পর্যটন আকর্ষণ স্থান

বাহাবাদের হীরার গুহা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সুন্দর নিদর্শনগুলোর একটি।

বাহাবাদের হীরার গুহা পরিদর্শনের জন্য উচ্চমানের দক্ষতা এবং সম্পূর্ণ গুহা অভিযানের সরঞ্জাম প্রয়োজন।

গুহাগুলো মানুষের মনে ভয় ও নিরাপত্তার এক দ্বৈত অনুভূতি সৃষ্টি করে। একদিকে, এই প্রাকৃতিক ভূ-গঠনগুলোই ছিল সেই প্রথম স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে আদিম মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল এবং কোনো না কোনোভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। অন্যদিকে, তাদের সাধারণত ভয়ংকর চেহারা ও অন্ধকার পরিবেশের কারণে এগুলো গল্পকারদের কল্পনার উপকরণে পরিণত হয়েছে; আর সেখান থেকেই তারা অদ্ভুত সব দৈত্য ও দানবের সৃষ্টি করেছে!

তবে এসবের পরও গুহাগুলোকে প্রকৃতির অন্যতম আকর্ষণীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ এগুলো নানা আকর্ষণীয় প্রাণীর আবাসস্থল। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য ভিন্ন ধরনের চেহারার কোনো একটি গুহা দেখা হয়তো সবচেয়ে বড় দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হতে পারে। ইরানের কেন্দ্রীয় প্রদেশগুলোর একটি ইয়াজদ প্রদেশে এখন পর্যন্ত ৪২টি গুহা আবিষ্কৃত হয়েছে।

ইয়াজদের গুহাগুলোর গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য

প্রদেশটির গুহাগুলোর অধিকাংশেই দুই বা ততোধিক প্রবেশমুখ রয়েছে এবং সেগুলোর মাঝামাঝি অংশে পানির ছোট ছোট জলাধার বা পুকুর রয়েছে। পানির মজুত সহজলভ্য হওয়া এসব গুহায় প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হওয়ার অন্যতম কারণ।

ইয়াজদের কিছু গুহায় প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষের বসবাসের নিদর্শন দেখা গেছে। গুহাগুলোর নির্জনতা ও দুর্গম অবস্থানের কারণে এগুলোর কিছু ইয়াজদের জরথুস্ত্রীদের উপাসনাস্থলে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখোমুখি হয়েছিল এবং প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ তাদের অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছিল। এসবের মধ্যে আকদা শহরের কাছাকাছি অবস্থিত আশকাফত ইয়াজদান এবং ফারাশাহ-ই ইসলামী বা মোবেদান ফিরোজ গুহা এই বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

এই গুহাগুলোর মধ্যে আলমাস বা চিল গুহা ইয়াজদ প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং আশপাশের বসতিগুলো ও যাতায়াতের পথ থেকে অনেক দূরে থাকায় এখনো তার প্রাকৃতিক ও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। অবশ্য গুহাটিতে অনুসন্ধান চালানোর কঠিনতা এবং এর প্রাকৃতিক আকৃতি—যা মাটির অভ্যন্তরে একটি বিশাল গর্তের মতো—এটিকে অক্ষত থাকার আরেকটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আলমাস গুহাটি ইয়াজদ প্রদেশের সবচেয়ে পূর্বের জেলা বাহাবাদ-এ অবস্থিত। এই জেলার সীমানা কেরমান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত এবং কেরমানের সঙ্গে এখানকার সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক সাদৃশ্যও অনেক বেশি।

আলমাস গুহার বৈশিষ্ট্য

আলমাস গুহার বিস্তৃতি অনেক বড় এবং এখনো এর সম্পূর্ণ পরিসর আবিষ্কৃত হয়নি। কয়েকজন অনুসন্ধানকারী গুহার কিছু অংশে ভূমির প্রায় ১৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান করতে সক্ষম হয়েছেন। গুহায় প্রবেশের কারিগরি জটিলতা একেবারে প্রাথমিক প্রবেশমুখ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গুহায় প্রবেশের জন্য কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও উপকরণ প্রয়োজন। গুহার প্রবেশমুখ একটি খাড়া ঢালে অবস্থিত এবং এটি প্রায় ১ × ১.৫ মিটার আকারের একটি আয়তাকার কূপের মতো দেখতে।

গুহায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই এর সৌন্দর্য চোখে পড়ে। গুহার দেয়ালগুলো অনিয়মিত চুনাপাথরের গঠনে তৈরি, যেন মূল্যবান রত্ন দিয়ে সাজানো কোনো দেয়াল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খনিজ উত্তোলনের কার্যক্রম এবং খনি শ্রমিকদের করা বিস্ফোরণের ফলে গুহার কিছু অংশ ধসে পড়েছে। তা সত্ত্বেও, গুহাটি এখনো রহস্যে ঘেরা এক পরিবেশ হিসেবে অনুসন্ধানকারী ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাহাবাদের আলমাস গুহার গঠন পালিওজোয়িক থেকে ক্রিটেশিয়াস যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, গুহাটির মূল কাঠামো প্রায় ৭ কোটি বছর আগে গঠিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে গুহার দেয়ালে যে আকৃতিগুলো দেখা যায়, সেগুলো সময়ের সঙ্গে বৃষ্টিপাত, ক্ষয় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফলে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে এবং এগুলোর অধিকাংশের বয়স প্রায় ২০ লাখ বছর।

বাহাবাদের আলমাস গুহার বিভিন্ন অংশ

গুহাটি মোট পাঁচটি পৃথক অংশ নিয়ে গঠিত: প্রবেশ টানেল, প্রধান হল, পূর্ব হল, পশ্চিম হল প্রথম স্তর এবং পশ্চিম হল দ্বিতীয় স্তর। এই অংশগুলো উল্লম্বভাবে এবং অত্যন্ত খাড়া ঢাল নিয়ে মাটির গভীরে নেমে গেছে।

গুহার কূপসদৃশ প্রবেশপথটির গভীরতা প্রায় ১০ মিটার এবং এটি প্রধান হলে গিয়ে শেষ হয়েছে। প্রধান হলটি গুহার সবচেয়ে বড় স্থান। এর প্রস্থ ২ থেকে ৯ মিটারের মধ্যে, দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭ মিটার এবং উচ্চতা ৬ মিটার। এই অংশটি পূর্ব-পশ্চিম দিকে বিস্তৃত। ছাদ ও দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়ার কারণে প্রধান হলে চুনাপাথরের গঠন বা অলংকরণ তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া, হলের প্রবেশমুখের নিচে বন্যার পানির সঙ্গে গুহার ভেতরে প্রবেশ করা বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর জমে রয়েছে।

গুহার পূর্ব অংশে একটি অত্যন্ত উঁচু হল রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রধান হলের তুলনায় কম। গুহার এই অংশের প্রবালসদৃশ চুনাপাথরের গঠন অত্যন্ত সুন্দর। এ কারণেই গুহা অভিযাত্রীরা এটিকে প্রবাল হল নামে অভিহিত করেছেন।

প্রধান হলের চেয়ে ৫ মিটার নিচে প্রায় ৫ মিটার ব্যাসের একটি ছোট গ্যালারি বা পথ দেখা যায়। এই অংশে গুহার ভেতরে বায়ু চলাচল নেই বলে এখানকার চুনাপাথরের গঠনগুলো অত্যন্ত স্বচ্ছ।

গুহার সর্বনিম্ন অংশে একটি দ্বিমুখী শঙ্কু আকৃতির কূপ রয়েছে। এর মুখের ব্যাস ১২ মিটার এবং গভীরতা ১৫ মিটার। কূপটির তলদেশের দিকে যত এগোনো যায়, এর ব্যাস তত কমে আসে।

বাহাবাদের আলমাস গুহার জাতীয় নিবন্ধন

বাহাবাদের আলমাস গুহা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯৮ সৌর হিজরি) ইরানের জাতীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।