আবান মাস হলো ইয়াজদে ডালিমের ঋতু
আপনি যদি আবান মাসে (অক্টোবরের শেষ ভাগ ও নভেম্বরের শুরুর দিকে) ইয়াজদ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাহলে আপনার চমৎকার পছন্দের জন্য অভিনন্দন জানাতেই হয়! কারণ আপনি যেমন একটি অসাধারণ গন্তব্য বেছে নিয়েছেন, তেমনি এমন একটি সময়ও বেছে নিয়েছেন যখন ইয়াজদের আবহাওয়া সবচেয়ে মনোরম থাকে। তবে সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো আপনি এমন একটি ঋতু বেছে নিয়েছেন, যখন ইয়াজদের রসালো ডালিম পেকে যায় এবং তার টক-মিষ্টি স্বাদ দিয়ে আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে।
ডালিম, একটি সুস্বাদু ও অনন্য ফল
ডালিম একটি বিশেষ ধরনের ফল, যা ছোট আকারের গাছে জন্মায় (কিছু জাতের গাছের উচ্চতা পাঁচ মিটারেরও বেশি হয়)। এর ভেতরে লাল বা সাদা রঙের দানা থাকে; কখনও কখনও দানার রং এই দুইয়ের মাঝামাঝি বা মিশ্র রঙেরও হয়। ডালিম গাছ দীর্ঘজীবী হয়। কিছু জাতের ডালিম গাছে ফল না ধরলেও, এর সৌন্দর্য ও ছায়া দেওয়ার ক্ষমতার কারণে সেগুলো চাষ করা হয়। যদিও হিমালয় পর্বতমালা থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ডালিম গাছ জন্মায়, তবে উৎকৃষ্ট মানের ডালিম ইরানেই উৎপন্ন হয়। প্রতি বছর এক মিলিয়নেরও বেশি টন ডালিম উৎপাদন করে ইরান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডালিম উৎপাদনকারী দেশ। ইরানে ৯১ হাজার হেক্টরেরও বেশি বাগানে ডালিম চাষ করা হয়। বিভিন্ন জাতের ডালিম সংগ্রহ শুরু হয় ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি (সেপ্টেম্বরের শুরুতে) এবং তা চলে আজার মাসের শেষভাগ পর্যন্ত (নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত)।
ইরানিদের কাছে এই ফল অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং এটি তাদের প্রাচীন পুরাণ ও গল্পকথাতেও স্থান পেয়েছে। ইরানিরা ডালিমকে “স্বর্গীয় ফল” নামে অভিহিত করেছেন এবং এর প্রতি বিশেষ সম্মান দেখান। প্রাচীন ইরানে ডালিম ছিল উর্বরতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক। কারণ একটি ফলের ভেতরে শত শত দানা থাকে, আর প্রতিটি দানা থেকে একটি নতুন গাছ জন্ম নিতে পারে এবং আরও অসংখ্য দানার সৃষ্টি করতে পারে। শীতের প্রথম রাতের উৎসব ইয়ালদা-র ভোজের টেবিলে ডালিমের উপস্থিতিও প্রাচীন যুগে এই ফল সম্পর্কে ইরানিদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত। ডালিম গাছের প্রায় সব অংশ ফল, ফলের খোসা, শিকড়, দানা, পাতা, ফুল এবং গাছের বাকল ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং ইরানি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ডালিমের কুঁড়ি ও ফুলের বিশেষ আকৃতি এবং আগুনের পাত্রের মতো এর সাদৃশ্যকে একটি কারণ হিসেবে ধরা হয়, যার ফলে জরথুস্ত্রীয়দের কাছে এই ফুল পবিত্র মর্যাদা পেয়েছে। পার্সেপোলিসের খোদাই ও চিত্রকলাতেও ডালিম ফুলের প্রতীক দেখা যায়। সুফি ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদদের কাছেও ডালিম একটি গভীর প্রতীকের অর্থ বহন করে। তারা ডালিমকে বহুত্বের মধ্যেও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, অসংখ্য আলাদা দানা থাকা সত্ত্বেও ফলটির একক সত্তা ও গঠন সৃষ্টিজগতের মৌলিক ঐক্যের প্রতীক।
ইয়াজদের ডালিমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
ইরানের প্রায় সব প্রদেশেই ডালিম চাষ হয়, তবে এর মধ্যে ফার্স, ইয়াজদ, ইসফাহান ও কেন্দ্রীয় প্রদেশের ডালিম উৎকৃষ্ট মানের বলে পরিচিত। ইয়াজদ প্রদেশে মেইবদ, ইয়াজদ, তাফত ও আবর্কুহ শহর ডালিম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ইয়াজদ শহর ৯৭৬ হেক্টর জমিতে ডালিম চাষের মাধ্যমে এই প্রদেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়। “মালাস ইয়াজদি”, “শিরিন শাহভার”, “জাগ-এ আকদা”, “গুলে তাফত” এবং “সারিয়াজদ মাহরিজ” এগুলো ইয়াজদ প্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডালিমের জাত হিসেবে পরিচিত।
ইয়াজদে ডালিম চাষের বিস্তৃত এলাকা এবং বিভিন্ন জাতের উপস্থিতি এই অঞ্চলের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও ডালিম উৎপাদনে মানুষের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক জ্ঞানের প্রমাণ বহন করে। প্রদেশটির প্রতি হেক্টর জমিতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ টন ডালিম উৎপন্ন হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রতি হেক্টরে ৫০ টন পর্যন্ত উৎপাদনের রেকর্ডও রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক খরার মধ্যেও ইয়াজদের কৃষকরা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও ক্ষতিকর উপাদান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগত মান বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।
সাধারণভাবে ডালিম একটি উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় ফল এবং এটি ইরানের আদি ফল হিসেবে বিবেচিত। কৃষকদের মতে, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য যত বেশি হয়, ডালিমের মান তত ভালো হয়। ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিশেষ করে মরুভূমি এলাকায় এই বৈশিষ্ট্য আরও বেশি দেখা যায়। তবে তাপমাত্রার এই পার্থক্য ফসলের জন্য কিছু ঝুঁকিও তৈরি করে। যেমন, এর কারণে ফল ফেটে যেতে পারে এবং “গলুগাহ কৃমি” নামের এক ধরনের পোকার আক্রমণের জন্য ফলটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শত শত বছরের অভিজ্ঞতায় কৃষকরা শিখেছেন কিছু জাতের ডালিম পাকবার আগেই সংগ্রহ করতে হয়, আর যেসব জাত দেরিতে পাকে সেগুলোকে ফাটা ফল সরিয়ে পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে হয়।
ইয়াজদে উৎপাদিত ডালিমের একটি অংশ রপ্তানি করা হয় এবং অন্য অংশ থেকে বিভিন্ন পণ্য যেমন ডালিমের পেস্ট, মসলা ও কনসেনট্রেট তৈরি করা হয়। ডালিম সংগ্রহের মৌসুমে ইয়াজদ প্রদেশের বিভিন্ন শহরে নানা ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হয়। এসব উৎসব মূলত ডালিম ফসলের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুষ্ঠান, যা প্রাচীন ঐতিহ্য ও মানুষের পুরোনো বিশ্বাসের আধুনিক রূপ হিসেবে বিবেচিত।
ইয়াজদ ভ্রমণ এবং এর অসাধারণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখা নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে সেই অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ ও সুস্বাদু করে তুলতে ডালিমের বাগান ঘুরে দেখা এবং ইয়াজদের বিখ্যাত ডালিমের স্বাদ গ্রহণ করা উচিত।
| আবান মাস হলো ইয়াজদে ডালিমের ঋতু | |
| ইয়াজদ | |
| ইয়াজদ | |
| Natural |







