উৎকৃষ্ট মানের পেস্তা বাগানের জন্য সুপরিচিত। তবে এখানকার ঐতিহাসিক বাজার, আব-আনবার (প্রাচীন পানির সংরক্ষণাগার), মসজিদ, হাম্মাম, হোসেইনিয়া এবং ঐতিহাসিক বাড়িগুলোও প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটককে আকর্ষণ করে।

রাফসানজানের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে হাজি আগা আলীর বাড়ি বিশেষভাবে বিখ্যাত। এর খ্যাতির মূল কারণ হলো এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং মনোরম ও নান্দনিক অভ্যন্তরীণ পরিবেশ। এই ঐতিহাসিক বাড়িটি রাফসানজান শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে কাসেমাবাদ গ্রামে অবস্থিত।

 

হাজি আগা আলীর বাড়ির ইতিহাস ও পটভূমি

এই ঐতিহাসিক বাড়িটি ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে (১১৩৬ হিজরি শামসি) নির্মিত হয়। বাড়িটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হতে ১৪ বছর সময় লেগেছিল এবং এর নির্মাণে ইয়াজদ ও রাফসানজানের স্থপতিরা যৌথভাবে কাজ করেছিলেন। বলা হয়, সে সময় এই বাড়িটি বিশ্বের বৃহত্তম ছাদযুক্ত কাঁচা ইট (খেশ্ত) নির্মিত স্থাপনায় পরিণত হয়েছিল।

বাড়িটির নাম থেকেই বোঝা যায়, এর মালিক ছিলেন হাজি আগা আলী মোল্লা জাইম রাফসানজানি। তিনি বাড়িটি নির্মাণের পর এটি ওয়াক্ফ (জনকল্যাণমূলক দান) করে দেন। বলা হয়, হাজি আগা আলী একসময় অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের অধিকারী হন এবং আমিন-উত-তুজ্জার (ব্যবসায়ীদের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি) উপাধিতে ভূষিত হন।

তবে হাজি আগা আলী তাঁর জীবদ্দশায় আরও কয়েকটি স্থাপনা জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ করেছিলেন। সেগুলো হলো:

  • একটি ছাদযুক্ত বাজার, যার ছাদে ২১টি ভিন্ন জ্যামিতিক নকশা শনাক্ত করা যায়;
  • একটি ইটের আব-আনবার (পানির সংরক্ষণাগার), যেখানে টাইলসের অলংকরণ করা হয়েছে;
  • একটি মসজিদ, যা চেহেলসতুন নামে পরিচিত;
  • একটি হাম্মাম (স্নানাগার), যার টাইলস ও পাথরের কারুকাজ অত্যন্ত শিল্পসম্মত;
  • একটি হোসেইনিয়া;
  • একটি কারাভানসারাই (বিশ্রামাগার), যা বাজারের পাশে অবস্থিত এবং প্রশস্ত পরিসরের কারণে ভ্রমণকারীদের আতিথ্য ও আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হতো;
  • একটি ইয়াখচাল-কবুতরখানা, যা শীতকালে বরফ সংরক্ষণ এবং গরম মৌসুমে তা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল।

হাজি আগা আলীর নির্মিত স্থাপনাগুলো স্থাপত্যশৈলী ও ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর দিক থেকে একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

২০১৭ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯৬ হিজরি শামসি) এই ভবনের ব্যাপক সংস্কারকাজ পরিচালিত হয়। এই সংস্কারের সময় ভিত্তি মজবুত করা এবং দেয়াল শক্তিশালী করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক বাড়িটি ধ্বংসের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়।


হাজি আগা আলীর বাড়ির বিভিন্ন অংশ ও বৈশিষ্ট্য

মোট ৮৬টি কক্ষ নিয়ে এই বাড়িটি গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে হাফতদারি (সাত দরজার কক্ষ), পাঞ্জদারি (পাঁচ দরজার কক্ষ), সেহদারি (তিন দরজার কক্ষ) এবং পাস্তু (ছোট সংরক্ষণ কক্ষ)। চারটি আঙিনা, একাধিক আচ্ছাদিত ও উন্মুক্ত করিডর এবং তিনটি হাশতি (প্রবেশকক্ষ) মিলিয়ে বাড়িটির যোগাযোগপথ গড়ে উঠেছে। ভবনটির বিশালতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নির্মাণকালে এর নকশা ও বাস্তবায়নে কতটা দক্ষতা ও সূক্ষ্মতা প্রয়োগ করা হয়েছিল।

মরু অঞ্চলের স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাফসানজানের জলবায়ু ও ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটিই ভবনটির দীর্ঘস্থায়িত্বের অন্যতম কারণ। যদিও বাড়িটির মূল নকশা ইরানি স্থাপত্যের নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবু এর কিছু অংশে রোমান, ইউরোপীয় এবং ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়।




রাফসানজানের হাজ আগা আলির বাড়ির অভ্যন্তরীণ স্থাপত্য

হাজি আগা আলীর বাড়ির প্রবেশপথের দেয়ালগুলো অত্যন্ত উঁচু ও দৃষ্টিনন্দন। বাড়িটির বাইরের অংশ কাঁচা ইট (খেশ্ত) দিয়ে নির্মিত, আর ভেতরের কক্ষগুলোর দেয়াল প্লাস্টার করা। মূল আঙিনার চারপাশে একাধিক কক্ষ ও হল রয়েছে, যেগুলো অবস্থান ও সূর্যের আলোর দিক বিবেচনায় বছরের বিভিন্ন ঋতুতে ব্যবহৃত হতো। রঙিন ওরসি জানালাগুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো কক্ষে প্রবেশ করলে অভ্যন্তরের অলংকরণের সৌন্দর্য আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

হাজি আগা আলীর বাড়ির সমগ্র কমপ্লেক্সের আয়তন প্রায় ৭,০০০ বর্গমিটার এবং এটি চারটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত: হাউজখানা, শাহনেশিন, শরৎকালীন আবাস এবং শীতকালীন আবাস

হাউজখানার হল

এই অংশটি ভবনের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি প্রশস্ত এবং এটি দুই তলাবিশিষ্ট। উঁচু গাঁথুনির গচকাজ এবং ইসলিমি নকশা হাউজখানার হলের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে। দ্বিতীয় তলায় দুটি হল এবং একাধিক কক্ষ রয়েছে। এই অংশের মাঝখানে একটি বহুভুজাকার জলাধার (হাউজ) দেখা যায়। অতীতে এই জলাধারটি আঙিনার অন্যান্য জলাধারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং এর পানি কানাত (ভূগর্ভস্থ জলসেচ ব্যবস্থা) থেকে সরবরাহ করা হতো।




রাফসানজানের হাজ আগা আলির বাড়ির হাওজখানা হলঘর

শাহনেশিন

এই অংশটি সাধারণত বছরের আবহাওয়া মনোরম থাকার সময়, বিশেষ করে বসন্তকালে ব্যবহার করা হতো। শাহনেশিনের দক্ষিণ দিকে একটি উঁচু বারান্দা (ইওয়ান) রয়েছে। বারান্দার দুই পাশে সমান্তরালভাবে করিডর নির্মিত হয়েছে। শরৎকালীন হলটি শাহনেশিনের পশ্চিমে এবং শীতকালীন হলটি এর উত্তরে অবস্থিত।

কোলাহ-ফারাঙ্গি

এই অংশটি গ্রীষ্মকালে ব্যবহৃত হতো এবং একে গ্রীষ্মকালীন আবাস বলেও ডাকা হতো। এখানে থাকা পানির ফোয়ারাগুলো শুধু সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করত না, বরং পুরো পরিবেশ শীতল রাখার কাজও করত। এ বৈশিষ্ট্যটি হাজি আগা আলীর বাড়ির এই অংশকে বিশেষভাবে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

হাজি আগা আলীর বাড়ির জাতীয় নিবন্ধন

এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩৭৪ হিজরি শামসি) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

 
রাফসানজানের হাজি আগা আলীর বাড়ি-অসাধারণ অভ্যন্তরীণ নকশাসহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা ইট (মাটির) নির্মিত স্থাপনা।
কেরমান
রাফসানজান

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: