এজেন্সি
সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর: ইরানের ১০টি জাদুঘরের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগ্রহশালা।

সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর: ইরানের ১০টি জাদুঘরের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগ্রহশালা।

সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর: ইরানের ১০টি জাদুঘরের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগ্রহশালা।

তেহরানের সাদাবাদ প্রাসাদ প্রথমে কাজার রাজবংশের (১৭৯৬১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ) শাহদের গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু পাহলভি যুগে (১৯২৫১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রাসাদটির সম্প্রসারণ ও আরও কিছু আবাসিক ভবন যুক্ত করার পর এটি শাহের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এই পুরো কমপ্লেক্সটি সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর নামে পরিচিত। এটি প্রায় ১১০ হেক্টর জমির ওপর অবস্থিত এবং এর মধ্যে ১০টি জাদুঘর রয়েছে।

সাদাবাদ প্রাসাদ তেহরানের উত্তর অংশে একটি মনোরম ও সুস্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার এলাকায় অবস্থিত। এই স্থাপনার আশেপাশে এখনো কিছু পুরোনো ভবন রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটির নির্মাণকাল পাহলভি যুগের আগের। প্রাচীন সাইপ্রাস (সারভ) ও পপলার গাছগুলো এই প্রাসাদ ও এর চারপাশের পরিবেশকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।

সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘরের জাদুঘরসমূহ

সাদাবাদ প্রাসাদ কমপ্লেক্সে মোট ১৮টি ভবন রয়েছে এবং প্রতিটির স্থাপত্যশৈলী ও নকশা ভিন্ন। এর মধ্যে ১০টি ভবন বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১. সবুজ প্রাসাদ

সাদাবাদ কমপ্লেক্সে রেজা শাহের শাসনামলে (১৯২৫১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত প্রথম প্রাসাদ হলো সবুজ প্রাসাদ। এই প্রাসাদের বাইরের দেয়ালে সবুজ রঙের পাথর ব্যবহারের কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে “সবুজ প্রাসাদ”। ইসলামী বিপ্লবের (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) আগে এই ভবনটি মোহাম্মদ রেজা শাহের (শাসনকাল ১৯৪১১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ব্যক্তিগত আবাসস্থল ছিল এবং এখানে তাঁর কিছু ব্যক্তিগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো।

সবুজ প্রাসাদে ইরানি শিল্পকলার বিভিন্ন নিদর্শন প্রদর্শিত হয়, যেমন—

  • আয়না-সজ্জার কাজ (আয়নাকারি)
  • ঐতিহ্যবাহী কার্পেট
  • তাজহিব (সোনালি অলংকরণ শিল্প)
  • প্লাস্টারের সূক্ষ্ম কারুকাজ (গচ্চকারি)

এইসব শিল্পকর্ম ইরানের সমৃদ্ধ শিল্প ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে।

 

সবুজ প্রাসাদের প্রবেশদ্বার  সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর

 

২. মিল্লাত প্রাসাদ ও জাদুঘর:

এই প্রাসাদটি দুই তলা বিশিষ্ট এবং এতে ছোট-বড় বিভিন্ন কক্ষ রয়েছে, যা পাহলভি রাজাদের আবাসস্থল ও কর্মস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে মিল্লাত প্রাসাদ বিভিন্ন শিল্পকর্ম, যেমন ভাস্কর্য ও চীনামাটির পাত্র প্রদর্শনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই প্রাসাদের আসবাবপত্র, ঝাড়বাতি এবং ব্যবহৃত চিত্রকর্মগুলো ইউরোপে তৈরি। এছাড়াও এখানে ইরানি পুরাণের বিষয়বস্তু নিয়ে আঁকা চারটি বড় দেয়ালচিত্র দেখা যায়।

 

মিল্লাত প্রাসাদের প্রবেশদৃশ্য, সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘরের একটি অংশ।

 

মিল্লাত জাদুঘরটি মিল্লাত প্রাসাদের ভেতরে অবস্থিত এবং এখানে অন্যান্য দেশ থেকে ক্রয় করা বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এই সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর কমপ্লেক্সের দর্শনার্থীরা ইসলাম-পূর্ব ইরানি সভ্যতা, ভারত, আফ্রিকা, দূরপ্রাচ্য, মায়া সভ্যতা এবং এস্কিমোদের বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে পারেন।

৩. চারুকলা জাদুঘর

এই জাদুঘরে প্রদর্শিত অধিকাংশ শিল্পকর্ম তেলরঙে আঁকা চিত্রকর্ম, যা সাফাভি (১৫০১১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দ), আফশার (১৭৩৬১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ), জন্দ (১৭৫১১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং কাজার (কাজারিয়া) যুগের অন্তর্গত।

এই শিল্পকর্মগুলো মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শেষ স্ত্রী ফরাহ ইংরেজ সংগ্রাহক হ্যারল্ড এমার-এর কাছ থেকে কিনেছিলেন।

চারুকলা জাদুঘরটি তিন তলা বিশিষ্ট।

  • প্রথম তলায় সমকালীন ইরানি শিল্পীদের কফিহাউস-শৈলীর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়।
  • দ্বিতীয় তলায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের ইরানি চিত্রকর্ম রাখা হয়েছে।
  • তৃতীয় তলায় বিদেশি চিত্রশিল্পীদের কাজ প্রদর্শিত হয়।

৪. উস্তাদ বেহজাদ জাদুঘর:

এই জাদুঘরের নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত শিল্পী উস্তাদ হোসেইন বেহজাদ (১৮৯৫১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ)-এর সম্মানে। বেহজাদ, কামালউদ্দিন বেহজাদরেজা আব্বাসি-র শিল্পকর্মে দেখা ইরানি ঐতিহ্যবাহী শৈলীকে ইউরোপীয় শিল্পের সঙ্গে একত্রিত করেছিলেন এবং ইরানি মিনিয়েচার শিল্পে এক নতুন পরিবর্তন সৃষ্টি করেন। এই জাদুঘরে বেহজাদের সেইসব শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে, যেগুলো তিনি কাগজ, কার্ডবোর্ড বা ফাইবার ক্যানভাসের ওপর তৈরি করেছিলেন।

৫. আবকার জাদুঘর:

ক্লারা আবকার ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত সমকালীন আর্মেনীয় চিত্রশিল্পী। মিনিয়েচার শিল্পে তাঁর নিজস্ব একটি বিশেষ শৈলী ছিল। তিনি তাঁর শিল্পকর্মে ইরানি সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতা (ইরফান) থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতেন এবং তাঁর চিত্রে এক ধরনের সঙ্গীতময় ভারসাম্য ফুটিয়ে তুলতেন।

 

মিল্লাত প্রাসাদের প্রবেশদ্বারের সামনে আরশ কামানগীরের ভাস্কর্য  সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর কমপ্লেক্স।

 

৬. মির ইমাদ জাদুঘর:

মির ইমাদ ইরানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্যালিগ্রাফি (সুন্দরলিপি) শিল্পী ছিলেন, যিনি ১৮শ শতাব্দীতে বসবাস করতেন। ইরানি ক্যালিগ্রাফিতে তাঁর অবদানের সম্মানে, শিল্পসমৃদ্ধ সুন্দরলিপির নিদর্শন প্রদর্শনের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরের নাম তাঁর নামে রাখা হয়েছে। সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘরের এই অংশে কাগজ ও পার্চমেন্টের ওপর বিভিন্ন ধরনের তাজহিব (সোনালি অলংকরণ), চিত্রকলা ও ক্যালিগ্রাফি শৈলীতে তৈরি নানা শিল্পকর্ম দেখা যায়।

৭. নৃতত্ত্ব জাদুঘর:

বিশ্বের সব দেশেই সেই দেশের মানুষের অবস্থা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা প্রদর্শনের জন্য নৃতত্ত্ব জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর কমপ্লেক্সের নৃতত্ত্ব জাদুঘরও একই উদ্দেশ্য অনুসরণ করে।

এই জাদুঘরের বিশাল এলাকায় দুই তলায় বিভিন্ন নিদর্শন সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • সেচের সরঞ্জাম
  • কৃষিকাজ ও বাগান করার যন্ত্রপাতি
  • মাছ ধরার সরঞ্জাম
  • পোশাক
  • আলোর ব্যবহারের সামগ্রী
  • হস্তশিল্প

৮. পানি জাদুঘর:

পানি উত্তোলন ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ইরানিরা অসাধারণ সব সাফল্য অর্জন করেছে। এই অর্জনের একটি অংশ পানি জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে।

এখানে পানির সঙ্গে সম্পর্কিত দেশীয় স্থাপনা ও নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে—

  • আবানবার (ঐতিহ্যবাহী ভূগর্ভস্থ পানির সংরক্ষণাগার)
  • প্রাচীন বরফ সংরক্ষণাগার (ইয়াখচাল)
  • প্রাচীন পানির বাঁধ
  • পানি সম্পর্কিত রাজকীয় ফরমান ও নির্দেশনা

৯. সামরিক জাদুঘর:

এই জাদুঘরে আকেমেনীয় সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০৩৩০) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইরানিদের সামরিক পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘরের এই অংশে ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ)-এর ইতিহাসের একটি অংশও দেখা যায়।

১০. ওমিদ ভাইদের জাদুঘর:

ঈসা ও আবদুল্লাহ ওমিদ ছিলেন দুই ইরানি ভাই, যারা ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের ৯০টি দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। এই দুই অভিযাত্রী ভাই তাঁদের ভ্রমণ থেকে বিভিন্ন আকর্ষণীয় বস্তু ও ছবি সংগ্রহ করেন, যা বর্তমানে এই জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রথমে এই জাদুঘরটি একটি গ্যালারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন বস্তু ও নিদর্শন যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে পরিণত হয়। সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘরের এই ভবনটি কাজার যুগে নির্মিত হয়েছিল এবং এতে সেই সময়ের স্থাপত্য অলংকরণের নিদর্শন এখনো দেখা যায়।

সাদাবাদ প্রাসাদ জাদুঘর: ইরানের ১০টি জাদুঘরের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগ্রহশালা।
তেহরান
তেহরান
https://sadmu.ir/

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: