এজেন্সি
ওয়াহশি বাফকির বাড়ি: এক মহান কবির প্রাক্তন বাসভবন, যা জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে

ওয়াহশি বাফকির বাড়ি: এক মহান কবির প্রাক্তন বাসভবন, যা জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে

ওয়াহশি বাফকির বাড়ি: এক মহান কবির প্রাক্তন বাসভবন, যা জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে

নৃতত্ত্ব জাদুঘর পরিদর্শন মানুষের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার একটি বিশেষ সুযোগ। বাফক নৃতত্ত্ব জাদুঘর, যা ইরানের অন্যতম বিখ্যাত কবি ওয়াহশি বাফকির বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন এক জনগোষ্ঠীর জীবনকাহিনি তুলে ধরে যারা মরুভূমির কঠিন প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বসবাস করেছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি সমৃদ্ধ ও অর্থবহ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।

ওয়াহশি বাফকি কে ছিলেন?

কামালউদ্দিন বা শামসউদ্দিন মুহাম্মদ ওয়াহশি বাফকি ছিলেন একজন বিখ্যাত ইরানি কবি। তিনি ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে বাফক শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ইয়াজদ শহরে মৃত্যুবরণ করেন। শৈশবে ওয়াহশি বাফকি নিজের শহরেই শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি ইয়াজদে যান, সেখানে উপস্থিত শিক্ষকদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। কয়েক বছর ইয়াজদ ও কাশানে বসবাস করার পর তিনি ভারতে যান এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে আবার ইয়াজদ (অথবা কেরমান)-এ ফিরে আসেন।

ওয়াহশি বাফকি তাঁর পুরো জীবন দারিদ্র্যের মধ্যে কাটিয়েছেন। তাই তাঁর কবিতায় একাকীত্বের গভীর বেদনা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ব্যর্থ প্রেম, কঠিন জীবন এবং তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃখ-কষ্ট তাঁর গজলগুলোর প্রধান বিষয় হিসেবে দেখা যায়। ওয়াহশি বাফকির বেশ কয়েকটি কাব্যকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে ফরহাদ ও শিরিন ফারসি সাহিত্যের দুই বিখ্যাত প্রেমিক-প্রেমিকার কাহিনি তাঁর সবচেয়ে পরিচিত রচনাগুলোর একটি। এছাড়াও তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ (দিওয়ান) প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তাঁর গজল, কাসিদা এবং অন্যান্য কবিতা সংকলিত রয়েছে। এই গ্রন্থে মোট ,০৭৬টি পংক্তি (বেইত) রয়েছে।

ওয়াহশি বাফকির বাড়ি

ওয়াহশি বাফকির বাড়িটি ইয়াজদের জামে মসজিদের পূর্ব দিকে অবস্থিত এবং এটি চারদিক ঘেরা চতুর্ভুজ আকৃতির নকশায় নির্মিত। এই বাড়িটি ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় নিবন্ধিত হয়।

ইয়াজদ শহরের অন্যান্য অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো এই বাড়ি নির্মাণেও কাঁচা ইট (খেশ্ত) ও মাটি ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়াহশির বাড়িতে একটি বড় ও সুন্দর বারান্দা (আইওয়ান) এবং সাতটি ছোট ও পৃথক কক্ষ রয়েছে। এই কক্ষগুলো বাড়ির আঙিনার চারপাশে নির্মিত এবং বছরের বিভিন্ন ঋতুতে পরিবারের সদস্যরা এগুলো ব্যবহার করতেন। বাড়িটির পূর্ব অংশে একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষ (সর্দাব/বেসমেন্ট) রয়েছে, যেখানে অতীতে একটি পানির ধারা প্রবাহিত হতো। এই পানির প্রবাহ এবং আশপাশের তুলনায় নিচু অবস্থানে থাকা ভূগর্ভস্থ অংশের কারণে গ্রীষ্মকালে সেখানে ঠান্ডা পরিবেশ বজায় থাকত। এটি ইয়াজদের প্রচণ্ড গরম গ্রীষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অন্যান্য অংশের তুলনায় এই স্থানের তাপমাত্রা কম থাকায় এখানে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণও করা হতো।

কক্ষগুলোর আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে তুলনামূলক বড় ও একাধিক জানালার মাধ্যমে। এই জানালাগুলো সাধারণ নকশায় কাঠ দিয়ে তৈরি এবং সহজ খিলান আকৃতির ফ্রেমে স্থাপন করা হয়েছে। অতীতে বাড়ির দেয়ালে থাকা একটি পুরোনো সমাধিফলক (কবরের পাথর)-এর কারণে মানুষ এই স্থানটিকে পবিত্র মনে করত এবং সেখানে জিয়ারত করতে যেত। বর্তমানে সেই সমাধিফলকের কোনো চিহ্ন আর নেই।

ওয়াহশি বাফকি ও তাঁর বাড়ি

ওয়াহশি বাফকি তাঁর কবিতায় যেমন প্রকাশ করেছেন, তিনি তাঁর বাড়ির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। বহু ভ্রমণ করা সত্ত্বেও জীবনের শেষ বছরগুলোতে, ইয়াজদে বসবাস শুরু করার পর তিনি খুব কমই শহরের বাইরে যেতেন এবং নির্জন জীবনযাপন বেছে নিয়েছিলেন। ইয়াজদের প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতে প্রচলিত কথাও এই বিষয়টি নিশ্চিত করে। তাঁরা বলেন, জীবনের শেষ সময়ে ওয়াহশি প্রতিদিন বিকেলে আরুক নামে একটি গলির মুখে বসতেন এবং বয়স্ক লোকদের সঙ্গে কথোপকথন করতেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর পর তাঁকে সেই একই গলির বিপরীত পাশে সমাহিত করা হয়।

নৃতত্ত্ব জাদুঘর

বর্তমানে এই বাড়িটি বাফক নৃতত্ত্ব জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। এখানে এই মরুভূমি অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

এই জাদুঘরে প্রদর্শিত বিভিন্ন বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • পুরোনো অলংকার
  • ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার সরঞ্জাম
  • ভেষজ ওষুধ বিক্রির দোকানের (আতারি) উপকরণ
  • কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি
  • তাঁত বোনা ও লৌহশিল্পের সরঞ্জাম
  • মাটির ও ধাতুর তৈরি পাত্র
  • আলোর ব্যবহারের সামগ্রী
  • স্থানীয় পোশাক
  • বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প

এই বাড়ির ছোট বারান্দায় দেখা যায় হাতে চালানো সুতা কাটার চরকা, খেজুরপাতার তৈরি মাদুর এবং পাথরের তৈরি পাত্র। বাড়ির আঙিনায় কয়েকটি পুরোনো কূপের চাকাও রয়েছে। অতীতে এই কূপের চাকা কূপ থেকে মাটি ও আবর্জনা তোলার কাজে ব্যবহৃত হতো। বিশেষ করে কানাত (ভূগর্ভস্থ পানির পথ) খনন ও পরিষ্কার করার কাজে এই যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

 

ওয়াহশি বাফকির বাড়ি: এক মহান কবির প্রাক্তন বাসভবন, যা জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে
ইয়াজদ
বাফক
Social

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: