প্রতিটি জাতি ও জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থাপত্য ও পরিবেশগত স্থান বিন্যাসের ক্ষেত্রে নানা উদ্ভাবন করেছে। ইরানি বাগানকে ইরানিদের অন্যতম উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য পরিবেশে স্থান বিন্যাসের একটি বিশেষ ধরণ।
মজার বিষয় হলো, ইরানি বাগানগুলো মূলত শুষ্ক ও মরুভূমি অঞ্চলে গড়ে উঠত। এসব বাগানে পানির উৎসের গুরুত্বের কারণে এমন সব ব্যবস্থা রাখা হতো, যাতে পানিসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সর্বনিম্ন অপচয় নিশ্চিত করা যায়। ইরানি বাগানের নকশায় ভারসাম্য একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাগানের বিভিন্ন অংশে ব্যাপকভাবে প্রতিসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোনো পর্যটক যখন একটি ইরানি বাগানে কিছু সময় কাটান, তখন তাঁর মনে প্রশান্তির এক অনন্য স্মৃতি গেঁথে যায়! বিরজান্দের আকবরিয়া বাগান ইরানি বাগানের অত্যন্ত সুন্দর একটি নিদর্শন। এটি ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং এর নাম ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়ও নিবন্ধিত হয়েছে।
বিরজান্দের আকবরিয়া বাগানের ইতিহাস
বিরজান্দ ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি শহর এবং দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের কেন্দ্র। অতীতে এই শহর স্থানীয় শাসনব্যবস্থাগুলোর অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। বিরজান্দের স্থানীয় শাসকেরা একটি দুর্গে বসবাস করতেন, যা প্রথমদিকে শহরাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শহর সম্প্রসারণের ফলে দুর্গটি সাধারণ মানুষের বাড়িঘর দ্বারা ঘিরে যায়। এই পরিস্থিতি শাসকদের নতুন একটি প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরির কথা ভাবতে বাধ্য করে।
আলী-আকবর খান হেশমত-আল-মোলকের শাসনামলে, যখন শাসনব্যবস্থা জন্দীয় রাজবংশ থেকে কাজার রাজবংশের হাতে স্থানান্তরিত হয়েছিল, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে, একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি আকবরিয়া নামে পরিচিত। এই প্রাসাদটি বর্তমানে আকবরিয়া বাগানের সবচেয়ে পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এবং এটিকে বাগানের সবচেয়ে পুরোনো স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হেশমত-আল-মোলকের পর তাঁর ছেলে শওকত-আল-মোলক, যিনি এই অঞ্চলের গভর্নরের দায়িত্বে ছিলেন, আকবরিয়া প্রাসাদের সংলগ্ন বাগানটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। এই সময় বাগানটি দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে বড় বড় উৎসব আয়োজনের স্থানে পরিণত হয়।
শওকত-আল-মোলকের পর তাঁর ছেলে আসাদুল্লাহ আলাম বাগানটির উত্তরাধিকারী হন। তিনি দ্বিতীয় পাহলভি যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বছরের কিছু সময় তিনি এই বাগানে বসবাস করতেন।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর এই বাগানটি কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশেষে ১৯৯২ সালে, বাগানের মূল প্রাসাদটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে বাগানের অন্যান্য অংশের ব্যবহার পরিবর্তন করে সেগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করা হয়।

ছবি: বিরজান্দের আকবরিয়া বাগানের প্রাসাদ ভবন
বিরজান্দের আকবরিয়া বাগানের বৈশিষ্ট্য
বাগানটির আয়তন প্রায় ৪৫ হাজার বর্গমিটার। বিরজান্দের আকবরিয়া বাগান নির্মাণের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এর কিছু অংশে রুশ স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে। এই বাগানে ইরানি বাগানের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়: পানির উপস্থিতি এবং স্থান বিন্যাসে এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা, একটি বড় প্রাসাদ ভবনের উপস্থিতি এবং বাগানের চারপাশে উঁচু দেয়াল নির্মাণ।
বাগানটি নির্মাণে চিলিপা বা ক্রুশাকৃতির নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। এই নকশা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে, অর্থাৎ হাখামানেশীয় যুগ থেকে ইরানি স্থাপত্যে প্রচলিত হয়ে ওঠে। বাগানে কয়েকটি রাস্তা রয়েছে, যার দুই পাশে আকাশছোঁয়া পাইনগাছ দেখা যায়। পাইনগাছগুলোর মাঝেও ডালিম ও তুঁতগাছের বিভিন্ন প্রজাতি রোপণ করা হয়েছে।
বাগানের সামগ্রিক কাঠামোকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুটি অংশে ভাগ করা যায়। দক্ষিণের বাগানটি তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও এখানে সেবামূলক ব্যবহারের জন্য কয়েকটি ভবন, আস্তাবল এবং আবাসিক স্থাপনা রয়েছে। এই অংশে একটি বর্গাকার কেন্দ্রীয় পুকুরও দেখা যায়। বাগানের উভয় অংশই ঢালু ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে। মূল প্রাসাদ ভবনটি বাগানের সর্বোচ্চ অংশে অবস্থিত। এই ভবনটি দুই তলা বিশিষ্ট এবং বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ, রঙিন কাচযুক্ত ওরসি জানালা এবং ইসলামি আরাবেস্ক ও জ্যামিতিক নকশা এর সৌন্দর্যকে অনন্য মহিমা দান করেছে।
বিরজান্দের আকবরিয়া বাগানের জাদুঘর
এই বাগানের কিছু অংশ জাদুঘর স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর বাগানের অন্যতম জাদুঘর। এই জাদুঘর ১৯৯২ সালে কার্যক্রম শুরু করে। আকবরিয়া বাগানের প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরকে দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের বৃহত্তম জাদুঘর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে মাটির তৈরি পাত্র, প্রাচীন মুদ্রা, অস্ত্র এবং বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শনের মতো নানা বস্তু দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শন করা হয়। এই জাদুঘরের কিছু নিদর্শনের প্রাচীনত্ব খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এই বাগানে প্রতিষ্ঠিত আরেকটি জাদুঘর হলো নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর। এখানে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সামগ্রী দেখা যায়। এই কমপ্লেক্সের বন্যপ্রাণী জাদুঘরেও এই অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রজাতির কিছু বিরল নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে।
ছবি: বিরজান্দের আকবরিয়া বাগানের নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর
বিরজান্দের আকবরিয়া বাগানের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
আকবরিয়া বাগান কমপ্লেক্সটি ১৯৯৩ সালে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। ২০১১ সালে এই বাগানসহ আরও আটটি বাগানকে ইরানি বাগান নামের একটি সমন্বিত ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।