পর্যটন আকর্ষণ স্থান

বোনাবের মেহরাবাদ মসজিদ, সাফাভি যুগের শিল্পকলার সবচেয়ে সুন্দর নিদর্শন।

বোনাবের মেহরাবাদ মসজিদের সুশৃঙ্খল স্তম্ভ ও অপূর্ব সুন্দর স্তম্ভশীর্ষগুলোকে সাফাভি যুগের শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সুন্দর নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

একটি শিলালিপির উপস্থিতি, যেখানে মেহরাবাদ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতাদের নাম এবং মসজিদ নির্মাণের সঠিক তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য।

বোনাবের ইতিহাসের দিকে এক নজর

মেহরাবাদ মসজিদ, যাকে মেহরাবাদ জামে মসজিদ ও বলা হয়, ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের বোনাব শহরে অবস্থিত। বোনাব নামটি শুনলেই কাবাব বোনাব-এর কথা মনে পড়ে এটি একটি সুস্বাদু ইরানি কাবাব। পর্যটকদের জন্য এই কাবাবের স্বাদ গ্রহণ একটি আনন্দদায়ক ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে এই প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহরে পর্যটকদের জন্য আরও অসংখ্য ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ রয়েছে।

এক লাখেরও বেশি জনসংখ্যার এই শহরটি পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের দক্ষিণে এবং তাবরিজ শহরের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। বোনাবের আশপাশের টিলাগুলোতে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপনের ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। ধারণা করা হয়, পরবর্তী সব যুগেও এই অঞ্চলে মানুষের বসতি অব্যাহত ছিল। কারাকাশুনের কবরস্থান এলাকার দক্ষিণের উচ্চভূমিতে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা যায়, সাফাভি যুগে (খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দী) বোনাব শহরটি ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। বোনাব শহরে সেই সময়ের বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা যেমন হাম্মাম ও মেহরাবাদ মসজিদ আজও টিকে আছে, যা এই বিষয়টিরই প্রমাণ বহন করে।

ফারসি অভিধানগুলোতে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, বোনাব নামটি দুটি শব্দ বুন এবং  আব থেকে গঠিত। সেই অনুযায়ী নামটির অর্থ হতে পারে পানির গভীর তলদেশ  বা জলের নিচের অংশ।

গ্রীষ্মকালে এই শহরের আবহাওয়া বেশ মনোরম থাকে, তবে শীতকালে এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে। বোনাব শহরের কাছে অবস্থিত সাহান্দ পর্বতমালা এই এলাকার অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। এই জেলার উত্তর-পশ্চিম দিকে উর্মিয়া হ্রদ অবস্থিত।

মেহরাবাদ মসজিদ: ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

থুলুথ লিপিতে লেখা একটি মার্বেলের শিলালিপি অনুযায়ী, মেহরাবাদ মসজিদ নির্মাণের সঠিক তারিখ হলো ৯৫১ হিজরি (১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দ)। এই সময়টি শাহ তাহমাস্প প্রথমের শাসনামলের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি ১৫২৪ থেকে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ (৯৩০ থেকে ৯৮৪ হিজরি) পর্যন্ত ইরান শাসন করেন। তাঁর ৫২ বছরের শাসনকাল ইসলাম ইরানে আগমনের পর দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম শাসনকাল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর শাসনামলে তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি একজন ক্ষমতাবান ও ধর্মপ্রাণ শাসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বলা হয়, চিত্রকলা ও ক্যালিগ্রাফিতেও তাঁর আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল।

এই শিলালিপির তথ্য অনুযায়ী, বিবিজান খানম মনসুরবেগ  নামের একজন নারী মেহরাবাদ মসজিদ নির্মাণের পৃষ্ঠপোষক বা প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ধারণা করা হয়, মসজিদের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক মেহরাবাদ হাম্মামটিও একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এছাড়াও এই একই সময়ে বোনাব শহর ও এর আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হয়। এগুলোর মধ্যে বোনাব ময়দান মসজিদ (গেজাভুশ)-কে অন্যতম উল্লেখযোগ্য মসজিদ হিসেবে ধরা যায়। এই মসজিদের অভ্যন্তরীণ নকশা মেহরাবাদ মসজিদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে এখনো এমন কোনো শিলালিপি বা দলিল পাওয়া যায়নি, যার মাধ্যমে মসজিদটি নির্মাণের সঠিক তারিখ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।

বোনাবের মেহরাবাদ মসজিদের স্থাপত্য

মসজিদের আয়তাকার নামাজের হলটি মূল প্রাঙ্গণের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত। মসজিদের নির্মাণশৈলীর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানে একটি বারান্দা/গ্যালারি নির্মাণ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি সম্ভবত শুরু থেকেই নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হতো।

মসজিদের কাঠের ছাদকে মজবুতভাবে ধরে রেখেছে ৩৬টি কাঠের স্তম্ভ। এগুলো ছয়টি সারিতে, প্রতিটি সারিতে ছয়টি করে সাজানো। স্তম্ভগুলোর ভিত্তি পাথরের তৈরি এবং স্তম্ভের শীর্ষে রয়েছে মুকারনাস অলংকরণ। ছাদের ওজন স্তম্ভগুলোর ওপর সুষমভাবে বণ্টন করার জন্য ছয়টি পাথরের বিম ব্যবহৃত হয়েছে।

এই স্তম্ভগুলো সাফাভি যুগের শিল্পকলার প্রশংসনীয় নিদর্শন। এগুলোর সুশৃঙ্খল বিন্যাস ও নির্মাণশৈলী সে যুগের স্থাপত্যে ব্যবহৃত সূক্ষ্মতা ও নিখুঁত কারুকার্যের পরিচয় বহন করে।

নামাজের হলের কাঠের ছাদে ত্রাঞ্জ বা পদ্মাকৃতি নকশা এবং উদ্ভিদজাত অলংকরণ আঁকা হয়েছে। এসব নকশায় নীল, সবুজ, হলুদ, লাল ও কমলা রং ব্যবহার করা হয়েছে, যা ছাদের বাদামি রঙের কাঠের পটভূমিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ফুটে উঠেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই নকশাগুলো এখনো তাদের সতেজতা ও প্রাণবন্ততা ধরে রেখেছে। প্রতিটি স্তম্ভই স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে নির্মিত হয়েছে। তাই সব স্তম্ভের নকশা ও আকৃতিকে একরকম বলা যায় না।

নামাজের হলের দক্ষিণ দিকে একটি মেহরাব রয়েছে। মেহরাবের দুই পাশে দুটি জানালা রয়েছে, যেগুলো মসজিদের মূল নির্মাণকালের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নতুন। জানালাগুলোতে রঙিন কাচ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া বারান্দার পশ্চিম ও পূর্ব উভয় অংশে পাঁচটি করে জানালা রয়েছে।

মসজিদের বাহ্যিক অবয়ব তুলনামূলকভাবে সরল। বাইরের অংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো একটি উঁচু মিনার, যার নীল রঙের টাইলস দূর থেকেই চোখে পড়ে। মিনারটির উচ্চতা ১৪ মিটার এবং ব্যাস ২ মিটার। মিনারের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য ৩৩ ধাপের একটি সিঁড়ি রয়েছে।

মসজিদের প্রধান প্রবেশপথ পূর্ব দিকে অবস্থিত। এই প্রবেশপথ মূল প্রাঙ্গণের সঙ্গে সংযুক্ত। এই অংশ থেকেই বারান্দায় ওঠার জন্য একটি সিঁড়িপথ দেখা যায়।

বোনাবের মেহরাবাদ মসজিদের জাতীয় নিবন্ধন

মেহরাবাদ মসজিদটি বোনাব শহরের মোতাহারি সড়কে অবস্থিত। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় নিবন্ধিত হয়।