যদিও ইরানের অধিকাংশ ভূভাগ শুষ্ক ও মরুপ্রধান অঞ্চল দ্বারা আবৃত, তবুও দেশটির কিছু কিছু অংশে আরস (উরস) গাছের মতো বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মে। এসব উদ্ভিদপ্রজাতি অত্যন্ত মূল্যবান। এগুলো শুধু মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য সৃষ্টি করে না, বরং উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার গবেষণার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
আরস গাছ ও এর বৈশিষ্ট্য
আরস বা পাহাড়ি সাইপ্রাস (সারভে-কুহি) একটি দীর্ঘজীবী উদ্ভিদ। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় জন্মে। এই উদ্ভিদের ৫০টিরও বেশি ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। উত্তর গোলার্ধে উত্তর মেরু অঞ্চল থেকে শুরু করে আফ্রিকার বৃষ্টিবন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে এটি পাওয়া যায়। আরস প্রায় সব ধরনের আবহাওয়ার সঙ্গেই নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম। এই গাছের কিছু প্রজাতির আয়ু ২,০০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
পাহাড়ি সাইপ্রাস একটি শঙ্কুবীজী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড় ও বিভিন্ন কীটপতঙ্গের আক্রমণের বিরুদ্ধে এর প্রতিরোধক্ষমতা অনেক বেশি। এই প্রতিরোধক্ষমতার কারণে কীটপতঙ্গের আক্রমণ বা প্রাকৃতিক কোনো কারণে শুকিয়ে যাওয়া আরস গাছ খুব কমই দেখা যায়। আরস গাছের আকৃতিগত বৈচিত্র্যের অন্যতম কারণ হলো, কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড়ের ক্ষতি থেকে বাঁচতে এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গাছটি তার আকৃতি পরিবর্তন করে। এই গাছ শুধুমাত্র বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। তবে প্রকৃতিতে কাক, বুনো শূকর বা ভালুকের মতো প্রাণীর মলের সঙ্গে থাকা বীজ উপযুক্ত পরিবেশে পড়ে অঙ্কুরিত হওয়াও এর বংশবিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এই গাছের কিছু প্রজাতি ইরানের আবহাওয়া ও স্বল্প পানির পরিবেশের সঙ্গে এমনভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে যে সেগুলোকে ইরানের দেশীয় প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইয়াজদ প্রদেশ ইরানের এমন একটি অঞ্চল, যেখানে আরস বন রয়েছে। এই এলাকার আরস বনগুলো বাজগান গ্রামের আশপাশে গড়ে উঠেছে।
বাজগান হলো ইয়াজদ প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বাফক জেলার একটি গ্রাম। বাড়িঘরের পাথরের তৈরি স্থাপত্যের জন্য গ্রামটি বিশেষভাবে পরিচিত। ইয়াজদের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাজগানের গড় তাপমাত্রা কিছুটা কম। তবে বৃষ্টিপাতের দিক থেকে এই অঞ্চলকে খুব বেশি বৃষ্টিপ্রবণ বলা যায় না। এই গ্রামের আশপাশের আরস বন একটি মূল্যবান সংরক্ষণাগার হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মনোমুগ্ধকর।
বাজগানের আরস বনাঞ্চল
আরস বনটি বাজগান গ্রামের পশ্চিমে অবস্থিত এবং উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক থেকে আশপাশের পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত। বাজগান আরস বন ইয়াজদ প্রদেশের একমাত্র বন সংরক্ষণাগার হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বনের আয়তন প্রায় ৭০০ হেক্টর এবং এখানে অসংখ্য প্রাচীন ও শতবর্ষী আরস গাছ রয়েছে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দার মতে, এসব গাছের কয়েকটির বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি।
বাজগান আরস বনে উদ্ভিদের বিস্তৃতি তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত। আরস গাছ যেহেতু সাধারণত পাহাড়ি উচ্চভূমিতে জন্মায়, তাই বনের মূল অংশে পৌঁছাতে হলে পায়ে হেঁটে ও পাহাড়ে উঠেই যেতে হয়। এ জন্য দুটি পাথুরে পথ রয়েছে একটি বাজগান গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে শাদগাম উপত্যকা দিয়ে এবং অন্যটি গ্রামের পূর্বদিকে। হাঁটার পথটি দুই কিলোমিটারেরও বেশি। তবে আরস গাছের জটিলভাবে ছড়িয়ে থাকা ডালপালার ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ ও সাদা মেঘ দেখা, চারপাশের পাহাড়ের অপূর্ব নীরবতার মধ্যে, এই পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্টকে সার্থক করে তোলে। বাজগান অঞ্চলের আরস গাছগুলোর উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার থেকে ২০ মিটারেরও বেশি। কোনো কোনো গাছের কাণ্ডের ব্যাস প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব গাছ সারা বছরই সবুজ থাকে। আর অন্যান্য অনেক শঙ্কুবীজী গাছের তুলনায় এদের শাখা-প্রশাখা অনুভূমিকভাবে বেশ বিস্তৃত হয়। ফলে গ্রীষ্মের তীব্র রোদ থেকে বাঁচার জন্য এগুলো উপযুক্ত আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।
বাজগান ও আশপাশের এলাকার মানুষ আরস গাছকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন এবং এটিকে দৃঢ়তা ও ধৈর্যের প্রতীক বলে মনে করেন। তারা বাড়ির ছাদ নির্মাণে কিংবা ভবনের খুঁটি হিসেবে আরস কাঠ ব্যবহার করেন। তবে গাছের ডাল বা কাণ্ড কাটার সময় এমনভাবে কাজ করেন, যাতে গাছটির যতটা সম্ভব কম ক্ষতি হয় এবং ভবিষ্যতে তার স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠায় কোনো সমস্যা না হয়। আরস গাছের পাতা, বীজ ও আঠা সুগন্ধি তৈরির শিল্পে ব্যবহার করা হয়। অতীতে স্থানীয় বাসিন্দারা এই গাছের বীজ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করতেন; যেমন কানের ব্যথা উপশমে এর বীজ ব্যবহার করা হতো।
বাজগান আরস বনাঞ্চলের জাতীয় নিবন্ধন
এই অঞ্চলটি ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।