জাদুঘর

আফিফ-আবাদ বাগানের জাদুঘরসমূহ: ইরানের মূল্যবান সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শনী।

আফিফ-আবাদ বাগানের জাদুঘরগুলোতে ইরানি রাজা ও যোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্রসহ মূল্যবান সামরিক সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে।

আফিফ-আবাদ বাগান, যা গুলশান বাগান নামেও পরিচিত, শিরাজের অন্যতম ঐতিহাসিক বাগান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বাগানে হাখামানেশি (আকেমেনীয়), সাসানীয় এবং কাজার যুগের স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তবে এই বাগানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এর ভেতরে অবস্থিত জাদুঘরগুলো।

আফিফ-আবাদ বাগানের জাদুঘরগুলোতে ইরানের সামরিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলো এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরে।

এই বাগানটি ১৯৭২ সালে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। একই নামের রাস্তায় অবস্থিত এই বাগানে পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সামরিক জাদুঘর রয়েছে। বাগানের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম এবং প্রাচীন কামান দেখা যায়। এই বাগানের মোট আয়তন প্রায় ১,২৭,০০০ বর্গমিটার।

 

আফিফ-আবাদ বাগানের ইতিহাস

শিরাজের অনেক বাগানের তুলনায় আফিফ-আবাদ বাগান অধিক প্রাচীন। এই বাগানটি সাফাভি যুগে (ষোড়শ শতাব্দী) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি ইরানের রাজাদের অন্যতম প্রধান বিনোদনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

শাহ আব্বাস সাফাভির শাসনামলে (১৫৮৭–১৬২৯ খ্রিস্টাব্দ) ফার্স প্রদেশের শাসক ইয়াকুব খান জুলকাদর এই বাগানের একটি অংশে একটি শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেন। সাফাভি শাসনের অবসানের পর (অষ্টাদশ শতাব্দী) দুর্গটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং বাগানটি ধীরে ধীরে তার জৌলুস হারায়।

কাজার যুগে (ঊনবিংশ শতাব্দী) আলি খান কাওয়াম-ওল-মোলক আফিফ-আবাদ বাগানটি কিনে নেন এবং এর সংস্কার শুরু করেন। তিনি বাগানের মাঝখানে দুই তলা বিশিষ্ট একটি বড় ভবন নির্মাণ করেন। এই ভবনটি এখনো আফিফ-আবাদ বাগানে বিদ্যমান রয়েছে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সেনাবাহিনীর উদ্যোগে এখানে দুটি জাদুঘর সামরিক অস্ত্র জাদুঘর এবং ইবরত জাদুঘর (স্মৃতির মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার জাদুঘর )স্থাপন করা হয়েছে।

আলি খান কাওয়াম-ওল-মোলক বাগানের সেচের জন্য কাসর-এ কোমশেহ অঞ্চল থেকে লিমক কানাত (প্রাচীন ভূগর্ভস্থ জলসেচ ব্যবস্থা) ক্রয় করেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাগানটি তাঁর ভাগ্নি আফিফা খানমের কাছে চলে যায়। তিনি বাগানে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন করেন। এ কারণেই বাগানটি পরবর্তীতে “আফিফ-আবাদ” নামে পরিচিত হয়।

পাহলভি রাজবংশ ক্ষমতায় আসার পর, ১৯৬০-এর দশকে এই বাগানটি মুহাম্মদ রেজা পাহলভির স্ত্রী ফরাহ পাহলভিকে উপহার দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে (১৩৭০ হিজরি সৌর) এই বাগানটি ইরানের দ্বিতীয় সামরিক জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়।

আফিফ-আবাদ বাগানের ভবন ও স্থাপত্য

রাজকীয় প্রাসাদ, হাম্মাম (স্নানাগার), ঐতিহ্যবাহী কফিহাউস এবং ইরানি বাগান—এই চারটি অংশ নিয়ে আফিফ-আবাদ বাগান গঠিত। বাগানের প্রবেশপথ উত্তর দিকে অবস্থিত এবং সেখানে চারটি প্লাস্টারের তৈরি স্তম্ভ দেখা যায়। প্রবেশপথের স্তম্ভশীর্ষের প্লাস্টারের অলংকরণ হাখামানেশি যুগের তাখ্তে জামশিদ (পার্সেপোলিস)-এর নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে।

প্রবেশদ্বারটি একটি করিডরের মাধ্যমে বাগানের মূল অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই করিডরের দুই পাশে কয়েকটি কক্ষ রয়েছে, যা অতীতে কর্মচারীদের থাকার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

রাজকীয় প্রাসাদ

আফিফ-আবাদ বাগানের প্রধান স্থাপনা হলো রাজকীয় প্রাসাদ, যা বাগানের কেন্দ্রে অবস্থিত। এই ভবনে প্রবেশ করা যায় এর উত্তর দিক দিয়ে। একটি সিঁড়ি দর্শনার্থীদের একটি ছাদযুক্ত হলের দিকে নিয়ে যায়।

সিঁড়ির সামনে একটি কামানগাড়ি (আর্টিলারি ক্যারেজ) দেখা যায়, যেখানে পাহলভি রাজবংশের প্রথম শাসক রেজা পাহলভির (১৯২৫–১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ) মরদেহ বহন করা হয়েছিল। একই স্থানে একটি যুদ্ধকামানও রয়েছে, যা কাজার রাজবংশের ফাতহ আলী শাহের (১৭৯৭–১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ) ব্যবহৃত ছিল।

এই ভবনের প্রধান সম্মুখভাগ, যেখানে বর্তমানে আফিফ-আবাদ বাগানের জাদুঘরগুলো অবস্থিত, পূর্বমুখী। ভবনের পুরো দৈর্ঘ্যজুড়ে একটি বারান্দা রয়েছে, যেখানে চারটি উঁচু স্তম্ভ এবং কাঠের আবরণযুক্ত ছাদ রয়েছে। ছাদটি তেলরঙের চিত্রকর্ম দিয়ে সজ্জিত। ভবনের শীর্ষভাগে একজন সাসানীয় রাজার রাজ্যাভিষেকের দৃশ্য চিত্রিত করা হয়েছে।

এই ভবনটি দুই তলা বিশিষ্ট এবং এতে মোট প্রায় ৩০টি কক্ষ রয়েছে। এর পশ্চিম দিকের সম্মুখভাগ পূর্ব দিকের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সরল, আর দক্ষিণ দিকের সম্মুখভাগ উত্তর দিকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

আফিফ-আবাদ বাগানের জাদুঘরসমূহ

ভবনের প্রথম তলাটি সামরিক জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। এখানে বিভিন্ন যুগের যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে। জাদুঘরের উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ইরানের রাজাদের ব্যবহৃত বন্দুক যেমন ফাতহ আলী শাহ, নাসেরউদ্দিন শাহ, রেজা শাহ এবং মুহাম্মদ রেজা শাহের অস্ত্র। এছাড়াও জাঙ্গল আন্দোলনের যোদ্ধাদের অস্ত্র এবং রইস আলী দেলওয়ারির মেশিনগান এই জাদুঘরের আকর্ষণীয় সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত।

আফিফ-আবাদ বাগানের জাদুঘরসমূহের আরেকটি অংশের নাম ইবরত জাদুঘর। এটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত। দ্বিতীয় তলায় একটি দীর্ঘ করিডর রয়েছে, যার দুই পাশে সম্মেলন কক্ষ, পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ, বসার ঘর, পাঠকক্ষ এবং অতিথি আপ্যায়নের কক্ষ দেখা যায়।

এই তলার মাঝামাঝি অংশে একটি বড় হল নির্মিত হয়েছে। হলটির দেয়ালে প্লাস্টারের কারুকাজ ও কাঠের খোদাই (মনবতকরি) রয়েছে এবং কাঠের ছাদটি সুন্দর ফুল ও লতাপাতার নকশায় সজ্জিত।

ফরাহ পাহলভির ব্যক্তিগত পিয়ানো, যা ২৫০০ বছর পূর্তি উদযাপনের সময় তাকে উপহার দেওয়া হয়েছিল, এই জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।