পর্যটন আকর্ষণ স্থান

মিয়ানার ইমামজাদা ইসমাইল আধ্যাত্মিক আবহে পরিপূর্ণ এক পবিত্র স্থান।

মিয়ানার ইমামজাদা ইসমাইল শুধু একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কেন্দ্রও।

ইরানের মানুষ ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর এবং শিয়া ইমামদের মহান ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে করেন এবং ইতিহাসজুড়ে তাঁদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আসছেন। ইরানের সর্বত্র এসব মহান ব্যক্তিত্বের সমাধিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মাজার ও তীর্থস্থান নির্মিত হয়েছে, যা তাঁদের প্রতি মানুষের এই অসাধারণ শ্রদ্ধারই নিদর্শন। সারা বছর এসব স্থান মানুষের উপস্থিতি, প্রার্থনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি এসব মাজারকে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশ ইরানের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এই প্রদেশে ইমামজাদাদের মাজারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে অনেক ইমামজাদা সমাহিত আছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমামজাদা ইসমাইল, যিনি শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম ও নেতা ইমাম জাফর সাদিকের অন্যতম সন্তান। এই পবিত্র মাজারটি মিয়ানা শহরে অবস্থিত।

মিয়ানার ইতিহাস ও ভূগোল

মিয়ানা জেলা পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের পূর্ব অংশে অবস্থিত। এই জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র মিয়ানা শহর, যা তাবরিজ শহর থেকে ১৩৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এর জনসংখ্যা ১ লাখেরও বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মিয়ানার উচ্চতা প্রায় ১,১০০ মিটার এবং এখানে কৃষিকাজ বেশ সমৃদ্ধ।

এই জেলার কৃষিপণ্যের মধ্যে আপেল সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এ ছাড়া গম উৎপাদনেও মিয়ানা বিশেষভাবে এগিয়ে। বোজগুশ ও কাফলান-কুহ এই দুটি পর্বতমালা মিয়ানা জেলার সীমানার মধ্যে অবস্থিত। জেলাটিতে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৩২০ মিলিমিটার।

এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে মিয়ানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মনোরম দৃশ্যে সমৃদ্ধ। এখানে ভ্রমণ করলে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থান ও দর্শনীয় স্থাপনা দেখার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগেরও সুযোগ পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুযায়ী, মিয়ানা শহরের ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে সাসানীয় যুগের (২২৪–৬৫১ খ্রিস্টাব্দ) একটি মাটির তৈরি মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে পাওয়া প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত হয়।

এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় আসিরীয় ও উরার্তীয় সভ্যতার কয়েকটি শিলালিপিও পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন ওই ঐতিহাসিক সময়গুলোতে এই অঞ্চলের গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মিয়ানার ইমামজাদা ইসমাইলের মাজারের ইতিহাস

মিয়ানার ইমামজাদা ইসমাইলের মাজারের প্রাথমিক নির্মাণ সাফাভি যুগে (১৬শ শতাব্দী) হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে বর্তমানে একাধিকবার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজ হওয়ায় স্থাপনাটির খুব সামান্য অংশই অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে এবং তার প্রাচীন রূপ ধরে রেখেছে। ফলে বর্তমানে যে স্থাপনাটি দেখা যায়, তাকে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশের মধ্যে ১৩ মিটার উচ্চতার মিনারটি  ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। মাজারের অভ্যন্তরীণ আয়তন প্রায় ৩০ বর্গমিটার। এই স্থানের ওপর একটি গম্বুজ রয়েছে, যার উচ্চতা ৪ মিটারেরও বেশি। বাইরে থেকে গম্বুজটির উচ্চতা প্রায় ৬ মিটার।

এই সম্মানিত ইমামজাদার সমাধিফলকে খোদাই করা লেখার ভিত্তিতে জানা যায়, তাঁর কবর ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত হয়। প্রচলিত সূত্র অনুযায়ী, ইমামজাদা ইসমাইল ছিলেন শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম ইমাম জাফর সাদিকের বংশধর। ইমামজাদা ইসমাইলের জীবনকাল ছিল মুসলিম ভূখণ্ডে আব্বাসীয়দের শাসনামলে (৭৫০–১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ)। আব্বাসীয়রা ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের প্রতি বিরূপ ছিল এবং তাঁদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করত। এ কারণে তাঁদের অনেকেই আব্বাসীয়দের অত্যাচার থেকে বাঁচতে ইরানে চলে আসতেন।

কথিত আছে, ইমামজাদা ইসমাইল গোপনে ইরাক হয়ে হিজাজ থেকে ইরানে আসেন এবং মিয়ানা শহরে বসবাস শুরু করেন। মিয়ানায় কয়েক মাস অবস্থানের পর তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। কয়েক শতাব্দী পর, ৯২৩ হিজরি সালে, তিনি মিয়ানার এক বাসিন্দার স্বপ্নে আবির্ভূত হন এবং নিজের মৃত্যুর কারণ ও সমাধিস্থলের অবস্থান সম্পর্কে তাঁকে জানান। স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী সেই স্থান খনন করা হলে একটি পাথর পাওয়া যায়, যাতে সমাধিস্থ ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তথ্য ছিল। ঐতিহাসিক কান্দোভান গ্রামেও ইমামজাদা মুহাম্মদ নামে একটি মাজার রয়েছে। কথিত আছে, এটি ইমামজাদা ইসমাইলের পিতার সমাধি।

মিয়ানার ইমামজাদা ইসমাইলের মাজারের জাতীয় নিবন্ধন

মিয়ানা শহরের ইমাম খোমেনি সড়কে, জামে মসজিদের দক্ষিণে অবস্থিত এই স্থাপনাটি ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।