পর্যটন আকর্ষণ স্থান

কিশের ভূগর্ভস্থ শহর পরিদর্শন, এমন এক অভিজ্ঞতা যা আপনি কখনোই ভুলতে পারবেন না!

কিশ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের অন্যতম বিখ্যাত দ্বীপ, যেখানে প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক এর ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো, বিশেষ করে কিশের ভূগর্ভস্থ শহর পরিদর্শনের জন্য ভ্রমণ করেন।

ভ্রমণ একটি আনন্দদায়ক ও স্মরণীয় ঘটনা, যা সঙ্গে করে নিয়ে আসে কয়েক ডজন, এমনকি শত শত স্মৃতি। তবে এসব স্মৃতির মধ্যে কিছু স্মৃতি অন্যগুলোর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয়ে থাকে; সেই স্মৃতিগুলো, যেগুলো সেই বিশেষ ভ্রমণের কথা উঠলেই আপনার মনে পড়ে এবং যেগুলো আপনি সবার সঙ্গে শেয়ার করতে চান! কোনো অনন্য পর্যটন আকর্ষণ পরিদর্শন এমন স্মৃতি তৈরির একটি কারণ হতে পারে। এখানে আমরা আপনাকে এমন একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, যেটি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে চিরকাল আপনার মনে গেঁথে থাকবে এবং আপনি সবসময় এই অসাধারণ অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইবেন: কিশের ভূগর্ভস্থ শহর; মাটির নিচে অবস্থিত একটি শহর, যা কিশ কারিজ নামেও পরিচিত।

কিশের ভূগর্ভস্থ শহরের বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস

এই অসাধারণ স্থাপনাটির নির্মাণকাল ২৫০০ বছর আগের বলে মনে করা হয়। শুরুতে এই সুড়ঙ্গটি একটি কারিজ বা ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহের নালা হিসেবে খনন করা হয়েছিল। কিন্তু কিছু সময় পর শহরের পানি সরবরাহব্যবস্থার উন্নতির ফলে এটি তার কার্যকারিতা হারায় এবং পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে এর শীতল পরিবেশ, মিষ্টি পানির উপস্থিতি এবং জীবাশ্মসমৃদ্ধ কাঠামোর কারণে বিনিয়োগকারীরা এটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এরপর বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং ইরানি স্থাপত্যের নীতিমালা অনুসরণ করে কারিজটির উন্নয়ন ও সংস্কার করা হয়।

কারিজের (নালা)  সংস্কারকাজ শুরু হয় মিষ্টি পানির উৎস ও এর নালাগুলোর ওপর কুল নামে একটি সুরক্ষামূলক কাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে। এরপর কারিজের দেয়াল ও ছাদ সংরক্ষণ এবং শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়। এই কার্যক্রমের ফলে কারিজের বিস্তৃতি প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটারে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি ইরানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের নীতিমালা অনুসরণ করে এখানে কয়েকটি বাজার, একটি জাদুঘর এবং একটি রেস্তোরাঁও তৈরি করা হয়।

কারিজের প্রবালময় ছাদে শামুক-ঝিনুক ও জলজ প্রাণীর নানা নিদর্শন দেখা যায়, যেগুলো সময়ের প্রবাহে জীবাশ্মের মতো রূপ নিয়েছে। এই স্থাপনার ছাদ অতীতে সমুদ্রের তলদেশের একটি অংশ ছিল। মাটির পৃষ্ঠ থেকে কারিজের গভীরতা ১৬ মিটার এবং কিছু কিছু স্থানে প্রবালময় ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত উচ্চতা প্রায় ৮ মিটার। মজার বিষয় হলো, কিশ দ্বীপের আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে উষ্ণ হলেও কারিজের ভেতরে সারা বছরই শীতল আবহাওয়া বিরাজ করে। কারিজের ভেতর দিয়ে মিষ্টি পানি প্রবাহিত হয়, যা কিশ দ্বীপের দুই প্রান্তে অবস্থিত সাফিন ও বাগু এলাকা থেকে আসে। কারিজে পৌঁছানোর পর পানির প্রবাহ তিনটি দিকে এগিয়ে যায় এবং কিছু দূর যাওয়ার পর আবার একত্রিত হয়ে প্রাচীন হরিরে শহরের দিকে প্রবাহিত হয়। এই পানির বেশিরভাগই মৌসুমি বৃষ্টিপাত থেকে আসে।

কারিজের প্রবালময় কাঠামো পানিকে এর ভেতরে প্রবেশের আগেই প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধন করে। বলা হয়, অতীতে কারিজের পানি ঔষধি গুণের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং তা বিক্রির উদ্দেশ্যে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়া হতো, যেখানে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে বিনিময় করা হতো। কারিজের মাটিও ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করা হতো।

কিশের ভূগর্ভস্থ শহরের দর্শনীয় স্থান

কিশের ভূগর্ভস্থ শহর কমপ্লেক্সে বিভিন্ন অংশ গড়ে তোলা হয়েছে, যা পর্যটকদের স্বাগত জানায়। এসবের মধ্যে প্রায় ২৮০ বর্গমিটার আয়তনের পারস্য উপসাগর জাদুঘর অন্যতম। জাদুঘরের একটি অংশে এমন একটি ফলক রয়েছে, যেখানে কারিজের ছাদে ৫৭ কোটি বছরের পুরোনো একটি জীবাশ্ম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক নথি ও পারস্য উপসাগরের পুরোনো মানচিত্র এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন ও রীতিনীতি সম্পর্কিত তথ্যও জাদুঘরের অন্যান্য আকর্ষণ।

১৯৯৪ সালে কারিজের ভেতরে একটি বাজার স্থাপন করা হয়। সেখানে কিশ দ্বীপ এবং পারস্য উপসাগরের আশপাশের এলাকার হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রির জন্য প্রদর্শন করা হয়।

এই কমপ্লেক্সে একটি মসজিদও রয়েছে, যেটিকে বিশ্বের একমাত্র প্রবালময় ছাদযুক্ত মসজিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কারিজের মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে এখানে বেশ কয়েকটি পায়াব তৈরি হয়েছে। পায়াব হলো অগভীর জলাধারের মতো কাঠামো, যেখান থেকে পানি সংগ্রহ করা যায়। কারিজ এলাকায় মোট ছয়টি পায়াব রয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এগুলোর প্রাচীনত্ব প্রায় আট শতাব্দী আগের।

কারিজে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিনোদন ও সেবামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা এখানে আনন্দদায়ক ভ্রমণ ও স্মরণীয় সময় কাটাতে পারেন। কিশ কারিজের বৈশিষ্ট্যগুলো অনন্য ও অসাধারণ হওয়ায় এর একটি অংশকে ফটোগ্রাফি কর্নার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে পর্যটকেরা সেখানে নিজেদের ভ্রমণের সেরা স্মৃতিচিত্র ধারণ করতে পারেন। আপনি যদি কিশ কারিজ ভ্রমণ করেন, তাহলে সেখানকার সুন্দর আলোকসজ্জা এমন স্মরণীয় ছবি তোলার ক্ষেত্রে আপনাকে আরও সাহায্য করবে!