তাবরিজের মহররম জাদুঘর, আজারবাইজানের মানুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি স্থান।
মহররম হিজরি চন্দ্র ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস। এই মাসের দশম দিন (আশুরা) হলো কারবালায় শিয়া মুসলমানদের তৃতীয় ইমাম ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের বার্ষিকী। ইমাম হোসাইন ছিলেন স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রামের আদর্শ এবং তিনি তাঁর সময়ের অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করতে রাজি হননি।
এই কারণে, যখন কুফার মানুষের আহ্বানে তিনি সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন পথে একটি বিশাল সেনাবাহিনী তাঁর পথ রোধ করে। এরপর এক অসম যুদ্ধে তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের শহীদ করা হয় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়।
আজ মহররম সেই মহান আত্মত্যাগের স্মরণ ও সম্মানের প্রতীক। সারা বিশ্বে এই উপলক্ষে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
ইরানেও মহররমের শোকানুষ্ঠান প্রতিটি জাতি ও অঞ্চলের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে ইরানের প্রতিটি অঞ্চলে মহররমকে স্বাগত জানানো এবং ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের স্মরণে শোক পালন করার জন্য নিজস্ব প্রতীক ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
ইরানে আজারবাইজানি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে শোক পালনের পদ্ধতি ও ঐতিহ্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং ইরানিদের মধ্যে সুপরিচিত। এ কারণেই তাবরিজে “মহররম জাদুঘর” নামে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে এই ঐতিহ্য ও রীতিনীতির একটি অংশ সংগ্রহ করে আগ্রহী দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা যায়।
তাবরিজের মহররম জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য
মহররম জাদুঘরকে নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘরের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এই জাদুঘরের উদ্দেশ্য হলো মহররম মাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মরণে প্রচলিত লোকসংস্কৃতির একটি অংশ দর্শকদের সামনে তুলে ধরা।
এই জাদুঘরে পূর্ব আজারবাইজান অঞ্চলের মহররমের বিভিন্ন প্রতীকী নিদর্শন ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের উপকরণ প্রদর্শিত হয়েছে। এখানে ইমাম হোসাইনের ঘোড়া জুলজানাহর ভাস্কর্য, বিভিন্ন ধরনের তূঘ (ধর্মীয় প্রতীকী দণ্ড), পতাকা, ছোট ছোট দোলনা, প্রদীপ, মোমবাতি, শোকানুষ্ঠান ও তাজিয়া পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিত লেখা, পুরোনো চিত্রকর্ম এবং প্রতিকৃতি-যুক্ত ধর্মীয় পতাকা দেখা যায়।
তাবরিজের মহররম জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ
জাদুঘরের প্রবেশপথে ইমাম হোসাইনের ঘোড়া জুলজানাহর প্রতীকী ভাস্কর্য চোখে পড়ে। জাদুঘরের প্রথম তলাটি পতাকা এবং শোকানুষ্ঠানের কিছু প্রতীকী উপকরণ, যেমন ছোট দোলনা ও প্রদীপ প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত।
এই অংশে প্রদর্শিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো তূঘ। তূঘ হলো একটি বিশেষ ধরনের পতাকা, যার সঙ্গে একটি লম্বা ইস্পাতের ফলকযুক্ত দণ্ড থাকে। জাদুঘরে পূর্ব আজারবাইজানের বিভিন্ন গ্রামের ১০টি প্রাচীন তূঘ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- উস্কু শহরের আসফানজান গ্রামের আলাম,
- হারিসের খোশকনাব গ্রামের শোকের তূঘ,
- হারিসের তাজাকান্দ গ্রামের শোকের তূঘ,
- জোলফা জেলার লিভারজান গ্রামের শোকের আলাম,
- এবং জোলফা জেলার জাভিয়ে ও সিয়েহ সারান গ্রামের দুটি হযরত আব্বাসের আলাম।
এই তূঘগুলোর বৈচিত্র্য একাই পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে মহররমের আচার-অনুষ্ঠান ও শোক পালনের বিভিন্ন পদ্ধতির পরিচয় বহন করে। জাদুঘরের সবচেয়ে পুরোনো তূঘটি আহার শহরের বাজার এলাকার, যা ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করা হয়েছিল।
জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় তাজিয়া পাঠ ও পর্দা পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য উপকরণ প্রদর্শিত হয়েছে। এই অংশে “তাশত-গোজারি” নামের একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি তামার পাত্র দেখা যায়। এই অনুষ্ঠানে মানুষ পাত্রগুলো পানিতে পূর্ণ করত। এই পানি আশুরার দিনে ইমাম হোসাইনের শিশুদের তৃষ্ণার স্মারক হিসেবে বিবেচিত হতো এবং শোকানুষ্ঠান শেষে তা মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো।
এছাড়াও, মহররমের শোক পালনকারীদের আপ্যায়নের জন্য বহু বছর ব্যবহৃত কয়েকটি কয়লার সামোভার এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যেমন কারহানি (শিঙা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র), সাঞ্জ (ঝাঁঝ), ও ঢোল—জাদুঘরে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত রয়েছে।
মহররম জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?
মহররম জাদুঘরটি ডা. সেহতি (সেহতী) বাড়িতে অবস্থিত। ডা. সেহতি ছিলেন কাজার যুগ ও পাহলভি যুগের শুরুর দিকের (২০ শতকের প্রথম ভাগ) একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক।
ডা. আবুল কাসেম সেহতি একজন দক্ষ চিকিৎসক ছিলেন এবং ইমাম হোসাইনের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কারণে মহররম মাসে তিনি নিজের বাড়িকে শোকানুষ্ঠান পালনের একটি স্থানে পরিণত করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানরাও এই ঐতিহ্য চালিয়ে যান। বর্তমানে এই বাড়িটি মহররম জাদুঘর হিসেবে পরিচিত হলেও, মহররমের প্রথম ১০ দিনে শোকানুষ্ঠান আয়োজনের ঐতিহ্য এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ডা. সেহতির বাড়ির আয়তন ৪০৯ বর্গমিটার এবং এটি কাজার যুগের শেষভাগে নির্মিত হয়েছিল। বাড়িটির সুন্দর ইটের সম্মুখভাগ ও প্রবেশদ্বার হলো প্রথম দৃশ্য, যা কোনো পর্যটকের নজরে পড়ে। একটি হাশতি (প্রথাগত অষ্টভুজাকার প্রবেশ কক্ষ) এবং কয়েকটি পুরোনো বাঁকানো সিঁড়ি প্রবেশপথকে বাড়ির উঠানের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাড়িটিতে একটি ভূগর্ভস্থ তলা ও দুটি উপরের তলা রয়েছে। বড় ভূগর্ভস্থ অংশে হাউজখানা (জলাধারযুক্ত কক্ষ), গুদাম এবং শীতল ভূগর্ভস্থ কক্ষ (সর্দাব) রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় একটি বড় হলঘর নির্মিত হয়েছে, যার দুই পাশে পৃথক কক্ষ রয়েছে। এই অংশটি অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য ব্যবহার করা হতো।
এই ভবনটি ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। এরপর ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে এটি মহররম নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে।
| তাবরিজের মহররম জাদুঘর, আজারবাইজানের মানুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি স্থান। | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| তাবরিজ | |
| Social |















