তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহ ছিল ইরানের সাংবিধানিক আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব ও পরিচালনাকেন্দ্র।
সাংবিধানিক বিপ্লব ছিল ইরানের সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোর অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক ঘটনা। ১৯০৬ সালে তৎকালীন ইরানের শাসক মোযাফফরউদ্দিন শাহ কাজার কর্তৃক সাংবিধানিক ফরমান জারির মাধ্যমে এই বিপ্লব সফলতা লাভ করে।
ইরানের অন্যতম বৃহৎ শহর তাবরিজ সাংবিধানিক ফরমান জারির প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময় এই শহর ছিল সাংবিধানিকপন্থীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বর্তমানে তাবরিজ শহরে এমন অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো সাংবিধানিক আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি বহন করে।
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহ (সাংবিধানিক আন্দোলনের ঘর) এই ধরনের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। সে সময় এটি আজারবাইজানের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাবেশ এবং সাংবিধানিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।
ইরানের সমকালীন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পাশাপাশি, এই ভবনটিতে অনন্য স্থাপত্যিক ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। এসব কারণেই ১৯৭৫ সালে এর নাম ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহের ইতিহাস
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহ একসময় তাবরিজের অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়ী ও বাজারের বিশিষ্ট ব্যক্তি মেহদি কোযেহকানানি-র বাসভবন ছিল। তিনি ১৮৬৮ সালে এই বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেন। বহু বছর পর, সাংবিধানিক আন্দোলনের সংগ্রামের সময় এই বাড়িটি ‘খনেয়েমাশরুতেহ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তাবরিজ শহর অবরোধের ১১ মাসব্যাপী সময়কালে এই বাড়ি তাবরিজের আন্দোলনকারীদের কমান্ডকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাংবিধানিকপন্থীদের ওপর নানা চাপ ও কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলেও, শেষ পর্যন্ত তারা সরকারি বাহিনীকে পিছু হটাতে সক্ষম হয় এবং ইরানের অন্যান্য সাংবিধানিকপন্থীদের মধ্যেও একটি অগ্রসর আন্দোলনের ধারা সৃষ্টি করে।
এভাবে তাবরিজের খনেয়েমাশরুতেহ ইরানে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই তাবরিজের মানুষের কাছে এই বাড়িটি বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা লাভ করেছে।
১৯৯৬ সালে, সাংবিধানিক আন্দোলনের যোদ্ধাদের পরিচালনায় এই স্থানের ভূমিকা এবং এখানে সংরক্ষিত দলিলপত্র ও ঐতিহাসিক নথির গুরুত্ব বিবেচনা করে, ভবনটিকে ‘তাবরিজের খনেয়েমাশরুতেহ’ জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করা হয়।
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহে সংরক্ষিত নিদর্শনসমূহ
এই জাদুঘরের অন্যতম প্রধান বিভাগ হলো সাংবিধানিক আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আবক্ষ মূর্তি। এই বিভাগে হোসেইন খান বাগবান, হাজি আলি দাওয়াচি, সেকাত-উল-ইসলাম তাবরিজি, হাজি আলি খাতায়ি, হাওয়ার্ড বাস্কেরভিল, কারবালায়ি আলি মাসিও, শেখ আলি আসগর লাইলাভায়ি, আখুন্দ খোরাসানি, আলি আকবর দেহখোদা এবং জয়নব পাশার (সাংবিধানিক আন্দোলনকারীদের সারিতে থাকা একমাত্র নারী) আবক্ষ মূর্তি দেখা যায়।
এছাড়াও এই জাদুঘরের বিভিন্ন অংশে তাবরিজের সাংবিধানিক আন্দোলনকারীদের ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম ও সামগ্রী প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাত্তার খানের কোমরের অস্ত্র (পিস্তল), সাংবিধানিক বিপ্লবের স্মারক কার্পেট, আন্দোলনের নেতাদের ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং সাংবিধানিকপন্থীদের কার্যক্রম-সংক্রান্ত নথিপত্র। এসব ঐতিহাসিক বস্তু এই জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত।
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহের বৈশিষ্ট্য ও স্থাপত্যশৈলী
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহে প্রদর্শিত ঐতিহাসিক সামগ্রীর পাশাপাশি এর স্থাপত্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাড়িটির মোট নির্মিত এলাকা প্রায় ১,৩০০ বর্গমিটার এবং এটি দুই তলা বিশিষ্ট। এই ভবন নির্মাণে প্রধানত পাথর, ইট ও কাঁচা মাটি (খড়িমাটি/কাদামাটি) ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কক্ষের ছাদ নির্মাণেও প্রচুর কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে।
এই বাড়ির অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য উপাদান হলো ওরসি জানালা (রঙিন কাচযুক্ত ঐতিহ্যবাহী জানালা), খোদাই করা কাঠের দরজা, কুলাহ ফারাঙ্গি (বিশেষ ধরনের গম্বুজ বা ছাদযুক্ত স্থাপত্য অংশ) এবং আলোক প্রবেশের জানালা। এসব উপাদান ভবনটির কাঠামোকে নান্দনিক ও আকর্ষণীয় রূপ দিয়েছে। ভবনের জানালাগুলোতে লাল ও সবুজ রঙের কাচ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সূর্যের আলো পড়লে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি করে।
বাড়ির প্রধান প্রবেশপথে একটি কামানের পাশাপাশি তাবরিজের সাংবিধানিক আন্দোলনের দুই নেতা সাত্তার খান ও বাকের খান-এর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। খনেয়েমাশরুতেহের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় প্রতিটিতে ছয়টি করে কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় তলার মাঝখানে ৬×৯ মিটার আয়তনের একটি বড় হল রয়েছে, যেখানে সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হতো। দ্বিতীয় তলার উঠানের দিকে মুখ করা কক্ষটি জালিকাজ করা দরজা-জানালা এবং রঙিন কাচের ব্যবহারের কারণে ভবনের অন্যতম সুন্দর অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাবরিজের খনেয়েমাশরুতেহের প্রবেশ হল বা প্রধান বারান্দায় চারটি স্তম্ভ রয়েছে, যেগুলোর মাথায় প্লাস্টারের কারুকাজ করা হয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভের উপরে আলোক প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেগুলোতেও রঙিন কাচ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রধান হলের পাশের কক্ষগুলোর ছাদ কাঠের তৈরি। এসব ছাদ উত্তলভাবে তৈরি অষ্টভুজাকৃতির জ্যামিতিক নকশা দিয়ে অলংকৃত করা হয়েছে।
তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহ কোথায় অবস্থিত?
এই জাদুঘরটি তাবরিজ শহরের একটি ঐতিহাসিক বাড়িতে অবস্থিত। এটি রাসতে-কুচে মহল্লায়, তাবরিজ বাজারের পশ্চিম অংশে অবস্থিত।
| তাবরিজের খনেয়ে মাশরুতেহ ছিল ইরানের সাংবিধানিক আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব ও পরিচালনাকেন্দ্র। | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| তাবরিজ | |

























