পর্যটন আকর্ষণ স্থান

ইরানি স্থাপত্যের চূড়ান্ত সৌন্দর্য উপভোগ করুন জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ে।

জেইনুদ্দিন কারাভানসারাই (বিশ্রামাগার) , যার নাম ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়েছে, এর বৃত্তাকার নকশার কারণে ইরানের কারাভানসারাইগুলোর মধ্যে অনন্য।

মেহরিজ জেলা ইয়াজদ প্রদেশের অন্তর্গত। মেহরিজের জনসংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি এবং এটি ইয়াজদ শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই কাউন্টিতে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে, যার মধ্যে জেইনুদ্দিন কারাভানসারাই অন্যতম। বর্তমানে এই কারাভানসারাইটি একটি ঐতিহ্যবাহী আবাসনকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি দেখতে হলে ইয়াজদ থেকে কেরমান যাওয়ার সড়কপথে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এই কারাভানসারাইটি সাফাভি আমলে (১৫০১ থেকে ১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত কারাভানসারাইগুলোর একটি। বিভিন্ন শহরের মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর থাকার ব্যবস্থা করা এবং বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মেহরিজের স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত একটি বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ে বন্দুকধারী সৈন্যরা অবস্থান করত।

জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ের ইতিহাস

এই কারাভানসারাইটি ষোড়শ শতাব্দী এবং সাফাভি শাসক শাহ আব্বাসের শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল। শাহ আব্বাস ১৫৮৭ থেকে ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুযায়ী, শাহ আব্বাস এবং তৎকালীন কেরমানের শাসক জেইনুদ্দিন গাঞ্জালি খান কিছু সময়ের জন্য এই কারাভানসারাইয়ে অবস্থান করেছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে  কারাভানসারাইটি সংস্কার করা হয়। ঐতিহ্যবাহী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে এর সঠিক পদ্ধতিতে পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের কাজ এতটাই উল্লেখযোগ্য ছিল যে, ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো সংস্কারকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্মানসূচক ডিপ্লোমা প্রদান করে।

জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ের বৈশিষ্ট্য

প্রায় সব ইরানি কারাভানসারাই আয়তাকার বা বর্গাকার নকশায় নির্মিত। এই দিক থেকে জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ের বৃত্তাকার স্থাপত্য এটিকে ইরানের অন্যান্য কারাভানসারাইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। যে বৃত্তাকার কাঠামোর মধ্যে কারাভানসারাইটি নির্মিত হয়েছে, তার ব্যাস ৪৬ মিটার। ভবনটিতে পাঁচটি টাওয়ার এবং ১২টি সাফে রয়েছে। সাফে বলতে খিলানযুক্ত ছাদবিশিষ্ট ইওয়ান ও হলঘরকে বোঝায়। এই টাওয়ারগুলোতে কারাভানসারাইয়ের প্রহরী ও নিরাপত্তারক্ষীরা অবস্থান করতেন। অতীতে রাতে কাফেলাগুলোকে পথ দেখানোর জন্য কখনো কখনো এসব টাওয়ারের ওপর আগুন জ্বালানো হতো।

কারাভানসারাইয়ের মাঝখানে একটি ১২-কোণবিশিষ্ট উঠান রয়েছে। পুরো ভবনের অলংকরণ এই ১২-কোণবিশিষ্ট উঠানের কাঠামোর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ইট, কাঁচা ইট ও মাটি হলো কারাভানসারাইটি নির্মাণের প্রধান উপকরণ। ভবনের দেয়ালগুলোর উচ্চতা ৮ মিটার পর্যন্ত। এর পানির সরবরাহ কাছাকাছি অবস্থিত একটি ঝরনা থেকে হয়। ঝরনাটি এখনও প্রবাহমান এবং কারাভানসারাইয়ের আশপাশে বেড়ে ওঠা গাছগুলোকে পানি সরবরাহ করে।

কারাভানসারাইয়ের প্রবেশপথ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এখানে প্রবেশের জন্য একটি সুন্দর তোরণ তৈরি করা হয়েছে, যা একটি হাশতির দিকে নিয়ে যায়। এই হাশতি পার হওয়ার পর কারাভানসারাইয়ের সুন্দর উঠানটি চোখে পড়ে। এর বিশেষ আকৃতি এবং মাঝখানে থাকা জলাধার উঠানটিকে অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম করে তুলেছে। উঠানের চারপাশে ইওয়ান রয়েছে, যেগুলো মঞ্চের মতো উঠানের মেঝে থেকে কিছুটা উঁচু। ইওয়ানগুলোর শেষ প্রান্তে কারাভানসারাইয়ের কক্ষগুলো অবস্থিত। ইওয়ানগুলো কাফেলার যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য ব্যবহৃত হতো এবং কখনো কখনো পণ্য কেনাবেচার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। কক্ষগুলোর পেছনে প্রশস্ত ও দীর্ঘ করিডোর রয়েছে, যেগুলো আস্তাবলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।

ধারণা করা হয়, এই স্থাপনার উত্তর দিকের কক্ষটি অতীতে শাহনশিন হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের থাকার জন্য নির্ধারিত ছিল। উঁচু ছাদ, কারবন্দি অলংকরণ এবং প্লাস্টারের সজ্জা এই কক্ষটিকে অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করেছে। শাহনশিনটি একটি ইওয়ানের পেছনে অবস্থিত এবং সেখানে আট-কোণবিশিষ্ট কয়েকটি কক্ষ দেখা যায়। এই অংশে দুটি গম্বুজবিশিষ্ট কক্ষও রয়েছে। বর্তমানে আবাসন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে শাহনশিনের একটি অংশ খাবার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্য একটি অংশে হাতে বোনা কার্পেট ও সুন্দর পিঠে দেওয়ার গালিচা প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে।

জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের পারস্পরিক প্রতিসাম্য। প্রকৃতপক্ষে, ভবনটির একটি কাল্পনিক প্রতিসাম্যরেখা উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে টানা যায়। আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য সম্ভবত ব্যবহৃত হতো এমন কিছু প্রাচীরের খাঁজযুক্ত অংশ, টাওয়ার ও দেয়ালের সমন্বয় এবং কারাভানসারাইয়ের ইটের সম্মুখভাগ এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকে কয়েকটি সিঁড়ি কারাভানসারাইয়ের ছাদে ওঠার পথ তৈরি করেছে। মরুভূমির রাতে কারাভানসারাইয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে অসংখ্য তারায় ভরা আকাশ দেখা এক অবর্ণনীয় অনুভূতি এনে দেয়।

জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইয়ের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি

এই কারাভানসারাইটি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৫তম অধিবেশনে জেইনুদ্দিন কারাভানসারাইটি আরও ৫৩টি স্থাপনার সঙ্গে কারাভানসারাই নামে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।