প্রাচীন শহরগুলোর চারপাশে প্রাচীর এবং যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন প্রবেশদ্বার বা নগরদ্বার থাকত। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। আপনি যদি প্রাচীন শহরগুলো ঘুরে দেখেন, তাহলে অবশ্যই এ ধরনের স্থাপনার কিছু নিদর্শন দেখতে পাবেন।
যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকার পাশাপাশি, এই নগরদ্বারগুলো শহরের শাসকদের জন্য আয়ের একটি ভালো উৎস হিসেবেও বিবেচিত হতো। কারণ নগরে প্রবেশ বা শহর থেকে বের হওয়া—নগরদ্বার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব ছিল না। ফলে শাসকেরা প্রবেশ ও প্রস্থানের ওপর শুল্ক বা কর (অভ্যন্তরীণ টোল) আদায় করে ভালো পরিমাণ অর্থ আয় করতে পারতেন!
কাজভিনের “তেহরান গেট” প্রাচীন কাজভিন শহরের অবশিষ্ট ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি “পুরোনো তেহরান গেট” নামেও পরিচিত।
কাজভিনের ইতিহাস
কাজভিন একটি প্রাচীন শহর। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাচীন লেখাগুলোতে “আরসাস” (آرساس) অথবা “আরসাসিয়া” (آرساسیا) নামে এই শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়। কাজভিনের আশপাশে বেশ কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক টিলা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে সেগজাবাদ টিলা সবচেয়ে পরিচিত। এই টিলার আবিষ্কার থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে মানুষের বসতির ইতিহাস প্রায় ৯ হাজার বছর পুরোনো।
ইরানের দক্ষিণ ও উত্তরের পাশাপাশি পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথে অবস্থিত হওয়ায় কাজভিন সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। সম্ভবত এই ভৌগোলিক সুবিধাই শাহ তাহমাস্প সাফাভি (শাসনকাল: ১৫১৪–১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ)-এর কাজভিনকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। তাঁর শাসনামলে কাজভিন শহরে ব্যাপক নির্মাণকাজ হয় এবং শহরের সামগ্রিক চেহারায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
পরবর্তীতে সাফাভি শাসনের রাজধানী ইসফাহানে স্থানান্তরিত হলেও কাজভিন তার গুরুত্ব হারায়নি। বরং মধ্য ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে এটি পরিচিতি ধরে রাখে।
সামিরান দুর্গ, সাদ-ওস-সালতানেহ কারাভানসারাই, জামে মসজিদ, মেইমুন কেল্লা, কাজারের গোসলখানা (হাম্মাম-এ কাজার), সারদার জলাধার, চেহেল সেতুন প্রাসাদ এবং সেপাহ সড়ক যেটিকে ইরানের প্রথম সড়ক বলা হয় কাজভিনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম।
কাজভিনে গ্রীষ্মকালে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে মৃদু এবং শীতকালে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা থাকে। শহরটির বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৩১৮ মিলিমিটার। কাজভিনকে ইরানের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে কাজভিন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির সম্মুখীন হয়েছে।
এই স্থাপনাটি কাজার রাজবংশের (উনিশ শতক) আমলের একটি নিদর্শন। এর নির্মাণকাল নাসেরুদ্দিন শাহের শাসনামল (১৮৩১–১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দ)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। তেহরান গেট কাজভিন শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। তৎকালীন কাজভিনের শাসক বাকের খান সাদ-ওস-সালতানেহ এই স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
প্রাচীন কাজভিন শহরে আরও আটটি নগরদ্বার ছিল। সেগুলো হলো রাশত, বাগশাহ, তাবরিজ, হামেদান, শেখআবাদ, ইমামজাদেহ হোসেইন, খান্দাকবার এবং দারব-এ কুশক।
বর্তমানে তেহরান গেট ও দারব-এ কুশক ছাড়া অন্য সব নগরদ্বার বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
কাজভিন থেকে তেহরানের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, ইরানের পূর্ব, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে তেহরান এবং দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে যাত্রা করা যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা কাজভিনকে তাদের মধ্যবর্তী গন্তব্য হিসেবে বেছে নিতেন। ফলে একসময় তেহরান গেটে ব্যাপক যাতায়াত ছিল এবং এটি শহরের অন্যতম প্রধান নগরদ্বার হিসেবে বিবেচিত হতো। এই গেটটি তেহরানের দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কের শুরুতেই অবস্থিত ছিল। এছাড়া এর নির্মাণশৈলী এমনভাবে করা হয়েছিল যে প্রয়োজনে এটি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তামূলক স্থাপনা হিসেবেও ব্যবহার করা যেত।
তেহরান গেট নির্মাণের সময় এটি শহরের প্রাচীরের বাইরের প্রান্তে অবস্থিত ছিল এবং শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহরের বিস্তারের কারণে এটি নগর এলাকার ভেতরে চলে এসেছে। গেটটির দীর্ঘ ইতিহাসে বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে করা সংস্কারকাজ, যখন এর চারপাশের দেয়ালে টাইলসের নকশা করা হয়।
তেহরান গেটে তিনটি তোরণ বা প্রবেশমুখ রয়েছে। মাঝের তোরণটি পাশের দুটির তুলনায় চওড়া ও উঁচু এবং এর উপরের অংশে একটি সূঁচালো খিলান রয়েছে। দুই পাশের প্রবেশমুখ পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অর্ধবৃত্তাকার খিলান দিয়ে নির্মিত। সাধারণত মাঝের তোরণ দিয়েই মানুষ ও যানবাহনের যাতায়াত হতো। গেটটির নকশায় তোরণগুলোর কোণায় মোট আটটি মিনার দেখা যায়।
কাজভিনের তেহরান গেটের জাতীয় নিবন্ধন
বর্তমানে কাজভিন শহরের পুরোনো তেহরান সড়কের শেষ প্রান্তে, হাশেমি স্কয়ারের কাছে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।