ইয়াজদ পানি জাদুঘর: মানুষের জীবনধারণের সংগ্রামের এক অনন্য প্রদর্শনী।
ইয়াজদ ইরানের একটি মরু শহর। শুষ্ক জলবায়ু ও অল্প বৃষ্টিপাতের কারণে এই শহরের জীবনযাত্রা পানির উৎসের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাই বহু প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ পানি স্থানান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যাতে এই মূল্যবান সম্পদ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায় এবং অপচয় সর্বনিম্ন হয়। ইয়াজদের পানি জাদুঘর কয়েক শতাব্দী ধরে মরু অঞ্চলের মানুষের মূল্যবান পানির উৎসে পৌঁছানোর নিরন্তর প্রচেষ্টার এক অনন্য নিদর্শন। ঐতিহাসিক আমির চাখমাক চত্বরের উত্তরে অবস্থিত এই জাদুঘরটি ২০০০ খ্রিস্টাব্দে কোলাহদুজ পরিবারের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইয়াজদের পানি জাদুঘরের ভবনের বৈশিষ্ট্য
যে কোলাহদুজ বাড়িতে ইয়াজদের পানি জাদুঘর অবস্থিত, সেটি কাজার যুগের শেষভাগে (ঊনবিংশ শতাব্দী) এই শহরের অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়ী হাজি আকবর কোলাহদুজ নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপত্যের দিক থেকে এটি পর্দানশীন বাড়িগুলোর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রায় ৭২০ বর্গমিটার আয়তনের এই বাড়িতে পৃথক আন্দরুনি (অভ্যন্তরীণ অংশ) ও বিরুনি (অতিথি গ্রহণের অংশ) রয়েছে এবং এটি পাঁচ তলাবিশিষ্ট।

কোলাহদুজ বাড়ির আঙিনা, যেখানে ইয়াজদের পানি জাদুঘর অবস্থিত।
এই ভবনের প্রতিটি তলার আলাদা ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য ছিল, যা নিম্নরূপ:
- প্রথম তলা: এই তলা দিয়ে রাহিমাবাদ ও জারচ এই দুটি কানাত (ভূগর্ভস্থ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা)-এর শাখা প্রবাহিত হয়েছে। জারচ কানাত ইয়াজদের অন্যতম প্রাচীন কানাত, যা প্রায় দুই হাজার বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কানাতে আজও পানির প্রবাহ বিদ্যমান।
- দ্বিতীয় তলা: এই তলাটি মাটির প্রায় ১০ মিটার নিচে অবস্থিত এবং অষ্টভুজাকার কাঠামোতে নির্মিত। এখানকার তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের তুলনায় প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম, তাই এটি খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই তলায় একটি পুকুর রয়েছে, যা সবসময় কানাতের শীতল পানিতে পূর্ণ থাকত। এটি আসলে কানাতের পায়াব, অর্থাৎ এমন একটি স্থান যেখানে কানাতের গভীরতা কম থাকায় সহজেই পানি সংগ্রহ করা যায়।
ইয়াজদের পানি জাদুঘরের দ্বিতীয় তলার ছাদ থেকে একটি কাঠের ঝুড়ি ঝুলছে। অতীতে এতে পনির, ঘি ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী রাখা হতো। এছাড়া ছাদ থেকে আরও কয়েকটি হুক ঝুলিয়ে রাখা ছিল, যেখানে মাংস ঝুলিয়ে সংরক্ষণ করা হতো।
- তৃতীয় তলা: এটি কোলাহদুজ বাড়ির ভূগর্ভস্থ অংশ। এখানে একাধিক করিডোর ও কক্ষ রয়েছে, যা গ্রীষ্মকালে পরিবারের সদস্যদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হতো।
- চতুর্থ তলা: এটি বাড়ির ভূমিতল। এখানে পাঁচ দরজার কক্ষ, বাতাস ধরার মিনার (বাদগির)-সংবলিত কক্ষ, প্রধান হল, রঙিন কাচের ওরসি জানালা, রান্নাঘর, পানির সংরক্ষণাগার এবং কর্মচারীদের থাকার জায়গা রয়েছে। এই তলায় দুটি পুকুর রয়েছে এবং দেয়ালগুলো মুকারনাস, গচকাজ (প্লাস্টার অলংকরণ) ও আয়নাকাজ দিয়ে সজ্জিত। এসব অলংকরণ শিল্পমূল্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এতে উদ্ভিদ ও পাখির নকশা ব্যবহৃত হয়েছে।
- পঞ্চম তলা: এটি মূলত বাড়ির ছাদ। এখানে একটি কূপঘর রয়েছে। এই তলায় স্থাপিত কূপের চাকা ব্যবহার করে ‘চেহেল গজ’ নামে পরিচিত কূপগুলো থেকে পানি তোলা হতো, যা পান করা ও দৈনন্দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত হতো।
কোলাহদুজ বাড়ির ইয়াজদের পানি জাদুঘরে রূপান্তর
ইয়াজদে একটি পানি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রথম উত্থাপিত হয় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে এর এক বছর পর কোলাহদুজ বাড়িকে পানি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়, যাতে পানি আহরণ, সংরক্ষণ ও স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন উপকরণ ও নিদর্শন প্রদর্শন করা যায়।

পানি সংরক্ষণ ও ঠান্ডা রাখার জন্য ব্যবহৃত মাটির কলস।
কোলাহদুজ বাড়িকে ইয়াজদের পানি জাদুঘরের স্থান হিসেবে নির্বাচন করার পেছনে কয়েকটি বিশেষ সুবিধা ছিল:
১. কোলাহদুজ বাড়িটি ইয়াজদের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র আমির চাখমাক চত্বরের নিকটে অবস্থিত। পাশাপাশি এর সুন্দর স্থাপত্য ও অনন্য অলংকরণ এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
২. এই ভবনে পায়াব (কানাত থেকে পানি সংগ্রহের স্থান), সারদাব (ভূগর্ভস্থ শীতল কক্ষ), কূপঘর, কূপের চাকা, পানির সংরক্ষণাগার এবং কানাতসহ পানিসংক্রান্ত বহু স্থাপনা ও ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল।

কিছু কানাতের প্রবাহপথে পানিচালিত চাকার (জলচক্রের) কল স্থাপন করা হতো।
ইয়াজদের পানি জাদুঘর ও সেখানে সংরক্ষিত নিদর্শনসমূহ
ইয়াজদের পানি জাদুঘরে পানি আহরণ ও স্থানান্তরের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ২০০টি নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। কানাত খননের সরঞ্জাম, কানাত-সংক্রান্ত দলিলপত্র, আলোর ব্যবস্থা, পানি ও খাদ্য বহনের উপকরণ যেমন মাটির কলস, পানি পানের পাত্র, কূপের চাকা এবং চামড়ার মশক, পানি বণ্টনের সরঞ্জাম (তাস ও সারজেহ) এবং পানির শক্তি ব্যবহারের বিভিন্ন উপকরণ এসবই ইয়াজদের পানি জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে। এসব নিদর্শন তামা, পিতল, কাচ, মাটির পাত্র (মৃৎপাত্র) ও কাঠ দিয়ে তৈরি।
জাদুঘরে সংরক্ষিত সব নিদর্শনের মধ্যে তেলের প্রদীপ সবচেয়ে প্রাচীন। এগুলো একটি সুতির সলতে এবং একটি তেলের আধার নিয়ে গঠিত। এছাড়া এই জাদুঘরে কার্বাইড বাতি নামের আরেক ধরনের প্রদীপও রয়েছে, যা চুনাপাথরের মতো সাদা রঙের কার্বাইড পাথর ব্যবহার করে তৈরি করা হতো।

কূপের তলা থেকে পানি তোলার জন্য ব্যবহৃত পানির বালতি।
জাদুঘরে একটি পানির ঘড়িও সংরক্ষিত রয়েছে, যাকে প্রাচীনকালে “সাবুকেশি” বলা হতো। এই ঘড়িটি সময় পরিমাপের একটি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সাবুকেশি একটি তামার পাত্র দিয়ে তৈরি, যার তলায় একটি ছোট ছিদ্র থাকত। এটি একটি বড় পানিভর্তি পাত্রের মধ্যে রাখা হতো এবং ধীরে ধীরে এতে পানি প্রবেশ করত। একটি পূর্ণ বাটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি একক হিসেবে গণ্য করা হতো, যাকে “সাবু” বলা হতো। বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মধ্যে পানি বণ্টনের সময় নির্ধারণের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো।
ইয়াজদের পানি জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন নিদর্শন ইরানি জনগণ এবং ইরানের মরু অঞ্চলের বাসিন্দাদের পানি সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় বহন করে। এটি এমন এক প্রচেষ্টার প্রতিফলন, যা সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও জীবনকে সম্ভব ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছিল।
| ইয়াজদ পানি জাদুঘর: মানুষের জীবনধারণের সংগ্রামের এক অনন্য প্রদর্শনী। | |
| ইয়াজদ | |
| ইয়াজদ | |
| Science and Technology | |
| https://watermuseum.yzrw.ir/ |











