ফিন শহর ও এর বৈশিষ্ট্য
বন্দর আব্বাস থেকে সিরজানের সড়কে ৯৫ কিলোমিটার দূরে, ফিন শহরে একটি উঁচু টিলার ওপর একটি সুন্দর দুর্গের ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত। বর্তমানে এই দুর্গটি ফিন দুর্গ নামে পরিচিত।
ফিন শহরটি হরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাস কাউন্টিতে অবস্থিত এবং বন্দর আব্বাস শহর থেকে এর দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার। এই শহরে প্রায় ৪ হাজার মানুষ বসবাস করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, শহরটির গড়ে ওঠার ইতিহাস আখেমেনীয় যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ) পৌঁছে যায়। তাঁদের ধারণা, প্রাচীনকালে এই শহর পারস অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সাফাভি যুগে (খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী) দক্ষিণাঞ্চলের প্রতি সাফাভি শাসকদের বিশেষ মনোযোগের কারণে ফিনের অনেক স্থাপনা সংস্কার করা হয় এবং শহরটি বেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সেই সময় পর্তুগিজরা পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ ও কেশম দ্বীপপুঞ্জে অবস্থান করলেও সাফাভিদের কাছে পরাজিত হয়ে পিছু হটেছিল। ফলে পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক ইরানের বাণিজ্যও বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত ফিনের ঐতিহাসিক দুর্গটিও এই সময়ে কাফেলাগুলোর নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিন নামটি সাধারণত পানিসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর জন্য ব্যবহৃত হতো। ইরানে ফিন নামে আরও কয়েকটি শহর ও অঞ্চল রয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো প্রবাহমান পানির উপস্থিতি এবং বাগানচাষ ও কৃষির সমৃদ্ধি। ফিনকে একটি উদ্যাননগরী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এখানে ঘন খেজুরবাগান ও বাগানঘেরা সরু গলিপথ রয়েছে এবং শহরটিতে কোনো উঁচু ভবন দেখা যায় না।
ফিন শহরটি বাজ (২,৪৪৯ মিটার উচ্চ) এবং গেনু (২,২৪৯ মিটার উচ্চ) এই দুটি উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত। প্রায় ১০০ বছর আগেও ফিন ফারস প্রদেশের অংশ ছিল। কিন্তু ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩০৮ সৌর হিজরি) এটি হরমোজগান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং তখন থেকে দুই প্রদেশের সীমান্তবর্তী শহরগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ফিন থেকে পারস্য উপসাগরের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণে বছরের অধিকাংশ সময় এখানকার আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে, বিশেষ করে শরতের মাঝামাঝি থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত, ফিনের আবহাওয়া মনোরম থাকে। তবে বছরের অন্যান্য সময়ে এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত উষ্ণ থাকে।
ফিন দুর্গ একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ
ফিন শহরের সমতল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উঁচু স্থানে নির্মিত এই দুর্গটি এক অসাধারণ মহিমা লাভ করেছে। যে টিলার ওপর দুর্গটি নির্মিত, তার সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ২৯০ মিটার এবং সর্বোচ্চ প্রস্থ ১৮০ মিটার। দুর্গের অবশিষ্টাংশ ও চারপাশের কয়েকটি প্রহরী-টাওয়ার দেখে ধারণা করা যায় যে, দুর্গটি একটি অনিয়মিত বহুভুজ আকৃতিতে নির্মিত হয়েছিল, যাতে চারদিকের ওপর নজর রাখা যায়।
দুর্গে পাওয়া কিছু মৃৎপাত্র সম্ভবত ইলখানি ও তিমুরি যুগের (১৩শ থেকে ১৫শ শতাব্দী)। ধারণা করা হয়, এরপর সাফাভি যুগে (১৬শ শতাব্দী) দুর্গটির সংস্কার ও উন্নয়ন করা হয়েছিল, যাতে সেখানে প্রহরীদের অবস্থান করানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কয়েক দশক আগেও স্থানীয় খানরা এই দুর্গ ব্যবহার করতেন। টিলার খাড়া ঢালে পরবর্তী সময়ে নির্মিত কিছু সংযোজনও দেখা যায়, যেখানে ধাতব কাঠামো এবং ইটের মতো নির্মাণসামগ্রীর উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়।
দুর্গটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। এর প্রহরী-টাওয়ার, বিশেষ নির্মাণশৈলী এবং উঁচু স্থানে অবস্থান সবকিছুই এর সামরিক ব্যবহারের প্রমাণ বহন করে। দেয়াল ও টাওয়ারগুলোর নিচের অংশে অনিয়মিত পাথর সারুজ নামের ঐতিহ্যবাহী মর্টার দিয়ে একটির ওপর একটি সাজানো হয়েছে। এর ওপর ২০ × ২০ × ৫ সেন্টিমিটার আকারের কাঁচা ইট বসানো হয়েছে।
টিলার উত্তর-পূর্ব অংশে প্রায় ৯ মিটার দীর্ঘ একটি দেয়াল দেখা যায়, যার উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার। দেয়ালটির কাঠামোতে ত্রিকোণাকার বা সূঁচালো খিলানযুক্ত জানালা রয়েছে। পশ্চিম অংশে প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার পুরু দেয়ালবিশিষ্ট একটি টাওয়ার নির্মিত হয়েছে, যার অভ্যন্তরীণ অংশ দুই তলা।
২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ভূমিকম্পে স্থাপনাটির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তারপরও দুর্গের মধ্যে কিছু স্থানকে অতিথিশালা ও কার্যালয় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এছাড়া দুর্গের কাঠামোর মধ্যে একটি কূপ এবং একটি বড় জলাধারও দেখা যায়।
ফিন দুর্গের জাতীয় নিবন্ধন
এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।