পর্যটন আকর্ষণ স্থান

কাতরুম গ্রাম ইয়াজদের উত্তপ্ত মরুভূমির পাশে প্রকৃতির এক বিস্ময়।

ইয়াজদের মরুভূমি-প্রধান প্রদেশে কাতরুম গ্রাম অবস্থিত। এটি এমন একটি চার ঋতুর গ্রাম, যেখানে অল্প কিছু পথ পাড়ি দিলেই ঋতু পরিবর্তনের অনুভূতি পাওয়া যায়!

আধুনিক জীবনযাত্রা মূলত শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। এর ফলে গ্রাম অতীতে যে মর্যাদা ও অবস্থান ধারণ করত, তা অনেকটাই হারিয়েছে। তবে আজও গ্রাম সেই আগের মতোই পরিশ্রমী মানুষের বসবাসের স্থান, যারা কৃষিকাজ, পশুপালন এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য পেশাগত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। গ্রামীণ জীবন পরিশ্রম ও কঠোর সাধনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে এর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা শহরে খুঁজে পাওয়া যায় না তা হলো প্রাণচাঞ্চল্য, প্রশান্তি ও সতেজতা।

অনেক পর্যটক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে শহর বেছে নেওয়ার পরিবর্তে শহরের আরাম-আয়েশ ও সুযোগ-সুবিধাকে একপাশে রেখে গ্রামে যেতে পছন্দ করেন। এর মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন অল্প সময়ের জন্য গ্রামীণ জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন, অন্যদিকে তেমনি মানুষের প্রকৃত স্বরূপ অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের কাছেও কিছুটা ফিরে যেতে পারেন। এদের মধ্যে কিছু গ্রাম রয়েছে, যেগুলো এই অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দময় করে তোলে। এসব গ্রাম আদর্শ পর্যটনগ্রাম হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এবং আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। কাতরুম গ্রাম এমনই একটি গ্রাম; মরুভূমির হৃদয়ে এটি যেন একটি সবুজ রত্নের মতো দৃষ্টিগোচর হয়।

কাতরুম গ্রাম কোথায় অবস্থিত?

ইয়াজদ প্রদেশের আয়তন ৭৬ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এবং আয়তনের দিক থেকে এটি ইরানের প্রদেশগুলোর মধ্যে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। প্রদেশটির মরুভূমি-প্রধান জলবায়ুর কারণে এখানে বসতিগুলো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। কাতরুম গ্রামটি এই প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে বাফক জেলায় অবস্থিত। ইরানে বাফক তার সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদের জন্য বিখ্যাত। তবে এই জেলার মধ্যেই কাতরুমসহ বেশ কয়েকটি সবুজ-শ্যামল গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রাম মূলত মরুভূমির মধ্যে বিচ্ছিন্ন জনবসতি হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং এখানকার সবুজ-শ্যামল পরিবেশের প্রধান কারণ হলো প্রাকৃতিক ঝরনা ও ভূগর্ভস্থ জলনালা (কানাত)। কাতরুম গ্রামটি বাজগান পর্বতমালার পশ্চিম ঢালে, বাফক শহরের দক্ষিণে একটি পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত। কাতরুম গ্রামের সঙ্গে বাফক শহরের দূরত্ব প্রায় ৪৩ কিলোমিটার।

কাতরুম গ্রামের বৈশিষ্ট্য

ছাদযুক্ত অসমতল ও সিঁড়ির মতো গলিপথ, বাগানগুলোর পাথরের দেয়াল, নিচু ও ছোট প্রবেশদ্বারবিশিষ্ট বাড়িঘর এবং আঁকাবাঁকা সরু গলি এসব বৈশিষ্ট্য কাতরুম গ্রামকে ইয়াজদ প্রদেশের অন্যান্য গ্রাম থেকে আলাদা করেছে। গ্রামের বাড়িগুলো ধাপের মতো করে নির্মিত হওয়ায় অনেকে এটিকে উত্তর ইরানের মাসুলেহ গ্রামের সঙ্গে তুলনা করেন এবং কাতরুমকে ‘ইয়াজদের মাসুলেহ’ বলে অভিহিত করেন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও শীতের ভারী তুষারপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্রামের গলিগুলো ছাদযুক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে। সম্ভবত গ্রামের প্রাচীন অধিবাসীরা এ নির্মাণপদ্ধতিতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছিলেন।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গ্রামের উচ্চতা প্রায় ১,৫০০ মিটার। ভৌগোলিকভাবে উপত্যকার আকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রামটি পূর্ব-পশ্চিম দিকে গড়ে উঠেছে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও বাগানচাষের সঙ্গে যুক্ত। তবে কিছু স্থানীয় বাসিন্দা জেলার বিভিন্ন খনিতেও কাজ করেন। গ্রাম থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ঝরনা, যার পানি একটি ছোট স্রোতধারা হিসেবে গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়, গ্রামের পানির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। কাতরুম কয়েকটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত। মনে হয়, এই পাহাড়গুলো যেন একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর, যা কাতরুমকে মরুভূমির কঠোর ও তীব্র প্রকৃতি থেকে রক্ষা করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব পাহাড়ের কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে হাতুড়ির মতো নয়, বরং হামানদিস্তার পাত্রের মতো বিশেষ আকৃতি ধারণ করেছে। গ্রামবাসীরা পাহাড়ের এই বিশেষ আকৃতিকে ‘জুগান’ বলে থাকেন। এসব পাহাড় রক ক্লাইম্বিং বা শিলারোহণের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

গ্রামের বিশেষ ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিস্থিতির কারণে এখানে একই সঙ্গে উষ্ণমণ্ডলীয় উদ্ভিদ যেমন খেজুর ও পেস্তা চাষ করা যায়; আবার আর্দ্র ও শীতল অঞ্চলের উপযোগী আখরোট ও বাদাম গাছও এখানে জন্মাতে পারে। গ্রামের আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য এমন যে অল্প দূরত্বের মধ্যেই তাপমাত্রার পরিবর্তন ও ঋতুর আবর্তন অনুভব করা যায়! কাতরুমে ছাগল, বুনো ছাগল, ভেড়া, ভেড়ার পুরুষ প্রজাতি বা রাম, তিতির এবং তিহুসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী দেখা যায়। এছাড়া বুনো ডুমুর, জিরা ও পাহাড়ি বাদাম গ্রামের দেশীয় উদ্ভিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

কেউ কেউ মনে করেন, গ্রামের প্রবেশমুখে অবস্থিত একটি প্রাচীন কবরস্থানের অস্তিত্বের ভিত্তিতে কাতরুমের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ধারণা করা হয়, বসতি স্থাপনের জন্য এই স্থানটি বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পাহাড়গুলোর প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা। অন্যভাবে বললে, আক্রমণকারীদের হাত থেকে গ্রামের নিরাপত্তা রক্ষায় পাহাড়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। গ্রামে কয়েকটি প্রাচীন জলাধার বা বাঁধ রয়েছে। এগুলোর পাশাপাশি অসংখ্য ঝরনা থাকায় অঞ্চলটি প্রকৃতিভ্রমণ বা নেচার ট্যুরিজমের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

গ্রামের মানুষের কথ্য ভাষা বাফক শহরের বাসিন্দাদের কথ্য ভাষা থেকে আলাদা। এই বৈশিষ্ট্য কাতরুমকে নৃতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণার জন্যও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়া গুইবাজি, চেফতেবাজি ও জোগালবাজি-র মতো কিছু স্থানীয় খেলা গ্রামের প্রাচীন খেলাধুলা ও বাসিন্দাদের পুরোনো বিনোদনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই গ্রামে ‘তালো ঘারদানি’ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী আচারও প্রচলিত রয়েছে, যা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে পালন করা হয়। এই আচার অনুষ্ঠানে গ্রামের একজন যুবক বা কিশোরকে ‘তালো’ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। সে হাতে একটি ঘণ্টা নিয়ে গ্রামের মানুষের বাড়ি বাড়ি যায় এবং তাদের কাছে মানত করা খাবার বা উপহার দেওয়ার অনুরোধ করে। এসব মানত হতে পারে নগদ অর্থ অথবা কোনো খাবার, যেমন চকোলেট কিংবা আশ (এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী ইরানি স্যুপ)।