প্রায় ১,৫০০ বছর আগে, ইরানে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এই কেন্দ্রটি ৫৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং “জুন্দিশাপুর” নামে পরিচিতি লাভ করে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, গণিত, সংগীত, রাষ্ট্রপরিচালনা এবং কৃষিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হতো। জুন্দিশাপুর সে সময়ের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও গবেষণার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এমনকি তৎকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে উন্নত জ্ঞানও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো এবং বিভিন্ন জাতীয়তার শিক্ষার্থীরা এখানে অধ্যয়ন করত।
সেই গৌরবময় সময়ের পর, ১৯৫৫ সালে আবারও আহভাজ শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু করে, যার নাম রাখা হয় “জুন্দিশাপুর”। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করা হয় এবং বর্তমানে এটি “শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয়” নামে পরিচিত।
শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও পরিবর্তন
শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অনুষদ ছিল কৃষি অনুষদ। এটি ১৯৫৫ সালে ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। পরের বছর চিকিৎসা অনুষদ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও সম্প্রসারণের পথ তৈরি হয়।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ৪,০০০ শিক্ষার্থী ৪০টি স্নাতক এবং ১৭টি স্নাতকোত্তর শিক্ষাক্রমে অধ্যয়ন করছিলেন।
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর সাদ্দাম সরকারের সেনাবাহিনীর ইরানে আগ্রাসনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে কয়েক বছর পর আবারও এর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।
শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পরিসংখ্যান ও তথ্য
আয়তনের দিক থেকে শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয় ইরানের চতুর্থ বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ এবং ৫৩টি একাডেমিক বিভাগ রয়েছে।
এর মধ্যে:
- ২২টি বিভাগ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- ৭টি বিভাগ মৌলিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- ৭টি বিভাগ কারিগরি ও প্রকৌশল বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- ১৩টি বিভাগ কৃষি ও পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- ২টি বিভাগ চারুকলা ও শিল্পকলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এছাড়া শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী ডিগ্রি পর্যায়ে ৩টি, স্নাতক পর্যায়ে ৫৬টি, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১০৭টি এবং বিশেষায়িত পিএইচডি ও পেশাগত ডক্টরেট পর্যায়ে ৫৯টি বিষয়ে পাঠদান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রমে ৫০০ জনেরও বেশি পূর্ণকালীন শিক্ষক ও গবেষক যুক্ত থাকায় এর শিক্ষা ও গবেষণার মান ও পরিধি আরও উন্নত হয়েছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৬,০০০ জন, যাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অর্থাৎ স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৭০০ জনেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। এছাড়াও প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
গবেষণা কেন্দ্র ও সুযোগ-সুবিধা
শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয় ইরানে পানি-সম্পর্কিত গবেষণার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ইরানে পানি গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান “জুন্দিশাপুর পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান” এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই কেন্দ্রটি ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো আচরণবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, যা ২০০৬ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটি ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক বৃহত্তম গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এর অধীনে তিনটি গবেষণা বিভাগ রয়েছে:
১. মনোবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা
২. মানবসম্পদ গবেষণা
৩. পরিবারবিষয়ক গবেষণা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রিলিং গবেষণা কেন্দ্রেও দুটি গবেষণা বিভাগ—ড্রিলিং কেমিস্ট্রি এবং ড্রিলিং টেকনোলজি—গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। খুজেস্তান প্রদেশে বৃহৎ তেল ও গ্যাস শিল্প থাকায় এই কেন্দ্রটি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তেলশিল্প-সম্পর্কিত আরেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো “পেট্রোলিয়াম জিওলজি ও জিওকেমিস্ট্রি গবেষণা কেন্দ্র”। এই কেন্দ্রের গবেষণার মূল বিষয় হলো তেল ও হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান এবং তেলভাণ্ডার বা রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা।
এছাড়াও শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে স্টিল গবেষণা কেন্দ্র, গ্যাস সরবরাহ নেটওয়ার্ক গবেষণা কেন্দ্র, নারী গবেষণা কেন্দ্র এবং আচরণবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।
বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ কেন্দ্র
বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ কেন্দ্র (Scientific Center of Excellence) বলতে এমন একটি উচ্চ বৈজ্ঞানিক সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও গবেষকদের একটি সংগঠিত দলকে বোঝায়, যারা মৌলিক বা প্রয়োগিক বিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট বিশেষায়িত ক্ষেত্রে উৎকর্ষের জন্য পরিচিত। তারা নিজেদের কার্যক্রমকে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত ও সমন্বিত করে উদ্ভাবন, জাতীয়-আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত বৈজ্ঞানিক মান অর্জন এবং দেশের মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করে।
শহীদ চামরান আহভাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ কেন্দ্রও রয়েছে:
১. ধারাবাহিক শিক্ষা
২. জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য ও রোগ
৩. নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ
৪. ড্রিলিং প্রযুক্তি গবেষণা
এসব উৎকর্ষ কেন্দ্রকে সংগঠিত বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা ক্ষেত্রের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে এগুলো জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্ভাবন এবং বৈজ্ঞানিক মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখে।