এজেন্সি
আরদাকানের ইসার ও শাহাদাতের (ত্যাগ ও শহীদদের) সংগ্রহশালায় ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়।

আরদাকানের ইসার ও শাহাদাতের (ত্যাগ ও শহীদদের) সংগ্রহশালায় ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়।

আরদাকানের ইসার ও শাহাদাতের (ত্যাগ ও শহীদদের) সংগ্রহশালায় ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়।

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (ইরানি সৌর বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১৩৫৯ সালের শাহরিয়ার মাসে) ইরাকের বাথ শাসিত সেনাবাহিনীর ইরানের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটি শুরু হয়।

এই যুদ্ধে ইরাক যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছিল এবং প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি অপ্রচলিত ও আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করেছিল। অন্যদিকে, ইরান সদ্য একটি বৃহৎ বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাহকে দেশ থেকে অপসারণ করে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছিল। ফলে দেশটির সামরিক কাঠামো তখন দুর্বল ছিল এবং অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রেও কঠোর চ্যালেঞ্জ ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

তবুও, ইরানি তরুণরা এই সর্বাত্মক আক্রমণ ও অসম যুদ্ধে সাহস, বীরত্ব এবং আত্মত্যাগের পরিচয় দেন, যা এক অনন্য বীরত্বগাথা হিসেবে বিবেচিত হয়। আট বছরব্যাপী এই যুদ্ধের সময় তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হন।

আজ যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন দশকেরও বেশি সময় পরে, যুদ্ধে নিহত এবং অংশগ্রহণকারী ইরানি যোদ্ধাদের এই বৃহৎ ঘটনার গৌরবের প্রতীক হিসেবে সম্মান করা হয়। তাঁদের স্মরণে ইরানের বিভিন্ন স্থানে জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

"আরদাকানের ইসার ও শাহাদাত (ত্যাগ ও শহীদ স্মৃতি) সংগ্রহশালা" এমনই একটি স্মারক, যা এমন এক শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধে আত্মত্যাগ ও শহীদ প্রদানের দিক থেকে অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত।

আরদাকান কোথায় অবস্থিত?

আরদাকান ইরানের ইয়াজদ প্রদেশের একটি জেলা। আরদাকান শহর এই জেলার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ইয়াজদ শহরের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৬১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

অনেকে মনে করেন, "আরদাকান" নামটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত "আরদ" অর্থ পবিত্র এবং "কান" অর্থ ভূমি বা স্থান। এই অর্থে আরদাকানের অর্থ দাঁড়ায় "পবিত্র ভূমি"। এছাড়া কিছু ইতিহাসবিদের মতে, এই অঞ্চলের নামটি পাহলভি ভাষার "আরতাকান" বা "আরতাকন" শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যনিষ্ঠা

এই অঞ্চলের ইতিহাস ইসলামের পরবর্তী যুগে (খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর পর) ফিরে যায়। এখানে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক দুর্গ ও বাড়ি রয়েছে, যা দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।

আরদাকানের জলবায়ু শুষ্ক ও মরুভূমি ধরনের। ইরানের ইয়াজদ প্রদেশসহ অন্যান্য মরুভূমি অঞ্চলের মতোই, এই এলাকার জীবনযাত্রা ইতিহাসজুড়ে কানাত (ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ বা প্রাচীন সেচব্যবস্থা)-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল।

 

আরদাকানের ইসার ও শাহাদাত সংগ্রহশালা: বৈশিষ্ট্য ও বিভাগসমূহ

এই সংগ্রহশালাটি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে, যেখানে আরদাকান জেলার শহীদ, আহত যোদ্ধা (জানবাজ) এবং আত্মত্যাগকারীদের স্মৃতিচিহ্ন ও ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষিত আছে।

"৪২০ শহীদের গলি" হলো এই সংগ্রহশালায় প্রবেশের পর দর্শনার্থীরা প্রথম যে অংশটির মুখোমুখি হন। আরদাকান জেলার ৪২০ জন শহীদের স্মরণে এই অংশটি তৈরি করা হয়েছে। এটি আরদাকান শহরের মরুভূমি অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি ঐতিহ্যবাহী নকশায় নির্মিত হয়েছে।

এরপর ইরান ও আরদাকান জেলার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রদর্শনী কক্ষ বা স্টল তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি স্টলে পাহলভি যুগের (১৯২৫ থেকে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে।

রেজা পাহলভি ছিলেন পাহলভি রাজবংশের প্রথম শাহ (রাজা), যিনি ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তাঁর পর তাঁর পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৭৮ সালের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত শাসন করেন।

পাহলভি আমলে ইরানের জনগণ স্বৈরশাসনের মধ্যে জীবনযাপন করত এবং তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোর প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতো। এই প্রদর্শনী কক্ষে পাহলভি সরকারের কিছু নির্যাতন ও অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ করে সাভাক (দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা)-এর কার্যক্রমের মাধ্যমে সংঘটিত ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

অন্য একটি প্রদর্শনী কক্ষ, যার নাম "আরদাকানের বিপ্লবের গলি", সেখানে ইসলামী বিপ্লবের সময় আরদাকান জেলার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

আরেকটি কক্ষে ইরান-ইরাক যুদ্ধের (আরদাকানে যাকে "পবিত্র প্রতিরক্ষা" বলা হয়) প্রাথমিক ঘটনাবলি এবং বাথ বাহিনীর খোররামশহর আক্রমণ পর্যালোচনা করা হয়েছে।

"আরোহনের সিঁড়ি যা প্রথম তলাকে দ্বিতীয় তলার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই সিঁড়ির ছাদে প্রায় ১০ হাজারটি পরিচয়ফলক স্থাপন করা হয়েছে, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আরদাকানের ১০ হাজার যোদ্ধার প্রতীক। এই অংশের দেয়ালেও এমন কিছু নকশা দেখা যায়, যা গুলির খোসা (কার্তুজের খোল) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় তলার প্রবেশপথটি প্রতীকীভাবে জোরখানা (ইরানের ঐতিহ্যবাহী কুস্তি ও বীরত্বচর্চার স্থান)-এর প্রবেশদ্বারের আদলে নির্মিত হয়েছে। জোরখানার ঐতিহ্য অনুযায়ী এই প্রবেশপথের উচ্চতা মানুষের স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে কিছুটা কম রাখা হয়েছে। সেখানে একটি ঘণ্টা ও একটি জারব (ঐতিহ্যবাহী তালবাদ্য) দেখা যায়।

প্রাচীন ইরানি ঐতিহ্যের প্রতি ইঙ্গিত করার পাশাপাশি, এই নকশা শহীদদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের মানসিকতাকেও তুলে ধরে।

দ্বিতীয় তলায় আরদাকানের শহীদদের বিভিন্ন স্মারক ও ছবি শ্রেণিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে। এই তলায় আরও কিছু করিডোর ও প্রদর্শনী কক্ষ রয়েছে, যার প্রতিটিতে পবিত্র প্রতিরক্ষা যুগে (ইরান-ইরাক যুদ্ধকালীন সময়ে) আরদাকানের যোদ্ধা ও শহীদদের বীরত্বগাথার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

আরদাকানের ইসার ও শাহাদাতের (ত্যাগ ও শহীদদের) সংগ্রহশালায় ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়।
ইয়াজদ
আরদাকান

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: