দোলমা: সব রুচির মানুষের পছন্দের একটি সুস্বাদু খাবার।
ইরান চার ঋতুর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য পরিচিত। এর ফলে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের খাদ্য উপকরণ সহজেই পাওয়া যায়। এ কারণেই ইরানি খাবারের বৈচিত্র্য ও স্বাদ এত সমৃদ্ধ। ইরানিদের খাদ্যতালিকায় নানা ধরনের উপকরণের ব্যবহার বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অনন্য।
ইরানি রান্নায় স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি কিছু খাবারে, যেমন দোলমা, আঙুর গাছের পাতার মতো প্রাকৃতিক উপাদানও একটি সুস্বাদু খাবারের অংশ হয়ে ওঠে।
দোলমা: জনপ্রিয় ইরানি খাবার
দোলমা একটি ঐতিহ্যবাহী ইরানি খাবার, যা সারা বিশ্বে Dolma (দোলমা) নামে পরিচিত। ইরানের সব অঞ্চলেই এই খাবারের জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এর প্রধান উপকরণ ও পরিবেশনের ধরন প্রায় একই রকম। দোলমা তৈরিতে আঙুর পাতা ব্যবহার করা হয় বলে সাধারণত গ্রীষ্মকালে এটি বেশি রান্না করা হয়। এখানে টক স্বাদের দোলমা তৈরির পদ্ধতি দেওয়া হলো, যা অন্যান্য ধরনের দোলমার তুলনায় বেশি জনপ্রিয়।
দোলমা তৈরির উপকরণ
চারজনের জন্য প্রয়োজন হবে:
- আঙুর পাতা – ৫০০ গ্রাম (মাঝারি আকারের)
- কিমা করা মাংস – ২ কাপ
- কুচি করা পেঁয়াজ – ২টি
- লাপেহ (হলুদ মটর/স্প্লিট পিজ) – ২.৫ থেকে ৩ কাপ
- সুগন্ধি শাকসবজি – ২ থেকে ২.৫ কাপ
- টক ঘন দই – ৪ থেকে ৫ টেবিল চামচ
- জারেশক (এক ধরনের টক বেরি) – ১ কাপ
- তেল, লবণ, গোলমরিচ ও হলুদের গুঁড়ো – পরিমাণমতো
সাধারণত সুগন্ধি শাকের মিশ্রণ তৈরিতে শুকনো পেঁয়াজপাতা, তরখুন (এক ধরনের সুগন্ধি পাতা), পার্সলে, ডিল, ধনেপাতা এবং শুকনো পুদিনা ব্যবহার করা হয়। দোলমার স্বাদ আরও ভালো করতে পেঁয়াজ একটু বড় আকারের নেওয়া ভালো। পেঁয়াজ মাঝারি আকারের হলে ২টির পরিবর্তে ৩টি ব্যবহার করতে পারেন।
দোলমা রান্নার পদ্ধতি
অন্যান্য সব ইরানি খাবারের মতো দোলমা রান্নার জন্যও ধৈর্য এবং কিছুটা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। তবে খাবার শেষে বুঝতে পারবেন, দোলমা তৈরিতে দেওয়া সময় ও যত্ন সম্পূর্ণ সার্থক। দোলমা রান্নার জন্য প্রথমে আঙুর পাতাগুলো পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। একটি পাত্রের দুই-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে ভরে চুলায় বসিয়ে ফুটিয়ে নিন। এরপর পাতাগুলো আস্তে করে চওড়া দিক থেকে ফুটন্ত পানিতে দিন। প্রায় তিন মিনিট পর পাতাগুলো তুলে ছাঁকনিতে রেখে দিন।
পাতার পানি ঝরে যাওয়া এবং ঠান্ডা হওয়ার সময় গরম পানি দিয়ে চাল ধুয়ে নিন। এরপর একটি পাত্রে পানি নিয়ে চুলায় বসান। পানি ফুটে উঠলে চাল দিয়ে দিন এবং চাল নরম ও খাওয়ার উপযোগী হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। চাইলে এই সময় পানিতে এক চা-চামচ হলুদের গুঁড়ো যোগ করতে পারেন, এতে চাল সুন্দর রং পাবে।
একই সময়ে দোলমার ভেতরের পুর (মিশ্রণ) তৈরি করতে হবে। এজন্য একটি প্যানে সামান্য তেল দিন। তেল গরম হলে কুচি করা পেঁয়াজের দুই-তৃতীয়াংশ হালকা ভেজে নিন। এরপর কিমা করা মাংস ও সামান্য হলুদের গুঁড়ো দিয়ে একটু বেশি আঁচে ভাজুন, যাতে মাংস ভালোভাবে রান্না হয়।
মিশ্রণ তৈরি হয়ে গেলে প্যানটি চুলা থেকে নামিয়ে নিন। এরপর এতে সুগন্ধি শাক, রান্না করা চাল, আধা সেদ্ধ লাপেহ, দই এবং মসলা যোগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
দোলমা মোড়ানোর পদ্ধতি
এরপর দোলমা মোড়ানোর কাজ শুরু করুন। একটি পাত্রে এক টেবিল চামচ তেল দিয়ে তার তলায় কয়েকটি আঙুর পাতা বিছিয়ে দিন। একটি পাতা নিয়ে মাঝখানে এক টেবিল চামচ পুর দিন। এরপর পাতার চারপাশ ভাঁজ করে এমনভাবে মুড়ে দিন, যাতে পুর পুরোপুরি ভেতরে থাকে। খেয়াল রাখবেন, মোড়ানো দোলমাগুলো পাত্রে এমনভাবে রাখতে হবে যেন পাতার ভাঁজ করা অংশ নিচের দিকে থাকে। এতে রান্নার সময় দোলমা খুলে যাবে না। সব দোলমা সাজানো হয়ে গেলে পাত্রে দুই কাপ পানি এবং তিন টেবিল চামচ তেল যোগ করুন। এরপর চুলায় বসিয়ে রান্না করুন।
এই পর্যায়ে চাইলে পানির পরিবর্তে ডালিমের পেস্ট ও পানির মিশ্রণ ব্যবহার করতে পারেন। তবে ডালিমের পেস্ট ব্যবহার করলে উপকরণ থেকে দই বাদ দিতে হবে। দোলমা খুলে যাওয়া ঠেকানোর জন্য অনেকেই এর ওপর একটি ভারী প্লেট রেখে দেন। এতে দোলমাগুলো ভালোভাবে চেপে থাকে এবং পুরও শক্তভাবে জমে যায়। পানি ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে দিন এবং প্রায় দুই ঘণ্টা ধীরে ধীরে রান্না করুন।
দোলমা পরিবেশন
দোলমা রান্নার সময় সাজানোর জন্য আলাদা একটি পাত্রে উদ্ভিজ্জ তেল গরম করে বাকি কুচি করা পেঁয়াজ ও জারেশক ভেজে নিতে পারেন। দোলমা প্রস্তুত হয়ে গেলে একটি পরিবেশন পাত্রে সাজিয়ে রাখুন এবং চারপাশে ভাজা পেঁয়াজ ও জারেশক ছড়িয়ে দিন।
দোলমা গরম ও ঠান্ডা দুইভাবেই খাওয়া যায়। এটি ছোট আকারের খাবার (ফিঙ্গার ফুড) হওয়ায় সাধারণত চামচ-কাঁটার প্রয়োজন হয় না। তবে অনেকে এটি কেটে ছোট টুকরো করে খেতে পছন্দ করেন। দোলমার সঙ্গে সাধারণত সালাদ, আচার বা দই পরিবেশন করা হয়।
| দোলমা: সব রুচির মানুষের পছন্দের একটি সুস্বাদু খাবার। | |
| Meal | |
| Registration |

