পর্যটন আকর্ষণ স্থান

গুদবুনগাহ গুহা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য ও প্রাকৃতিক গন্তব্য।

গুদবুনগাহ গুহাটি মানববসতি ও কর্মকাণ্ড থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখনো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং এটি অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে।

যদিও ইয়াজদ প্রদেশ একটি সমতল ও মরুভূমিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, তবুও এর কিছু এলাকায় আকর্ষণীয় গুহা রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রদেশে কমপক্ষে ৮০টি গুহা রয়েছে। এসব গুহার কিছুতে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বসবাসের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ইয়াজদ প্রদেশের কয়েকটি গুহা ইতিহাস ও লোককাহিনিতেও স্থান করে নিয়েছে এবং পবিত্র মর্যাদা লাভ করেছে। যেমন, মায়বোদ জেলার আশকাফত ইয়াজদান গুহা, যেখানে বহু বছর ধরে জরথুস্ত্রীদের পবিত্র অগ্নি সংরক্ষিত ছিল।

ইয়াজদের গুহাগুলো দর্শনীয় স্থান হিসেবে পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত গন্তব্য হতে পারে। এসব গুহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের আকৃতি ও গঠনের বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যের কারণে প্রতিটি গুহাই কোনো না কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অনন্য হয়ে উঠেছে। গুদবুনগাহ গুহা ইয়াজদ প্রদেশের সুন্দর ও দর্শনীয় গুহাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে ভ্রমণ করলে প্রকৃতি ভ্রমণ ও গুহা অভিযানের একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হতে পারে।

গুদবুনগাহ গুহা কোথায় অবস্থিত?

গুদবুনগাহ গুহা নাদুশান শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হাফতেহর গ্রাম গুহাটির নিকটতম জনবসতি হিসেবে বিবেচিত হয়। গুহাটি ছোট ছোট পাহাড় ও নিচু পর্বতমালার মাঝখানে অবস্থিত। এই এলাকাটি বিভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে বন্য ভেড়া ও মাদি ভেড়া, বন্য ছাগল, তিতির ও তিহু। গুহার আশপাশের এলাকায় তৃণভূমি ও পার্বত্য এই দুটি বাস্তুতন্ত্র শনাক্ত করা যায়।

তৃণভূমি অংশের উদ্ভিদবিন্যাস খুবই বিরল বা অল্প ঘন। অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলে বুনো বাদাম, বুনো ডুমুর ও বেনেহ-এর মতো উদ্ভিদ জন্মে। এই এলাকায় জাফারি সাপও বাস করে। এটি এক ধরনের ভাইপার বা বিষধর সাপ এবং আকারে তুলনামূলকভাবে ছোট; এর দেহের দৈর্ঘ্য ৯০ সেন্টিমিটারের বেশি হয় না। এই সাপের উপস্থিতির কারণে প্রতি বছর এই এলাকায় মানুষ ও গবাদিপশুকে সাপে কামড়ানোর বেশ কিছু ঘটনা রিপোর্ট হয়। সামগ্রিকভাবে, এই অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় ২৫০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি প্রজাতি শুধু ইরানেই জন্মে।

গুদবুনগাহ গুহা: গঠন ও বৈশিষ্ট্য

গুদবুনগাহ গুহাটি মায়বোদ জেলার মারভার নিষিদ্ধ শিকারাঞ্চলের ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ফাটলসমূহের ওপর ভিত্তি করে গুহাটির উৎপত্তিকাল ক্রিটেশিয়াস যুগেরও পূর্ববর্তী সময়ের, অর্থাৎ প্রায় ১৫ কোটি বছর আগের। গুহাটির প্রবেশমুখ প্রায় গোলাকার এবং এর ব্যাস প্রায় ৯ মিটার। গুহায় প্রবেশের পথটি অনেকটা একটি কূপের মতো। এর দৈর্ঘ্য ১৫ মিটার এবং ঢাল প্রায় ৫০ শতাংশ। এই খাড়া প্রবেশপথটি গুহার প্রধান কক্ষে গিয়ে শেষ হয়েছে।

প্রধান কক্ষে কবুতরসহ কিছু পাখির বসবাসের চিহ্ন দেখা যায়। তবে এই অংশে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না বলে এখানে কোনো উদ্ভিদ জন্মায় না। বিশাল এই কক্ষের মেঝেতে নরম ও আঠালো মাটি রয়েছে। এই কক্ষে থাকা বিশাল ও সুউচ্চ স্ট্যালাগমাইট বা চুনাপাথরের স্তম্ভসদৃশ গঠনগুলো দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। এই সুন্দর প্রাকৃতিক কাঠামোগুলো শত শত হাজার বছর ধরে গুহার ছাদ থেকে পড়া পানির ফোঁটার মাধ্যমে বয়ে আনা খনিজ পদার্থের স্তর জমে তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে তীব্র খরার কারণে বৃষ্টির সময় ছাড়া গুহার ভেতরে পানির কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। প্রধান কক্ষের সবচেয়ে বড় স্ট্যালাগমাইটটির উচ্চতা প্রায় ৫ মিটার। প্রধান কক্ষটির আয়তন আনুমানিক ১৮ × ৩৫ মিটার। এই কক্ষের শেষ প্রান্তে কয়েকটি স্তম্ভের মতো পাথুরে গঠন তৈরি হয়েছে, যেগুলো গুহার মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত।

গুদবুনগাহ গুহার সংরক্ষণ ও ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

গুদবুনগাহ গুহাটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত অক্ষত ও অনেকটাই অজানা রয়েছে। একই কারণে খননকাজের মতো মানবিক কর্মকাণ্ডের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও গুহাটি রক্ষা পেয়েছে। ফলে গুহার অভ্যন্তরের গুহা-সঞ্চিত খনিজ গঠন (speleothem) ও অন্যান্য প্রাকৃতিক কাঠামো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।

তবে খরা এবং পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া গুহাটির প্রাকৃতিক গঠন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ, গুহার ভেতরের অংশে খনিজ পদার্থ পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন উঁচু-নিচু গঠন ও প্রাকৃতিক অলংকরণ তৈরির ক্ষেত্রে পানির প্রবাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গুহাটি ভ্রমণের জন্য শরৎ ও শীতকাল সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার বসন্তের শুরুতেও এ অঞ্চলের প্রকৃতি অন্য সময়ের তুলনায় বেশি সবুজ ও সতেজ থাকে এবং পর্যটকদের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপহার দিতে পারে। এই সুন্দর গুহায় অভিযান চালানো প্রযুক্তিগতভাবে খুব কঠিন নয় এবং এর জন্য অত্যাধুনিক সরঞ্জামেরও প্রয়োজন হয় না। তবে উপযুক্ত জুতা, প্রাথমিক গুহা-অভিযানের সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় খাবার সঙ্গে রাখা জরুরি।