এজেন্সি
শিরাজের পার্স জাদুঘর, ইরানের ৫০০০ বছরের ইতিহাসের নিদর্শনসমূহের একটি প্রদর্শনী।

শিরাজের পার্স জাদুঘর, ইরানের ৫০০০ বছরের ইতিহাসের নিদর্শনসমূহের একটি প্রদর্শনী।

শিরাজের পার্স জাদুঘর, ইরানের ৫০০০ বছরের ইতিহাসের নিদর্শনসমূহের একটি প্রদর্শনী।

শিরাজের পার্স জাদুঘর আয়তনে ছোট হলেও স্থাপত্য, ভবন নির্মাণশৈলী এবং সেখানে প্রদর্শিত নিদর্শনের দিক থেকে এটি অত্যন্ত অনন্য ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। এই জাদুঘর ভবনটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে (খ্রিস্টীয় ১৮শ শতক) "বাগে নজর" (নজর উদ্যান) নামে পরিচিত একটি বাগানে নির্মিত হয়। এই ভবন নির্মাণ ছিল কারিম খান জন্দের জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা স্থাপত্য প্রকল্পের একটি অংশ। কারিম খানি দুর্গ, ওয়াকিল মসজিদ, ওয়াকিল বাজার এবং ওয়াকিল হাম্মাম এসব স্থাপনাও নজর উদ্যানের আশপাশে নির্মিত হয়েছিল।

শিরাজের পার্স জাদুঘরের অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য

জান্দিয়া যুগে নজর উদ্যান কারিম খানি দুর্গের বিপরীতে নির্মিত হয়েছিল। পূর্বে এই বাগানের আয়তন আরও বড় ছিল। পার্স জাদুঘরটি এমন একটি ভবনে অবস্থিত, যাকে "কোলাহ ফারাঙ্গি" বলা হয়।

জাদুঘর ভবনটি বাইরে থেকে দেখতে অষ্টভুজাকৃতির। ভবনের বাইরের অংশে ফুল ও গাছের নকশাযুক্ত টাইলসের কারুকাজ একটি মনোমুগ্ধকর সামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে, যা দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যদিও বাইরে থেকে ভবনটি সেই সময়ের নির্মিত কিছু সমাধির মতো মনে হয়, তবে এর প্রাণবন্ত বাইরের অলংকরণ ও টাইলসের কাজ বাগানের সতেজতা ও সৌন্দর্যের অনুভূতি দর্শকের মনে জাগিয়ে তোলে। কারিম খান জন্দ তাঁর শাসনামলে এই ভবনে সরকারি কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আপ্যায়ন করতেন।

পার্স জাদুঘরটি ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে এই ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে প্রাচীন ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শনের একটি সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ দেয়ালগুলো জান্দিয়া যুগের চিত্রকর্ম দিয়ে সজ্জিত, যেখানে গাঢ় লাল ও সোনালি রঙের সমন্বয় ব্যবহার করা হয়েছে যার অনুরূপ কারুকাজ কারিম খানি দুর্গেও দেখা যায়। এই ধরনের অলংকরণ এবং জাদুঘরে প্রদর্শিত প্রাচীন নিদর্শনের সমন্বয় দর্শকদের এক অনির্বচনীয় অনুভূতি প্রদান করে।

পার্স জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ স্থানটি ক্রুশাকৃতির (চলিপা আকৃতি) বলে মনে হয়। এর প্রতিটি পাশে কাঁচের প্রদর্শনী বাক্সে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বস্তু সাজানো রয়েছে। ভবনের চার পাশে চারটি জলাধার বা ফোয়ারা ছিল। উত্তরের দিকের জলাধারটি রাস্তার পথে অবস্থান করায় বর্তমানে ধ্বংস হয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ অংশে চারটি পার্শ্বীয় রাজকীয় কক্ষ (শাহনেশিন) রয়েছে।

শিরাজের পার্স জাদুঘরের দর্শনীয় নিদর্শনসমূহ

পার্স জাদুঘর ফার্স প্রদেশের সবচেয়ে প্রাচীন জাদুঘর। এখানে মূল্যবান ধাতব সামগ্রী, মাটির তৈরি পাত্র, বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা ও সিলমোহর সংরক্ষিত রয়েছে। এই জাদুঘরের নিদর্শনগুলোর প্রাচীনত্ব খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

ইসলাম-পূর্ব যুগের নিদর্শন

এই জাদুঘরে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের মাটির তৈরি কলস, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের লাল রঙের ঠোঁটাকৃতির নলযুক্ত পাত্র, এবং দারাবের হাজি আবাদ এলাকায় আবিষ্কৃত সাসানীয় যুগের একটি ভাস্কর্যের মাথা (সারদিস) দেখা যায়। এছাড়াও লোরেস্তান থেকে আবিষ্কৃত খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের ব্রোঞ্জের তৈরি পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রীও এখানে প্রদর্শিত রয়েছে।

পার্স জাদুঘরের মূল্যবান কুরআনসমূহ

এই জাদুঘরে অষ্টম হিজরি চন্দ্র শতাব্দীতে (চতুর্দশ খ্রিস্টীয় শতাব্দী) জীবিত থাকা ইয়াহইয়া আল-জামালি আল-সুফির হাতের লেখা ৩০ খণ্ড কুরআন সংরক্ষিত রয়েছে।

এছাড়াও এখানে সতেরো মণ ওজনের কুরআন (কুরআনে হাফদাহ মণ নামে পরিচিত) প্রদর্শিত আছে, যা একসময় শিরাজের প্রবেশদ্বারে স্থাপিত ছিল। এটি তৈমুরি শাসক সুলতান ইব্রাহিম ইবনে শাহরুখ তিমুরির নির্দেশে এবং মুহাক্কাক লিপিতে লেখা হয়েছিল।

এই কুরআনের ওজন প্রায় ৪০ কিলোগ্রাম এবং এর আকার ৪৮ × ৭২ সেন্টিমিটার

জাদুঘরের চিত্রকর্মসমূহ

এই জাদুঘরে সমকালীন ইরানি চিত্রশিল্পী লুৎফআলী সুরতগরের (লতফআলী সুরতগর) আঁকা কয়েকটি জলরঙের চিত্রকর্মও দেখা যায়। এছাড়াও এই জাদুঘরে বিখ্যাত "কারিম খানকে হুক্কা পানরত অবস্থায়" চিত্রটি সংরক্ষিত রয়েছে, যা "জাফর" নামের একজন শিল্পী এঁকেছিলেন। পার্স জাদুঘরে আরও বেশ কিছু চিত্রকর্ম রয়েছে, যার মধ্যে কিছু বিখ্যাত ছবি বিভিন্ন সময়ে বাড়িঘর ও কফিহাউসের (চায়ের আড্ডাখানা) সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হতো।

কারিম খানের সমাধি

কারিম খান জন্দ ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে  মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তাঁর ইচ্ছাপত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে, তাঁর মরদেহ যেন এই ভবনের পূর্ব দিকের শাহনেশিনে সমাহিত করা হয়।

১৩ বছর পর, আগা মুহাম্মদ খান কাজার, যিনি কাজার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং জন্দ পরিবারের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করতেন, কারিম খানের কবর থেকে তাঁর অস্থি বের করে গুলিস্তান প্রাসাদে নিয়ে যান। কারিম খানের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি সেই অস্থি সিঁড়ির নিচে সমাহিত করেন।

পরবর্তীতে রেজা শাহ পাহলভি (যাঁর শাসনকাল ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ জন্দ পরিবারের সম্মান পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সিঁড়ির নিচ থেকে অস্থিগুলো বের করে শিরাজে নিয়ে আসেন এবং পূর্বের নির্ধারিত স্থানে যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে পুনরায় সমাহিত করেন।

শিরাজের পার্স জাদুঘর, ইরানের ৫০০০ বছরের ইতিহাসের নিদর্শনসমূহের একটি প্রদর্শনী।
ফার্স
শিরাজ

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: