পর্যটন আকর্ষণ স্থান

পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লা ঘুরে দেখা এবং ইয়াজদের প্রাচীন দুর্গপ্রাচীর ও টাওয়ার পরিদর্শন।

এখনও ইয়াজদ শহরের পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লায় প্রাচীন দুর্গপ্রাচীর ও টাওয়ারের একটি অংশ অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে।

প্রথাগত নগর কাঠামো ঐতিহাসিক শহরগুলোর পরিচয় বহন করে। এই পরিচয় অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে পুরোনো মহল্লাগুলোতেই বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ইরানের প্রাচীন শহরগুলোর অন্যতম ইয়াজদে এমন অনেক পুরোনো মহল্লা রয়েছে, যেগুলো ঘুরে দেখা এবং সেখানকার অলি-গলিতে হাঁটা মনে এক স্মৃতিময় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

শত শত বছর ধরে এসব মহল্লা মানুষের বসবাসের স্থান ছিল। এখানকার মানুষরা প্রত্যেকে নিজেদের দুঃখ-কষ্ট ও আনন্দ নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন এবং তাঁদের জীবনের নানা স্মৃতি ও নিদর্শন রেখে গেছেন। আজ সেসব নিদর্শন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে আমাদের সামনে রয়েছে।

পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লা ইয়াজদের এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী মহল্লা। একসময় এটি শহরের সীমানা-প্রাচীরের পাশে অবস্থিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহরের সীমানা সম্প্রসারিত হওয়ায় এটি নতুন ইয়াজদ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলের অংশ হয়ে গেছে।

পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লা ও এর ঐতিহাসিক নিদর্শন

প্রাচীনত্বের দিক থেকে পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লাকে ইয়াজদের অন্যতম প্রাচীন মহল্লা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মহল্লার উত্তরে মাল-আমির (মালমির) মহল্লা, দক্ষিণে পির বুর্জ মহল্লা, পশ্চিমে ভাক্ত-আস-সা‘আত মহল্লা এবং পূর্বে সারসাং ও জুই হারহার মহল্লা অবস্থিত।

অতীতে পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লাকে শহরের সীমানা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইয়াজদ শহরের প্রাচীন টাওয়ার ও দুর্গপ্রাচীরের অবশিষ্টাংশ এই দাবিরই প্রমাণ। এখনও এই মহল্লায় সেই প্রাচীন টাওয়ার ও দুর্গপ্রাচীরের কিছু অবশিষ্টাংশ দেখা যায়।

হিজরি অষ্টম শতকে (খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে), আল-ই-মুজাফফর শাসনামলে, যখন শাহ ইয়াহিয়া ইয়াজদ শাসন করতেন, তখন এই মহল্লার বর্তমান স্থানে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে তিমুরীয় শাসনামলেও (খ্রিস্টীয় চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক) এই মহল্লায় আরেকটি দুর্গ নির্মিত হয়। পরে সাফাভি শাসনামলে (খ্রিস্টীয় ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতক) এটি পুরোনো দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে ইয়াজদের বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এই মহল্লায় অবস্থিত।

শাহ ইয়াহিয়া মসজিদ

পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লায় শাহ ইয়াহিয়া নামে একটি মসজিদের অস্তিত্ব এই ধারণাকে আরও জোরালো করে যে, মসজিদটি শাহ ইয়াহিয়ার শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মসজিদের মূল স্থাপনা হিজরি অষ্টম শতকের। বর্তমানে মসজিদটি ইমাম খোমেইনি সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। মসজিদটির দুটি অংশ শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন এবং একটি ছোট উঠান রয়েছে। আশপাশের রাস্তার তুলনায় উঠানটি কিছুটা নিচু এবং সেখানে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত শীতকালীন অংশে একটি অগভীর মিহরাব রয়েছে এবং তার উপরে একটি পুরোনো কাঠের জানালা দেখা যায়। মসজিদের গ্রীষ্মকালীন অংশটি মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে। এটি নতুন করে নির্মিত এবং দোতলা। বিভিন্ন প্রমাণ থেকে ধারণা করা হয়, ভবনটির এই অংশের আয়তন আগে আরও বড় ছিল; কিন্তু রাস্তা নির্মাণের কারণে এর কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে।

 

ইয়াজদের দারুল-হুকুমত

এই স্থাপনাটি  আরগে কালা, কালা আরগ, দিওয়ানখানা এবং নারেঞ্জ কালা নামেও পরিচিত। এটি ইমাম খোমেইনি সড়ক ও ইব্রাহিমি সড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত।

স্থাপনাটি তিমুর গুরকানের শাসনামলের একটি নিদর্শন। এর নির্মাণকাজ ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন হয়। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৪২৭ খ্রিস্টাব্দে, যখন আমির চাখমাক ইয়াজদ শাসন করতেন, তখন এই স্থানে একটি দিওয়ানখানা ও দারুল-কুরআন নির্মাণ করা হয়। ইয়াজদের দারুল-হুকুমতে একটি প্রশস্ত উঠান রয়েছে। উঠানের চারপাশে অনেকগুলো কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে এবং কক্ষগুলোর ভেতরের অংশ প্লাস্টার দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। ভবনের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি উঁচু একটি বায়ুপ্রবাহ-নির্মাণ ব্যবস্থাও এখানে চোখে পড়ে। উঠানের মেঝে কাঁচা ইট দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। এই কমপ্লেক্সে একটি মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছে, যার দরজা দারুল-হুকুমতের উঠানের দিকে খোলে।

ইয়াজদের প্রাচীন টাওয়ার ও দুর্গপ্রাচীর

বলা হয়,১০৪০ খ্রিস্টাব্দ ইয়াজদ শহরকে ঘিরে চারটি গোলাকার ফটকসহ একটি বৃত্তাকার প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ডাকাত ও শত্রুদের আক্রমণ থেকে শহরকে রক্ষা করা। কয়েক শতাব্দী পর, ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দ, ইয়াজদের বিখ্যাত শাসক আমির মোবারেজউদ্দিন এই প্রতিরক্ষা প্রাচীর সংস্কার করেন এবং এর ওপর ৯০টি প্রহরী টাওয়ার নির্মাণ করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই স্থাপনাটি বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। সম্ভবত এর সর্বশেষ বড় ধরনের সংস্কার প্রায় দুই শতাব্দী আগে করা হয়েছিল। এরপর শহরের পরিধি ও নগরায়ণ ক্রমে বিস্তৃত হওয়ার ফলে দুর্গপ্রাচীর ও টাওয়ারের কিছু অংশ ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে পুরোনো দুর্গ এলাকার মহল্লায় অবস্থিত অক্ষত টাওয়ার ও দুর্গপ্রাচীরের অংশ ছাড়াও, ফারমানদারি সড়ক এবং সাইয়্যেদ গোলসোরখের সমাধির কাছেও এর কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ইয়াজদের টাওয়ার ও দুর্গপ্রাচীর ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।