পর্যটন আকর্ষণ স্থান

ইয়াজদের কারাভানসারাইগুলো মানবজাতির জন্য এক চিরস্থায়ী ঐতিহ্য।

ইয়াজদ প্রদেশের ছয়টি কারাভানসারাই (বিশ্রামাগার) ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়েছে।

কারাভানসারাইগুলো প্রাচীন ইরানের অন্যতম যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হতো। এসব স্থাপনার মধ্যে যাত্রীদের থাকার জন্য কক্ষ থাকত এবং সাধারণত এগুলোর স্থাপত্যশৈলীতে বেশ কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। কারাভানসারাইগুলোতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের একে অপরের সঙ্গে দেখা হতো এবং তারা সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আদান-প্রদানে অংশ নিতেন। ইরানি ও ইউরোপীয় পর্যটকদের রেখে যাওয়া ভ্রমণকাহিনিগুলোতে এই বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। তাই কারাভানসারাইকে শুধু একটি সরাইখানা হিসেবে বিবেচনা না করে, এর সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত নানা ভূমিকা ও গুরুত্বও স্বীকার করা উচিত।

ইরানি কারাভানসারাইগুলোর ইতিহাস প্রাচীনকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব কারাভানসারাইয়ের অস্তিত্ব পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভ্রমণ ও বাণিজ্যকে সহজতর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সাফাভি যুগে (খ্রিস্টীয় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দী), যখন ইরানে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল, তখন কারাভানসারাই নির্মাণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে সাফাভি শাসক শাহ আব্বাসের শাসনামলে (১৫৮৭–১৬২৯ খ্রিস্টাব্দ) ইরানে বহু কারাভানসারাই নির্মিত হয়। এগুলোর বেশ কিছু এখনো ইরানের বিভিন্ন শহরে  শাহ আব্বাসি কারাভানসারাই নামে টিকে আছে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৫তম অধিবেশনে ইরানি কারাভানসারাই শিরোনামে ৫৪টি কারাভানসারাই বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ৫৪টি কারাভানসারাই ইরানের ২৪টি প্রদেশে অবস্থিত। এর মধ্যে ছয়টি কারাভানসারাই ইরানের অন্যতম প্রাচীন ও মরুভূমি-প্রধান প্রদেশ ইয়াজদের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত। বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কারাভানসারাইগুলোর মধ্যে প্রতিটিই কোনো না কোনো দিক থেকে স্বতন্ত্র ও উল্লেখযোগ্য।

জিনালদিন কারাভানসারাই

অধিকাংশ ইরানি কারাভানসারাইয়ের স্থাপত্য চতুর্ভুজাকৃতির (আয়তাকার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বর্গাকার)। কিন্তু জিনালদিন কারাভানসারাইকে একমাত্র ইরানি কারাভানসারাই হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বৃত্তাকার আকৃতিতে নির্মিত হয়েছে। সাফাভি যুগে তৎকালীন কেরমানের শাসক জিনালদিন গঞ্জআলী খান রিগ এই স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাই তাঁর নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। এই কারাভানসারাইটি মেহরিজ শহরে অবস্থিত। স্থাপনাটির চারপাশে থাকা পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার প্রহরী-টাওয়ার ছিল প্রহরীদের অবস্থানের স্থান এবং কখনো কখনো পথিকদের পথ দেখানোর জন্য সেখানে আগুন জ্বালানো হতো। এই কারাভানসারাইটি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। জিনালদিন কারাভানসারাইয়ে পৌঁছাতে হলে ইয়াজদ শহর থেকে ইয়াজদ কেরমান সড়ক ধরে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এগিয়ে যেতে হয়।

মায়বুদের শাহ আব্বাসি কারাভানসারাই

এই কারাভানসারাইটি রেই থেকে কেরমান পর্যন্ত যাতায়াতপথে নির্মিত সড়ক-পরিচালনা ও যাত্রীসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোর একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। চাপারখানা (পুরোনো ডাকপিয়ন ও বার্তাবাহকদের অবস্থানের স্থান), পানির সংরক্ষণাগার এবং বরফঘর এসব স্থাপনা এই কারাভানসারাইয়ের ব্যাপক ব্যবহারের প্রমাণ বহন করে। ভবনটি চার-ইওয়ানবিশিষ্ট স্থাপত্যশৈলীতে ইট ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে। প্রবেশপথের অষ্টভুজাকার হল, কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণ, জলাধার-সংবলিত কক্ষ এবং যাত্রীদের থাকার ও গৃহপালিত পশু রাখার জন্য নির্মিত আচ্ছাদিত স্থানগুলো কারাভানসারাইয়ের বিভিন্ন অংশের অন্তর্ভুক্ত। এই স্থাপনাটি ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে  ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।

আনজিরেহর ইটের কারাভানসারাই

এই কারাভানসারাইটি কাজার যুগের (উনবিংশ শতাব্দী) এবং আরদাকান শহরে নির্মিত হয়েছিল। আনজিরেহ সাগান্দ ও তাবাসের মধ্যকার যোগাযোগপথে অবস্থিত। এই কারাভানসারাই থেকে ৫০০ মিটার দূরে আরেকটি কারাভানসারাই রয়েছে, যা পাথরের কারাভানসারাই নামে পরিচিত। কারাভানসারাইটির চারপাশের চারদিকে টাওয়ার ও ইটের অলংকরণ দেখা যায়। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই স্থাপনার প্রধান নির্মাণসামগ্রী হলো ইট।

আনজিরেহর পাথরের কারাভানসারাই

আনজিরেহর পাথরের কারাভানসারাইটি তার যমজ বোন ইটের কারাভানসারাই এর চেয়ে প্রাচীন। এই কারাভানসারাইটি ইলখানি যুগে (খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটিকে ইয়াজদ প্রদেশের সবচেয়ে প্রাচীন কারাভানসারাই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে  কারাভানসারাইটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। স্থাপনাটির প্রধান অংশ পাথর দিয়ে নির্মিত হলেও কিছু অংশে, যেমন প্রবেশপথের অষ্টভুজাকার হলে, ইটও ব্যবহার করা হয়েছে।

আকদার রাশতি কারাভানসারাই

কাজার যুগে বসবাসকারী হাজ আবুলকাসেম ইয়াজদি নামের একজন ইয়াজদি ব্যবসায়ী এই কারাভানসারাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থাপনাটির নির্মাণশৈলী সাফাভি যুগের কারাভানসারাইগুলোর অনুরূপ। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে কারাভানসারাইটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।

খারানাক কারাভানসারাই

এই কারাভানসারাইটিও আরদাকান শহরে অবস্থিত। কারাভানসারাইয়ের প্রশস্ত প্রাঙ্গণের মাঝখানে থাকা জলাধারটি অত্যন্ত মনোরম ও দর্শনীয়। কারাভানসারাইয়ের চারপাশে যাত্রীদের থাকার জন্য কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি কক্ষ বারান্দার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণের সঙ্গে সংযুক্ত। খারানাক কারাভানসারাইটি ২০০০ খ্রিস্টাব্দে  ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।