৭৫০ বছরেরও বেশি আগে তাবরিজে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু ছিল, যার নাম ছিল ‘রব-এ রশিদি’। তৎকালীন শাসনামলের বিদ্বান মন্ত্রী খাজা রশিদউদ্দিন ফজলুল্লাহ হামাদানি এই বিশাল বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। খাজা রশিদউদ্দিন নিজে একজন চিকিৎসক ছিলেন বলে রব-এ রশিদির চিকিৎসা অনুষদ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছিল। এটি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা এবং ওই অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটি উন্নত কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। এই অনুষদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রোগীদের চিকিৎসা করার সময় প্রত্যেক চিকিৎসক পাঁচ থেকে দশজন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দুটি পর্বে পরিচালিত হতো সকালে তাত্ত্বিক শিক্ষা এবং বিকেলে ব্যবহারিক শিক্ষা। পাঁচ বছর অধ্যয়নের পর শিক্ষার্থীরা তৎকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা লাভ করতেন এবং ‘ইজাজত’ নামের একটি অনুমতিপত্র বা সনদ পেতেন, যা বর্তমান সময়ের ডিগ্রি বা স্নাতক সনদের সমতুল্য ছিল।
এই হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন প্রত্যেক রোগীর জন্য পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য এবং পোশাকের ব্যয় মেটাতে পৃথকভাবে তিন ধরনের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা ছিল। সাত শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ‘রব-এ রশিদি’র ঐতিহ্য বহন করছে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয় তাবরিজ মহানগরের জনগণের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। প্রথম শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য ১০ জন চিকিৎসক নিয়োগ করা হয় এবং ওই বছর ৭৫ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়।
এর দুই বছরের মধ্যে শিক্ষাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার জন্য ১০ জন ইরানি চিকিৎসক ও চারজন অস্ট্রিয়ান চিকিৎসককে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছয়টি হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ধাত্রীবিদ্যা, চিকিৎসা সহায়তাবিদ্যা এবং ফার্মেসি।
তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষাদান ও গবেষণা কার্যক্রম
বর্তমানে তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়টির ৮৯০ জন পূর্ণকালীন শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন। ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন বিষয় ও বিশেষায়িত শাখার মোট সংখ্যা ছিল ২০০টি।
তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১১টি অনুষদ রয়েছে। এগুলো হলো:
১. জনস্বাস্থ্য অনুষদ
২. নার্সিং ও ধাত্রীবিদ্যা অনুষদ
৩. চিকিৎসা অনুষদ
৪. প্যারামেডিক্যাল সায়েন্সেস অনুষদ
৫. পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান অনুষদ
৬. ফার্মেসি অনুষদ
৭. দন্তচিকিৎসা অনুষদ
৮. ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদ
৯. পুনর্বাসনবিজ্ঞান অনুষদ
১০ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুষদ
১১. চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও তথ্যবিজ্ঞান অনুষদ
সামগ্রিকভাবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাদান ইউনিট এবং ৩০টি গবেষণাকেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ জরুরি চিকিৎসাসেবা ইউনিটগুলোতে প্রতি বছর দুই মিলিয়নেরও বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। এ ছাড়া, এসব ইউনিটে প্রতি বছর সম্পাদিত অস্ত্রোপচারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায়।
তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বর্তমানে ১৩টি বিশেষায়িত জার্নাল প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে পুরোনো চিকিৎসাবিষয়ক জার্নালটি ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশনা শুরু করে এবং এখনো নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও অবস্থান
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৬৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিবছর বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আন্তর্জাতিক বিষয়ক ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর প্রধান দায়িত্ব হলো আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা এবং বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক ও গবেষকদের সঙ্গে যৌথ সভার আয়োজন করা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের ১০টি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত সাংহাই র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টি খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে ১৫১–২০০তম স্থান অর্জন করে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। একই র্যাঙ্কিংয়ে জীবপ্রযুক্তি (বায়োটেকনোলজি) বিষয়ে ২০১–৩০০তম স্থান অর্জনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।
এ ছাড়া, নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয়টি উল্লেখযোগ্য স্থান অর্জন করে:
-
- ক্লিনিক্যাল মেডিসিন: ৪০১–৫০০তম স্থান
- নার্সিং: ২০১–৩০০তম স্থান
- ফার্মেসি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস: ৪০১–৫০০তম স্থান
এসব বিষয়ের র্যাঙ্কিংয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে।
২০২৩ সালের টাইমস উচ্চশিক্ষা র্যাঙ্কিংয়ে তাবরিজ মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ২২তম স্থান অর্জন করে। একই র্যাঙ্কিংয়ে ইরানের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এর অবস্থান ছিল নবম।
এ ছাড়া, ২০২১ সালে প্রকাশিত আইএসসি (ISC) র্যাঙ্কিংয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ৫০১–৬০০তম স্থান এবং কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ে ৪৫১–৫০০তম স্থান অর্জন করে।