এজেন্সি
মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘর সেই স্বর্ণযুগের সাক্ষ্য বহন করে, যখন মারাঘা ছিল সমৃদ্ধি ও গৌরবের শীর্ষে।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘর সেই স্বর্ণযুগের সাক্ষ্য বহন করে, যখন মারাঘা ছিল সমৃদ্ধি ও গৌরবের শীর্ষে।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘর সেই স্বর্ণযুগের সাক্ষ্য বহন করে, যখন মারাঘা ছিল সমৃদ্ধি ও গৌরবের শীর্ষে।

জাদুঘর একটি দেশের মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি বহন করে। প্রতিটি জাদুঘরে সংশ্লিষ্ট সভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান ও উৎকৃষ্ট নিদর্শন সংরক্ষিত থাকে। পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মারাঘায়, এই শহরের প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক ওহাদি মারাঘাইয়ের সমাধির পাশে ‘ইলখানীয় জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাদুঘর ও সমাধিসৌধের ভবন ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে (১৩৫৩–১৩৫৭  হিজরি শামসি) নির্মিত হয়।

মঙ্গোল ইলখানীয় শাসনামল (১৩শ ও ১৪শ শতাব্দী খ্রিস্টাব্দ) মারাঘার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সময়ে শহরটি সমৃদ্ধি লাভ করে এবং ইরানের রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত হয়। মারাঘায় আজও যে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা টিকে আছে, যার কয়েকটি ইরানের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত, সেগুলোর অধিকাংশই এই ইলখানীয় যুগে নির্মিত হয়েছিল।

 

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘর ১৯৮৪ সালে (১৩৬৩ হিজরি শামসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে (১৩৭৫ হিজরি শামসি) মারাঘার ইতিহাসে ইলখানীয় রাজবংশের বিশেষ গুরুত্বের কারণে এই জাদুঘরের নাম পরিবর্তন করে ইলখানীয় বিশেষায়িত জাদুঘর রাখা হয়। বর্তমানে এখানে ইলখানীয় যুগের বহু মূল্যবান নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, টাইলস ও পাত্র, ইলখানীয় আমলের মুদ্রা, কাচ ও ধাতব নির্মিত বস্তু এবং কয়েকটি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি।

জাদুঘরের একটি বিশেষ অংশ কিতাবত’ (হস্তলিপি) বিভাগ নামে পরিচিত। এখানে কয়েকশ বছর প্রাচীন কোরআনের একাধিক পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি কোরআন বিশ্বের প্রাচীনতম অনূদিত কোরআনগুলোর অন্যতম। এই পাণ্ডুলিপিটি সোনালি অলংকরণে সজ্জিত এবং চীনে প্রস্তুত বিশেষ কাগজে লেখা হয়েছে।

তবে ইলখানীয় জাদুঘরে শুধু ইলখানীয় যুগের নিদর্শনই নয়, ইরানের অন্যান্য ঐতিহাসিক যুগের মূল্যবান সামগ্রীও সংরক্ষিত আছে। এর কিছু নিদর্শন সাসানীয়, পার্থীয় (আশকানীয়) এবং সাফাভীয় যুগের। এছাড়া তিমুরীয় আমলের শেখ বাবা মসজিদের শিলালিপি ও স্তম্ভ, আফশারীয় যুগের কামানের গোলা (১৮শ শতাব্দী), মারাঘার ঐতিহাসিক মানমন্দির ও গম্বুজ-সম্পর্কিত কিছু নিদর্শন, প্রাগৈতিহাসিক যুগের কয়েকটি বস্তু এবং তৃতীয় শতাব্দীর মুদ্রা এসবই এই জাদুঘরের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরের মুদ্রা সংগ্রহ

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরে ইলখানীয় যুগের মুদ্রার অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে। ইলখানীয় শাসনামলে বিশেষ উৎসব বা গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ স্মরণে স্মারক মুদ্রা তৈরি করা হতো এবং তামার মুদ্রা দৈনন্দিন লেনদেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। সে সময় মারাঘা, তাবরিজ ও সুলতানিয়া ছিল রাষ্ট্রের প্রধান টাকশাল (মুদ্রা নির্মাণকেন্দ্র)। ইলখানীয় যুগের অধিকাংশ মুদ্রায় কোরআনের আয়াত, খুলাফায়ে রাশেদীনের নাম এবং শিয়া ইমামদের নামের মতো ইসলামী অলংকরণ ও লিপি খোদাই করা থাকত।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরের মৃৎশিল্প সংগ্রহ

মৃৎশিল্প ইলখানীয় যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত হস্তশিল্প ছিল। এ সময় মৃৎশিল্প এমন উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যে, একে মৃৎশিল্পের স্বর্ণযুগ বলা যায়। এই সময়ে মৃৎপাত্রে নতুন নতুন অলংকরণ ও উন্নত কারিগরি কৌশল প্রয়োগ করা হয়। ইলখানীয় যুগের মৃৎপাত্রে জ্যামিতিক নকশা, উদ্ভিদ-অলংকরণ, আরাবেস্ক (ইসলামী লতাপাতার) নকশা, শিকাররত বা ভোজসভায় অংশগ্রহণকারী মানুষের চিত্র, হরিণ, মাছ ও পাখির ছবি, এবং ফারসি কবিতা ও প্রবাদবাক্যের ক্যালিগ্রাফি দেখা যায়।

এই বিভাগের অন্যতম আকর্ষণ হলো স্বচ্ছ গ্লেজযুক্ত একটি পাত্র, যার গায়ে মানুষের মাথাবিশিষ্ট একটি প্রাণীর চিত্র অঙ্কিত রয়েছে। এই নিদর্শনটি প্রমাণ করে যে, ইলখানীয় যুগে ইসলাম-পূর্ব ইরানে প্রচলিত কিছু নকশা ও প্রতীক আবারও শিল্পকলায় ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরের কাচশিল্প বিভাগ

ইরানের ইতিহাসের কিছু সময়ে কাচশিল্প এতটাই উন্নত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, এ ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কৌশলের উদ্ভব ঘটে। এর ফলে ইরানি কাচশিল্পীরা তাঁদের সময়ের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের মধ্যে স্থান করে নেন। তবে ইলখানীয় যুগে অনেক ইরানি কাচশিল্পী মিসর ও শাম (সিরিয়া-লেভান্ত অঞ্চল) অভিমুখে চলে যাওয়ায় ইরানে কাচশিল্পের বিকাশে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেয়। মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরে সেই সময়ের বিরল কাচের পাত্র ও অলংকারসামগ্রীর কয়েকটি অনন্য নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘরের ধাতুশিল্প বিভাগ

এই বিভাগে প্রদর্শিত নিদর্শনগুলো ইলখানীয় যুগে ধাতুশিল্পের উচ্চমান ও শিল্পনৈপুণ্যের সাক্ষ্য বহন করে। এখানে বিভিন্ন ধরনের ব্রোঞ্জের তেলের প্রদীপ (পিয়েহ-সুজ) এবং ব্রোঞ্জের মোমদান প্রদর্শিত হয়েছে। এগুলো ঢালাই পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছিল এবং পরে খোদাই (ক্যালিগ্রাফিক ও অলংকারমূলক নকশা) ও স্বর্ণমণ্ডনের মাধ্যমে শোভিত করা হয়েছিল, যা সে যুগের ধাতুশিল্পের উৎকর্ষকে তুলে ধরে।

মারাঘার ইলখানীয় জাদুঘর সেই স্বর্ণযুগের সাক্ষ্য বহন করে, যখন মারাঘা ছিল সমৃদ্ধি ও গৌরবের শীর্ষে।
পূর্ব আজারবাইজান
তাবরিজ

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: