মানুষের জীবনে সময়ের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সুদূর অতীত থেকেই মানুষ সময় পরিমাপের জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড ও যন্ত্র আবিষ্কার করেছে এবং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সেগুলোর উন্নতি সাধন করেছে। ইতিহাসের এক পর্যায়ে, যখন বড় ঘড়ি আবিষ্কৃত হয়, তখন শহরগুলোতে উঁচু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়, যাতে তার ওপর বড় ঘড়ি স্থাপন করা যায়। এসব স্থাপনা সাধারণত শহরের কেন্দ্রীয় ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ করা হতো, যাতে শহরের যেকোনো স্থান থেকে মানুষ সহজেই তা দেখতে পারে এবং তাকিয়েই সময় জানতে পারে।
বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে আগের মতো সময় জানার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই। তবুও এসব স্থাপনা এখনো শহরগুলোতে টিকে আছে এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। ইরানের প্রাচীন শহরগুলোর অন্যতম ইয়াজদে শহরের একটি পুরোনো অংশে ‘ঘড়ি চত্বর’ নামে একটি চত্বর রয়েছে। আরও কয়েকটি স্থাপনার সঙ্গে মিলিত হয়ে এই চত্বরটি একটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনা-সমষ্টি গড়ে তুলেছে।
ইয়াজদের ঘড়ি চত্বরের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য
ইয়াজদের ঘড়ি চত্বর, যা ভাকতে-সা‘আত বা ভাক্ত ও সা‘আত নামেও পরিচিত, বাজার-এ নও সড়কে অবস্থিত। এই চত্বরে অবস্থিত টাওয়ারটি আবুবকর ইয়াজদি নামের একজন ব্যক্তি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন। এই কারণে ঘড়িটিকে ইরানের প্রাচীনতম নগরঘড়ি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। টাওয়ারটি নির্মাণ করতে সাত বছর সময় লেগেছিল।
তবে এই চত্বরের মূল স্থাপনা কাজার যুগের তুলনায় অনেক বেশি প্রাচীন। ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অষ্টম হিজরি শতাব্দীতে (চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দ), ইয়াজদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও ধর্মীয় পণ্ডিত, সাইয়্যেদ রুকনুদ্দিন কাজি যিনি এই এলাকাতেই বসবাস করতেন এখানে একটি গ্রন্থাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে এলাকাটি একটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই চত্বরের নাম ভাকতে-সা‘আত হওয়ার কারণ হলো, সাইয়্যেদ রুকনুদ্দিন সেখানে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও পর্যবেক্ষণমূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা এবং সূর্যঘড়ি হিসেবে ব্যবহৃত কিছু যন্ত্র স্থাপন করেছিলেন।
একটি ঐতিহাসিক কাঠামো ও স্থাপত্যের টাওয়ারে আধুনিক একটি যন্ত্র হিসেবে ঘড়ির স্থাপন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সহাবস্থানের প্রতীক। স্থাপত্যের দিক থেকে ঘড়ির টাওয়ারটি কাজার যুগের (উনবিংশ শতাব্দী) স্থাপত্যরীতির নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মিত। সাত রঙের টাইলসের ব্যবহার, উঁচু খিলান নির্মাণ এবং বাইরের অংশের অলংকরণ হিসেবে ব্যবহৃত মুকার্নাস এসব স্থাপনাটির উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য।
টাওয়ারটির পরিকল্পনা চতুর্ভুজাকার এবং এর শীর্ষের চার পাশে চারটি ঘড়ির ডায়াল স্থাপন করা হয়েছে। ইট দিয়ে নির্মিত এই টাওয়ারের উচ্চতা ২৫ মিটার। টাওয়ারটি নির্মাণের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো আশপাশের স্থাপনাগুলোর তুলনায় এটি অনেক উঁচু এবং দূর থেকেও সহজেই দেখা যায়।
ইয়াজদের ঘড়ি চত্বরের আশপাশের দর্শনীয় স্থান
ইয়াজদের ঘড়ির টাওয়ারটি যেহেতু শহরের অন্যতম প্রাচীন এলাকায় অবস্থিত, তাই এর আশপাশে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা। ইয়াজদের ঘড়ির টাওয়ারের পাশেই রয়েছে ঘড়ি চত্বরের জলাধার বা আব-আনবার। এই আব-আনবারটি খাজে আমির আস্তারাবাদি নামের একজন ব্যক্তি নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপনাটি নির্মাণের সময়কাল ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফিরে যায়। আব-আনবারটিতে ৪৯টি সিঁড়ি এবং চারটি বায়ু-ধরনকারী টাওয়ার বা বাদগির রয়েছে।
ঘড়ি চত্বরের কাছাকাছি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি হলো ইয়াজদ জামে মসজিদ। এই সুন্দর মসজিদটি তার সুউচ্চ মিনারগুলোর জন্য ইয়াজদ শহরের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। মসজিদটির নির্মাণ ও সম্পূর্ণ করার কাজ প্রায় ১০ শতাব্দী ধরে তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে। মসজিদটির সামগ্রিক স্থাপনা ১০৪ × ৯৯ মিটার আয়তনের একটি ভূমির ওপর নির্মিত।
সাইয়্যেদ রুকনুদ্দিন কাজির সমাধিসৌধ, উজিরের বাড়ি ও মসজিদ, হাজিরাহদের বাড়ি, সাইয়্যেদ আলী মোহাম্মদ উজিরির বাড়ি, উজির আব-আনবার, শোকুহি বাড়ি, শায়খিদের মসজিদ এবং ভাক্তালসা‘আত হোসেইনিয়া এসবও ইয়াজদের ঘড়ি চত্বরের কাছাকাছি অবস্থিত অন্যান্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনা। এছাড়া চত্বর থেকে অল্প দূরেই রয়েছে ইয়াজদ পানি জাদুঘর। এই জাদুঘরে বিগত শতাব্দীগুলোতে পানি সরবরাহ এবং কানাত খননের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির প্রদর্শনী রয়েছে।
ইয়াজদের ঘড়ি চত্বরের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন
এই স্থাপনাটি ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।