প্রাচীন বাম শহর বা বাম দুর্গ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আজ পর্যন্ত নানা উত্থান-পতনের ইতিহাস বহন করে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বামের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এই অঞ্চলটি লুত মরুভূমির দক্ষিণে এবং বারেজ পর্বতমালার উত্তরে অবস্থিত। বারেজ পর্বতমালা বা জেবাল বারেজ প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিস্তৃত। এই পর্বতমালার সর্বোচ্চ চূড়া হলো আলামশাহ, যার উচ্চতা ৩৭৪১ মিটার। লুত মরুভূমি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ মরুভূমি, যা বিশ্বের উষ্ণতম স্থানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অঞ্চলে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এমনও দাবি করা হয়েছে যে, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে সেখানে ৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাম দুর্গের ইতিহাস
প্রাচীন বাম শহরের যাত্রা ঠিক কখন শুরু হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত যে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে, অর্থাৎ হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের সময়, এই শহরটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে এই শহরের প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ রাজা প্রথম আরদেশিরের প্রতি আরোপ করা হয়। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৫ থেকে ৪২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। কথিত আছে, তিনি একটি শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করে সেখানে কেজারান শহরের অধিবাসীদের বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং এর মাধ্যমে প্রাচীন বাম শহর প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেন।
প্রথম আরদেশির বাহমান নামে পরিচিত ছিলেন, যার অর্থ নিকচিন্তক ও সৎপ্রকৃতির মানুষ। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাম শহরের নামটি বাহমান নামের পরিবর্তিত রূপ। প্রথম আরদেশিরের পরবর্তী সময়েও ইরানের রাজারা বামের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শহরটির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তী বিভিন্ন যুগে প্রাথমিক স্থাপনাগুলোর সঙ্গে নতুন নতুন ভবন ও কাঠামো যুক্ত হতে থাকে। ফলে বর্তমান বাম দুর্গের স্থাপত্য ও কাঠামোর বিভিন্ন অংশকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়।
ধারণা করা হয়, প্রাচীনকাল থেকেই বাম ছিল তুলা ও রেশম উৎপাদন এবং এসব উপকরণ থেকে সুতা ও কাপড় তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আশপাশের বাগানগুলোতে তুঁতগাছের উপস্থিতি এবং বাণিজ্যিক কাফেলার চলাচলের পথে বামের অবস্থান, যা এসব পণ্যের বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, এই পেশার সমৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বাম দুর্গের বৈশিষ্ট্য ও স্থাপত্য
এই প্রাচীন শহরটি মরুভূমি অঞ্চলের অন্যান্য মরূদ্যানের মতোই প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। এই প্রাচীর প্রায় ২ লাখ বর্গমিটার এলাকা ঘিরে রেখেছিল। শহরের মাঝামাঝি আরও একটি সুরক্ষামূলক প্রাচীর ছিল, যা শহরের শাসকের বসবাসের এলাকা থেকে আবাসিক এলাকাগুলোকে আলাদা করত। শহরের বৃত্তাকার প্রাচীরগুলোর দৈর্ঘ্য ১৮১৫ মিটার এবং উচ্চতা ৬ থেকে ৭ মিটার। এই প্রাচীরের বিভিন্ন অংশে ৩৮টি প্রহরী টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করা যায়। প্রাচীরের বাইরে একটি পরিখাও খনন করা হয়েছিল। আক্রমণকারীদের হামলার সময় এই পরিখা পানিতে পূর্ণ করা হতো, যাতে শহরকে রক্ষার জন্য আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়। ধারণা করা হয়, সুরক্ষামূলক প্রাচীরের ভেতরের অংশ ছাড়াও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি দুর্গ ও কেল্লা ছিল, তবে বর্তমানে সেগুলোর কোনো চিহ্ন আর দেখা যায় না।
বাম তার বিশেষ স্থাপনা ও অনন্য স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে, যার অনুরূপ অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই প্রাচীন শহরের স্থপতিরা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মাটি ও কাঁচা ইটের স্তর ব্যবহার করে খিলান ও গম্বুজ আকৃতির স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। এর ফলে ইরানের মরুভূমি অঞ্চলের স্থাপত্যের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ নিদর্শন গড়ে উঠেছিল।
দুর্গের নগর-পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। বারেজ পর্বতমালা থেকে পানি এনে শহরের প্রাচীরের ভেতরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি কানাত ছিল। এরপর U-আকৃতির পাইপের মাধ্যমে সেই পানি শহরের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বেশ কয়েকটি কূপও খনন করা হয়েছিল। এছাড়াও গাছপালায় পানি দেওয়ার জন্য কয়েকটি খোলা নালা ছিল।
নগর কাঠামোর দিক থেকে বাম দুর্গকে দুটি অংশে ভাগ করা যায়। একটি হলো মধ্যবর্তী অংশ, যেখানে একটি দুর্গ ছিল এবং শাসক সেখানে বসবাস করতেন। অন্যটি হলো বাইরের অংশ, যেখানে সাধারণ মানুষ বসবাস করত। মধ্যবর্তী দুর্গটি একটি উঁচু স্থানে নির্মিত হওয়ায় সেখান থেকে পুরো শহরের ওপর নজর রাখা সম্ভব ছিল। এই অংশে আস্তাবল ও সেনানিবাসসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা দেখা যায়।
শহরের বাইরের অংশটি তুলনামূলকভাবে সমতল এলাকায় অবস্থিত। এই অংশে মোট ৫২৮টি বাড়ি শনাক্ত করা যায়। বাম দুর্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো:
বাম দুর্গের বাজার
বাজারটির দৈর্ঘ্য ১১৫ মিটার এবং এতে ৪২টি দোকান ছিল। বাজারে প্রধানত রেশম, তুলা এবং এগুলো থেকে তৈরি বস্ত্রসামগ্রী বিক্রি করা হতো। বাজারের পূর্ব দিকে একটি বেকারি ছিল। পশ্চিম দিকে সুতা কাটার ও কাপড় রং করার কারখানাগুলো সক্রিয় ছিল। বাজারের পশ্চিম প্রান্তের পথের শেষে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
ময়দান
বাজারের পশ্চিম পাশের সেই পথটিতে, যেখানে মসজিদটিও অবস্থিত, একটি ময়দান নির্মাণ করা হয়েছিল, যা তেকিয়ে নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, ষোড়শ শতাব্দীতে সাফাভি শাসনামলে এই ময়দানটি মহররম মাসের শোকানুষ্ঠান আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে একটি কাঁচা ইটের তৈরি মিম্বরের উপস্থিতিও এই ধারণাকে সমর্থন করে।
জামে মসজিদ
এই মসজিদটি একটি প্রাচীন অগ্নিমন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়েছে। মসজিদের চার-ইওয়ানবিশিষ্ট স্থাপত্য, যা পরবর্তীতে তিন-ইওয়ানবিশিষ্ট রূপ পায়, ইঙ্গিত দেয় যে এটি ইসলামের প্রাথমিক শতাব্দীগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিছু বিশেষজ্ঞ এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাকে সাফফারীয় শাসনামলের সঙ্গে যুক্ত করেন, যা ৮৬১ থেকে ১০০২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
জোরখানা, প্রাসাদ ও কারাভানসারাই
জোরখানার ক্রীড়া প্রাচীন ইরানের ঐতিহ্যবাহী শরীরচর্চার একটি ধরন, যার ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। এই ক্রীড়া বিশেষ কিছু রীতি-নীতি মেনে পরিচালিত হয় এবং এটি যে স্থানে অনুষ্ঠিত হয়, তাকে জোরখানা বলা হয়। বাম দুর্গে একটি জোরখানা রয়েছে, যেখানে একটি গর্ত বা প্রশিক্ষণক্ষেত্র, একটি গম্বুজ এবং চারটি ইওয়ান রয়েছে। সম্ভবত এই স্থাপনাটিও সাফাভি যুগে নির্মিত হয়েছিল।
জোরখানার কাছে মালেক-ওত-তোজ্জার নামে পরিচিত একটি প্রাসাদ রয়েছে। এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো একটি ব্যক্তিগত হাম্মাম বা গোসলখানা। অতীতে হাম্মামে পানি সরবরাহ এবং পানি গরম করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তাই কেবল অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবারগুলোর বাড়িতেই এ ধরনের ব্যবস্থা থাকত।
প্রাসাদটি একটি করিডোরের মাধ্যমে একটি কারাভানসারাইয়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন ইরানের কারাভানসারাইগুলোর আদলে নির্মিত এই কারাভানসারাইয়ের মাঝখানে একটি বড় উঠান ও একটি উঁচু মঞ্চ রয়েছে। বিভিন্ন পণ্যের প্রচার ও বিক্রির জন্য এই মঞ্চটি ব্যবহার করা হতো।
মাদ্রাসা
জামে মসজিদের প্রায় বিপরীতে একটি মাদ্রাসা রয়েছে, যা মির্জা নাঈম নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, মাদ্রাসার শিক্ষক বা শিক্ষকরাও এর অভ্যন্তরীণ অংশে বসবাস করতেন। মাদ্রাসার উঠানের এক কোণে একটি সমাধি রয়েছে, যা মির্জা নাঈমের বলে মনে করা হয়।
ইহুদিদের সাবাত
প্রধান পথের শেষ প্রান্তে, শাসক এলাকার অংশে পৌঁছানোর আগে একটি ছাদযুক্ত পথ রয়েছে, যা ইহুদিদের সাবাত নামে পরিচিত। এর উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম দিকে একটি দোতলা ভবন এবং দক্ষিণ দিকে একটি বায়ু-ধরার মিনার ও বারান্দা। অতীতে শহরের এই অংশে ইহুদিরা বসবাস করতেন এবং কাপড় তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
বাম দুর্গের শাসক এলাকা
শাসক এলাকার প্রবেশদ্বারটি আবাসিক অংশের উত্তর দিকে এবং ইহুদিদের সাবাতের দিকে মুখ করে অবস্থিত। প্রবেশদ্বারটির সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা টাওয়ার ও প্রাচীর রয়েছে, যেখানে প্রহরীরা অবস্থান করতেন। এই অংশে সৈন্যদের বসবাসের জন্য একটি স্থানও ছিল।
এছাড়া শাসক এলাকার একটি টাওয়ারের নিচে মাটির গভীরে অন্ধকূপের মতো একটি কারাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়, এই কারাগারটি সাফফারীয় যুগে নির্মিত হয়েছিল। সম্ভবত অন্ধকূপটিতে পর্যাপ্ত আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বন্দিই সেখানে মারা যেতেন। বাম দুর্গের শাসক এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শাসকের বাসভবন। এই বাসভবনের প্রধান অংশগুলোর মধ্যে ছিল গ্রীষ্ম ও শীতকালীন থাকার ব্যবস্থা এবং খোলা জায়গাসহ একটি বাড়ি, এমন কিছু প্লাস্টারের অলংকরণ যা সেলজুক আমলের ১০৩৭ থেকে ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দের স্থাপত্যসজ্জার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, এবং একটি চারতলা কুশক। এই চারতলা ভবনে সরকারের চারটি প্রধান বিভাগ বিচার বিভাগ, অর্থ বিভাগ, পৌর প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বিভাগ কার্যক্রম পরিচালনা করত।
বাম দুর্গের বর্তমান অবস্থা
ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নতুন বাম শহরের বিকাশের ফলে মানুষ শহরের প্রাচীরের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বাম দুর্গের সেনানিবাস স্থানান্তরিত হওয়ার পর জনসংখ্যা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই প্রাচীন শহরটি সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এর নগর কাঠামো ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।
শহরটিতে কয়েক দফা পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়, বিশেষ করে ১৯৭৩ ও ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প বাম দুর্গে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে।
এই ভূমিকম্পের পর, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত এই স্থাপনাটির নাম বিশ্ব ঐতিহ্যের বিপন্ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অবশেষে পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রমের পর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে বাম দুর্গকে বিশ্ব ঐতিহ্যের বিপন্ন তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।