কলাকচাল: তেহরানের পর্বতারোহী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জনপ্রিয় এলাকা।
প্রকৃতিভ্রমণ আজকের মানুষের জন্য, যে নগরজীবন ও আধুনিক জীবনের কোলাহলে নিমজ্জিত, এক ধরনের প্রয়োজনীয়তা বলে মনে হয়। মানুষ প্রকৃতির মাঝে গিয়ে তার নির্মলতা ও সবুজের সঙ্গে নিজের আত্মার বন্ধন গড়ে তোলে এবং নিজের মন-প্রাণের ক্লান্তি ও মলিনতা দূর করে। ইরানিরা প্রকৃতি ও প্রকৃতিভ্রমণ খুবই পছন্দ করে। সপ্তাহের ছুটির দিনে শহরের আশপাশের কোনো একটি বিনোদনস্থলে গেলেই বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষকে প্রকৃতির কোলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও প্রশান্তি উপভোগ করতে দেখা যায়।
শহরের আশপাশে পাহাড়গুলো প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। সাধারণত যেসব পাহাড়ে আরোহণের জন্য বিশেষ সরঞ্জাম বা উচ্চ দক্ষতার প্রয়োজন হয় না এবং এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই যেগুলোতে ওঠা যায়, সেগুলোই বেশি জনপ্রিয়। তেহরান শহরে এই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কয়েকটি স্থান রয়েছে, যেখানে প্রতি সপ্তাহে বিপুল সংখ্যক প্রকৃতিপ্রেমীর সমাগম ঘটে। কলাকচাল তার মধ্যে অন্যতম, যা আলবোর্জ পর্বতমালার একটি অংশ।
কলাকচাল: বৈশিষ্ট্য ও আরোহনের পথসমূহ
কলাকচাল শৃঙ্গের উচ্চতা ৩,৩৫০ মিটার। এর পাশেই ৩,৩১০ মিটার উচ্চতার একটি উপশৃঙ্গ রয়েছে। এছাড়া তোচাল শৃঙ্গে যাওয়ার একটি পথ (শাহী পথ) কলাকচালের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে।
শৃঙ্গে ওঠার প্রধান ও সাধারণ পথটি জামশিদিয়ে পার্ক থেকে শুরু হয়। এই পথটি যেমন অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম, তেমনি এতে আরোহণ করাও খুব বেশি কঠিন নয়। জামশিদিয়ে পার্ক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৮৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং সেখান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ ধরে শৃঙ্গে পৌঁছানো যায়। এই পথে অসংখ্য ঝরনা ও বিশ্রামস্থল থাকায় যাত্রাটি অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও আরামদায়ক হয়ে ওঠে। পথের প্রথম বিশ্রামস্থলটি শহীদ বাহোনার ছাত্র শিবির নামেও পরিচিত এবং এটি জামশিদিয়ে পার্কের কিছুটা ওপরে অবস্থিত।
এরপর পাকুব নামে পরিচিত পথটি তোচালের পর্বতশিরায় গিয়ে মিশেছে। সেখানে একটি দ্বিমুখী পথ দেখা যায়। একটি পথ পূর্বদিকে গিয়ে কলাকচাল শৃঙ্গে পৌঁছায়, আর অন্যটি উত্তরদিকে গিয়ে পর্বতশিরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিরপালা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছায়। শিরপালা আশ্রয়কেন্দ্রটি ২,৭৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং তোচাল শৃঙ্গে যাওয়ার প্রধান পথ এই আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে গেছে। শিরপালা থেকেও কলাকচালে পৌঁছানো সম্ভব, তবে এই পথটি তুলনামূলক কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না। আরেকটি পথ তেহরানের দারাবাদ এলাকার নিলুফার পার্ক থেকে শুরু হয়েছে। এই পথটি তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল হলেও শৃঙ্গ পর্যন্ত দূরত্ব কম, প্রায় ৫,২০০ মিটার। এই পথে কলাকচালে ওঠার আগে ২,৭০০ মিটার উচ্চতার আরাঘচিন এবং ২,৮০০ মিটার উচ্চতার তাঙ্গচাল শৃঙ্গ অতিক্রম করতে হয়। আব-এ জেন্দেগানি (জীবনের পানি) ঝরনায় পৌঁছানোর পর শৃঙ্গে ওঠার পথ অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে যায়। দারাবাদ উপত্যকার পথও কলাকচালে ওঠার আরেকটি পথ। এই পথটি কাবুতারখান, চালমাগাস এবং সার হাফ্ত হাউজ জলপ্রপাত অতিক্রম করে দারে-এ জেন্দেগি (জীবনের উপত্যকা)-তে, অর্থাৎ আব-এ জেন্দেগানি ঝরনার উঁচু অংশে পৌঁছায়। এরপর বাগচে খলিল নামে পরিচিত পপলার গাছে আচ্ছাদিত এলাকা পেরিয়ে দারাবাদ শৃঙ্গ, পিয়াজচাল গিরিপথ এবং শেষ পর্যন্ত কলাকচাল শৃঙ্গে পৌঁছানো যায়।
শৃঙ্গে ওঠার আরেকটি পথ গুলাবদারে উপত্যকা থেকে শুরু হয়েছে। এই পথের একটি বড় অংশ জামশিদিয়ে পার্কের পথের সঙ্গে অভিন্ন। দরবন্দ থেকে কলাকচাল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় স্বাভাবিকভাবে জন্মানো সুগন্ধি আপেলগাছের জন্য গুলাবদারে সুপরিচিত। কলাকচাল পর্বতমালার ২,৫৬৯ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত নূর আল-শোহাদা টিলা ইরান-ইরাক যুদ্ধের আটজন অজ্ঞাতনামা শহীদের সমাধিস্থল। তাঁদের ২০০১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৮০ হিজরি শামসি) এখানে সমাহিত করা হয়। তাঁদের স্মৃতিসৌধটি প্রতি শুক্রবার ভোরে পর্বতারোহী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়। শুক্রবার সকালে শহীদদের কবর জিয়ারত করতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য সাধারণ নাশতারও ব্যবস্থা করা হয়।
কলাকচাল নামকরণের উৎস
যদিও শীতকালে প্রবল তুষারঝড়ের কারণে কলাকচাল নামের অর্থ "বরফে ঢাকা হিমভাণ্ডার" বা "তুষারে ভরা গর্ত" বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তবে কেউ কেউ মনে করেন এর নামকরণ হয়েছে এই স্থানে তেহরান ও মাজান্দারান প্রদেশের সীমান্ত সংলগ্ন অবস্থানের কারণে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, "কুলাক" অর্থ সীমান্ত এবং "চাল" অর্থ গর্ত বা নিম্নভূমি। সে হিসেবে কলাকচাল শব্দের অর্থ দাঁড়ায় "সীমান্তের গর্ত" বা "সীমান্তবর্তী নিম্নভূমি"।
কলাকচালকে ঘিরে একটি পৌরাণিক কাহিনি
কেউ কেউ কলাকচালকে দেব-এ সেপিদ (সাদা দানব)-এর আবাসস্থল বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও এই দাবিটি আমোলের কলাকচাল সম্পর্কেও করা হয়েছে। দেব-এ সেপিদ শাহনামা মহাকাব্যের অন্যতম এক অসুর, যাকে ইরানের কিংবদন্তি বীর রুস্তম পরাজিত করেছিলেন। এই সাদা দানব মাজান্দারানে বাস করত এবং সেখানে ইরানের শাহকে বন্দি করে রেখেছিল।
কলাকচাল শৃঙ্গের কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান
মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং তুলনামূলক সহজ আরোহনপথের কারণে কলাকচাল নিজেই পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে অনেক ভ্রমণকারী শৃঙ্গের আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোও দেখতে পছন্দ করেন। এসব আকর্ষণের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো জামশিদিয়ে পার্ক, যেখান থেকে কলাকচাল শৃঙ্গে ওঠার প্রধান পথ শুরু হয়েছে। এই পার্কটি তেহরানের বৃহত্তম উদ্যানগুলোর একটি এবং এর আয়তন প্রায় ১০ হেক্টর। পার্কের বিভিন্ন অংশ এমনভাবে পরিকল্পিত ও নির্মিত হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পর্যাপ্ত বিনোদন ও প্রয়োজনীয় সুবিধা উপভোগ করতে পারেন।
| কলাকচাল: তেহরানের পর্বতারোহী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জনপ্রিয় এলাকা। | |
| তেহরান | |
| তেহরান | |
| Natural | |
| Registration | No registration |







