কারাভানসারাগুলো অতীতে ইরানে পথের ধারে যাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা এবং যাতায়াতের পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল। বর্তমানে কারাভানসারাগুলো আর আগের মতো ব্যবহৃত হয় না। তবে এগুলোতে উপস্থিত হলে শত শত বছর ধরে এখানে চলতে থাকা কোলাহল ও ব্যস্ততাকে কল্পনা করা সম্ভব! দেইর গাচিন ইরানের সেইসব কারাভানসারার অন্যতম, যা ইরানের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্বীকৃত।
দেইর গাচিন কারাভানসারাই কোথায় অবস্থিত?
এই কারাভানসারাইটি কোম থেকে গার্মসার যাওয়ার মহাসড়কের ৭০তম কিলোমিটারে, আলী-আবাদ নামের একটি গ্রামের কাছে অবস্থিত। কারাভানসারাইটি কোম শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার এবং ভারামিন শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে। এটি এমন একটি ঐতিহাসিক পথে অবস্থিত, যে পথটি রেই ও কোম শহরকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করত।
দেইর গাচিন কারাভানসারাইটি মরুভূমি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই অঞ্চলটি ইরানের প্রাচীনতম সংরক্ষিত এলাকাগুলোর একটি। এর আয়তন প্রায় ৬৭০০ বর্গকিলোমিটার। অতীতে এই উদ্যানটিতে অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী বসবাস করত এবং প্রাণীবিজ্ঞানীদের কাছে এটি ছোট আফ্রিকা নামে পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে বিভিন্ন কারণে, বিশেষ করে পরপর কয়েক বছর ধরে চলা খরার কারণে, এখানকার জীববৈচিত্র্য অনেকটাই কমে গেছে। তা সত্ত্বেও এখনও এখানে ইরানের মরুভূমি অঞ্চলের অনেক প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এই উদ্যানটি ইরানের জীবমণ্ডল সংরক্ষণাগারগুলোর একটি হিসেবেও বিবেচিত হয়।
দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ের ইতিহাস ১৭ শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। তাঁদের ধারণা, কারাভানসারাইয়ের খিলান, গম্বুজ এবং অর্ধ-উপবৃত্তাকার প্রহরী টাওয়ারগুলোর কাঠামোতে ইটের সন্ধান পাওয়ায় এর নির্মাণকাল সাসানীয় সম্রাট আরদেশিরের শাসনামলে (খ্রিস্টাব্দ ২২৪ থেকে ২৪২) পৌঁছে যায়। সেলজুকদের শাসনামলে (খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দী) কারাভানসারাইটি সামগ্রিকভাবে সংস্কার করা হয়। সাফাভি যুগে (খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দী), যখন সড়কপথের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যের প্রসারের দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, তখন এই কারাভানসারাইয়ের গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। এই সময় ভবনটির ব্যাপক সংস্কার করা হয় এবং এর ভেতরে ও বাইরে দেয়াল নির্মাণ করা হয়। সাদা রঙের ইটের ব্যবহার এবং জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে ইট সাজানোর কৌশল এই সময়ের স্মারক।
পরবর্তীতে কাজার যুগে (খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দী) ভবনটির আরও কিছু সংস্কার করা হয়, যার বেশিরভাগই এর বাইরের অংশে করা হয়েছিল। এভাবে বিশেষজ্ঞরা ভবনটির নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের ইতিহাসকে সাসানীয়, সেলজুক, সাফাভি এবং কাজার এই চারটি যুগে ভাগ করেন।
প্লাস্টার বা জিপসাম দিয়ে তৈরি একটি গম্বুজ থাকার কারণে কারাভানসারাইটির নাম দেওয়া হয় দেইর গাচিন। তবে এই স্থাপনাটি আরও কয়েকটি নামে পরিচিত ছিল, যেমন আরদেশির, দেইর আল-জাস এবং দেইর কাজ। আয়তনের দিক থেকে এই কারাভানসারাইকে ইরানের অন্যতম বৃহৎ কারাভানসারাই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বৈশিষ্ট্যই দেইর গাচিনের বিশেষ গুরুত্ব এবং একটি ব্যস্ত যাতায়াতের পথে এর অবস্থানের প্রমাণ বহন করে।
দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ের স্থাপত্য
স্থাপনাটি বর্গাকার আকৃতির এবং এর আয়তন প্রায় ১০৯ × ১০৮ মিটার। পুরো কারাভানসারাইয়ের মোট আয়তন প্রায় ১২ হাজার বর্গমিটার। কয়েকটি প্রহরী টাওয়ার, একটি বড় উঠান, প্রবেশপথ ও হাশতি, ইওয়ান, বেশ কয়েকটি কক্ষ ও ছোট কামরা এবং পণ্য কেনাবেচার জন্য দোকান—এসবই কারাভানসারাইয়ের প্রধান অংশ।
কারাভানসারাইয়ের কাছে একটি অগ্নিমন্দির, পানির সংরক্ষণাগার এবং একটি কবরস্থানও রয়েছে। কারাভানসারাইয়ের প্রধান দরজা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে কাফেলাগুলো যে পথ দিয়ে চলাচল করত, সেখান থেকে সহজে প্রবেশ করা যায়।
ভবনটিতে মোট ৩৬টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি পাশে আট বা দশটি করে কক্ষ রয়েছে। কক্ষগুলো বর্গাকার এবং প্রতিটিতে মাত্র একটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে কয়েকটি কুলুঙ্গি তৈরি করা হয়েছে এবং সেগুলোর উপরে অলংকারমূলক খিলান দেখা যায়। কক্ষগুলোর সামনে একটি ইওয়ান নির্মাণ করা হয়েছে, যা উঠানের তুলনায় প্রায় এক মিটার উঁচু। কারাভানসারাইয়ের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি বিশেষ কক্ষ রয়েছে, যাকে শাহ-নেশিন বলা হয়। এই বিশেষ কক্ষটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হতো।
দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ের অভ্যন্তরীণ অংশ
বড় কেন্দ্রীয় উঠানের মাঝখানে একটি জলাধার বা পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে, প্রবেশপথের পাশে প্রায় ৩০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি মসজিদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই মসজিদটি পরীক্ষা করে মনে করেন যে, এর গম্বুজ ও মিহরাব সেলজুক যুগে নির্মিত হলেও মসজিদের মূল কাঠামো ইরানে ইসলামের আগমনের শুরুর দিকে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল।
মজার বিষয় হলো, এই কারাভানসারাইয়ে একটি গণস্নানাগারও ছিল। স্নানাগারটি কারাভানসারাইয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। কারাভানসারাইয়ের দুটি কূপ থেকে স্নানাগারের প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা হতো এবং স্নানাগারের বর্জ্য পানি একটি নির্দিষ্ট কূপে ফেলা হতো। কারাভানসারাইয়ের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে একটি ময়দা তৈরির কল ছিল, যা পশুর শক্তিতে পরিচালিত হতো। মানববসতির কেন্দ্র থেকে কারাভানসারাইটির দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এই কলের উপস্থিতি সেখানে প্রয়োজনীয় ময়দার জোগান নিশ্চিত করত। কারাভানসারাইয়ে ভারবাহী ও গৃহপালিত পশু রাখার জন্যও আলাদা জায়গা তৈরি করা হয়েছিল। এসব স্থান থাকার কক্ষ ও ছোট কামরাগুলোর পেছনে অবস্থিত এবং সেখানে একাধিক আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে।
কারাভানসারাইয়ের প্রবেশপথ, টাওয়ার ও দেয়াল এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে স্থাপনাটির নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। বাইরের দেয়ালের পুরুত্ব কোনো কোনো স্থানে তিন মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। দেয়ালের ওপরের অংশে কেল্লার মতো খাঁজযুক্ত প্রাচীর রয়েছে, যাতে সম্ভাব্য আক্রমণের সময় প্রহরীরা এর আড়ালে অবস্থান নিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারে। দক্ষিণ ফটকের পাশে কয়েকটি ছোট কক্ষ রয়েছে, যেখানে সম্ভবত প্রহরীরা অবস্থান করত।
দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
দেইর গাচিন কারাভানসারাই ২০০৩ সালে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে এই স্থাপনাটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।