এজেন্সি
ইয়াজদের ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর, ১৫০ মিলিয়ন বছর আগের সমুদ্রের গভীরে ফিরে দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

ইয়াজদের ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর, ১৫০ মিলিয়ন বছর আগের সমুদ্রের গভীরে ফিরে দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

ইয়াজদের ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর, ১৫০ মিলিয়ন বছর আগের সমুদ্রের গভীরে ফিরে দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী আজকের মতো ছিল না। তখন পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশ পানির নিচে ছিল; এমনকি যেসব স্থান আজ শুষ্ক মরুভূমি ও উত্তপ্ত প্রান্তর, সেগুলোও তখন সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর আগে ইরানও ‘তেথিস’ (Tethys) নামে পরিচিত একটি মহাসাগরের নিচে ছিল। পরে মহাদেশগুলোর গঠনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসায় নতুন নতুন স্থলভাগের সৃষ্টি হয়।

ধারণা করা হয়, ইরানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কাস্পিয়ান সাগর এবং উরমিয়া হ্রদ সেই বিশাল তেথিস মহাসাগরের অবশিষ্ট অংশ। আর তেথিসের পানি সরে যাওয়ার পরই বর্তমান ইরানের অধিকাংশ ভূখণ্ড পানির ওপর ভেসে ওঠে। তেথিসের পানি ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার ফলে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবাশ্ম সংরক্ষিত হয়ে যায়। এসব জীবাশ্ম ইরানের শুষ্ক ও মরুপ্রধান অঞ্চল যেমন ইয়াজদেও পাওয়া যায়। এই কারণেই ইয়াজদ শহরে ‘ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে বিশেষভাবে জীবাশ্মবিদ্যা (প্যালিওন্টোলজি) এবং কোটি কোটি বছর আগের জীবাশ্ম সংগ্রহ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর: ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর একটি জীবাশ্মবিদ্যা (প্যালিওন্টোলজি) জাদুঘর। এটিকে ইরানের একমাত্র জাদুঘর বলা যায়, যা সম্পূর্ণভাবে জীবাশ্মবিদ্যা নিয়ে বিশেষায়িতভাবে কাজ করে। জীবাশ্মবিদ্যা আমাদের শত শত মিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীর গল্প শোনায় আর সেই গল্প বলে জীবাশ্ম, যাদের অনেকেই নিজেদের মধ্যে অসংখ্য অজানা রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।

বেশিরভাগ জীবাশ্মই সামুদ্রিক প্রাণীর অবশিষ্টাংশ। এসব প্রাণী সমুদ্রের তলদেশে ডুবে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে পলির স্তর তাদের ঢেকে দেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে জীবনের প্রথম প্রায় তিন বিলিয়ন বছর এককোষী প্রাণীরই আধিপত্য ছিল। কিন্তু যে কারণে তা ঘটেছিল, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন বছর আগে হঠাৎ করেই আরও জটিল জীবের আবির্ভাব ঘটে এবং পৃথিবীতে জীবনের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ও দ্রুত পরিবর্তনের যুগ শুরু হয়, যা ক্যামব্রিয়ান যুগ নামে পরিচিত। এই যুগ এখনো নানা রহস্যে ঘেরা। বিজ্ঞানীরা যত নতুন তথ্য আবিষ্কার করছেন, ততই নতুন প্রশ্ন ও বিস্ময়ের জন্ম হচ্ছে।

ক্যামব্রিয়ান জাদুঘরে সংরক্ষিত জীবাশ্মগুলো ইয়াজদ প্রদেশ এবং তার আশপাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব জীবাশ্মের মধ্যে ক্যামব্রিয়ান যুগের কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে, যেগুলোর তুলনা বিশ্বে বিরল। এসব জীবাশ্মের আকার প্রায় চার সেন্টিমিটার এবং এগুলো সেই সময়ের প্রথম বহুকোষী জীবের প্রজাতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ক্যামব্রিয়ান যুগে জীবন ছিল তার একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় এবং তখনো বড় আকারের প্রাণীর উদ্ভব হয়নি। তবে পরবর্তী যুগগুলোতে বড় আকারের জীবাশ্মের সৃষ্টি হয়, যেগুলো ‘ম্যাক্রোফসিল’ নামে পরিচিত। ক্যামব্রিয়ান জাদুঘরে এ ধরনের বিভিন্ন ধরনের জীবাশ্ম সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ব্যাস ৬৭ সেন্টিমিটার এবং সবচেয়ে লম্বাটির দৈর্ঘ্য ১৩৫ সেন্টিমিটার।

জীবাশ্মগুলোর বয়স নির্ধারণ এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয় তাদের শ্রেণি ও উপশ্রেণির ভিত্তিতে। এই জাদুঘরে প্রায় ৪০০টি জীবাশ্ম সংরক্ষিত রয়েছে, যা এর সংগ্রহকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। এসব জীবাশ্ম ইয়াজদের ভূতাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করে।

ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জাদুঘর, যা ২০১৮ সালে (১৩৯৭ সৌর হিজরি) মোজতবা পেজমানপুর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কৈশোর থেকেই জীবাশ্ম সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ শুরু করেন। বর্তমানে জীবাশ্ম সংরক্ষণ, পরিষ্কার করা এবং সেগুলো থেকে পলির স্তর অপসারণের মতো কাজও তিনি নিজেই সম্পন্ন করেন।

ক্যামব্রিয়ান জাদুঘরের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন

জাদুঘরের অধিকাংশ জীবাশ্মই ‘নটিলয়েড’ (Nautiloid) প্রাণীর। এরা মোলাস্কা (নরমদেহী প্রাণী) পর্বের সেফালোপড (শিরোপদ) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতেও এদের একটি জীবিত প্রজাতি, ‘নটিলাস’ (Nautilus), পাওয়া যায়। লক্ষ লক্ষ বছর আগের তুলনায় নটিলাসের দেহগঠনে প্রায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীকে ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ (Living Fossil) বলে অভিহিত করেছেন।

প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে বর্তমান নটিলাসের পূর্বপুরুষেরা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করত এবং সমুদ্রের নিঃসন্দেহ শাসক হিসেবে বিবেচিত হতো। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে নটিলয়েডদের খোলস গোলাকার রূপ ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে আরও জটিল ও অস্বাভাবিক আকৃতি লাভ করে। এই পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যই রয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৬৫.৫ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরের বহু প্রজাতির সঙ্গে সঙ্গে নটিলয়েডদেরও অধিকাংশ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সেফালোপড ছাড়াও গ্যাস্ট্রোপড (Gastropod) শ্রেণির জীবাশ্মও এই জাদুঘরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে। শামুক গ্যাস্ট্রোপডদের সবচেয়ে পরিচিত সদস্য, যারা স্থল ও সমুদ্র উভয় পরিবেশের সঙ্গেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ক্যামব্রিয়ান জাদুঘরে সামুদ্রিক শামুকের বিভিন্ন প্রজাতির জীবাশ্ম সংরক্ষিত আছে। এসব প্রাণী প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বছর আগে বাস করত এবং তাদের আকৃতিতে ছিল ব্যাপক বৈচিত্র্য।

দ্বিখোলক (Bivalve) প্রাণীরা নরমদেহী প্রাণীদের আরেকটি শ্রেণি, যাদের খোলস দুটি অংশে বিভক্ত। সেফালোপড ও গ্যাস্ট্রোপডদের মতো এদের চোখ নেই এবং তারা উদ্ভিদ খায় না। বরং তারা পানির ক্ষুদ্র খাদ্যকণা ছেঁকে খায় এবং সমুদ্রের পানি প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বিখোলকদের চলাচলের অঙ্গ নেই; তারা সমুদ্রতলের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে বসবাস করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, দ্বিখোলক প্রাণীর প্রজাতি ৩০ হাজারেরও বেশি। তবে সাধারণভাবে এগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয় সমমিত (Symmetrical) এবং অসমমিত (Asymmetrical)। ক্যামব্রিয়ান জাদুঘরে দ্বিখোলকদের বেশ কিছু আকর্ষণীয় জীবাশ্ম রয়েছে। এর মধ্যে ‘পিনা’ (Pinna) নামের একটি প্রজাতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর বিশেষ আকৃতির কারণে অনেক সময় এটি ডাইনোসরের দাঁত বলে ভুল হতে পারে। পিনার ধারালো প্রান্ত দিয়ে এটি সমুদ্রতলের পলির মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে স্থির হয়ে বসবাস করত।

ব্র্যাকিওপড (Brachiopod) হলো অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের আরেকটি শ্রেণি, যারা পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়েই বিদ্যমান ছিল। ক্যামব্রিয়ান জাদুঘরে সংরক্ষিত ব্র্যাকিওপডের জীবাশ্মগুলো দেখতে সমমিত দ্বিখোলকদের মতো হলেও তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ব্র্যাকিওপডের একটি খোলস বড় এবং অন্যটি ছোট, কিন্তু সমমিত দ্বিখোলকদের দুটি খোলসই একই আকারের হয়।

ফুলের নকশার মতো বিশেষ আকৃতির খোলসযুক্ত কাঁটাচর্মী (Echinoderm) প্রাণীর জীবাশ্ম এবং উদ্ভিদের জীবাশ্মও এই জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ। জাদুঘরে সংরক্ষিত উদ্ভিদের জীবাশ্মগুলোর বয়স প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর।

ইয়াজদের ক্যামব্রিয়ান জাদুঘর, ১৫০ মিলিয়ন বছর আগের সমুদ্রের গভীরে ফিরে দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
ইয়াজদ
ইয়াজদ
Science and Technology

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: