দক্ষিণ সাহান্দের নৃতত্ত্ব জাদুঘর, পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের প্রথম নৃতত্ত্ব জাদুঘর।
নৃতত্ত্ব জাদুঘর হলো এমন স্থান, যেখানে মানুষের বিশ্বাস, রীতিনীতি, ভাষা, জীবিকা, খাবার, পোশাক, বাসস্থান, কারিগরি দক্ষতা, শিল্পকলা এবং দৈনন্দিন জীবনের সরঞ্জাম ও উপকরণ সম্পর্কে পরিচয় তুলে ধরা হয়।
এই জাদুঘরগুলোতে যা প্রদর্শন করা হয়, তা মানুষের জীবনের এমন কিছু অংশের প্রতিচ্ছবি, যা হয়তো দৈনন্দিন জীবনে এতটাই স্বাভাবিক ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যে আমরা এর গুরুত্ব সহজে উপলব্ধি করি না।
ইরানে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার পদ্ধতির মধ্যে এত বেশি বৈচিত্র্য রয়েছে যে এটিকে রীতিনীতি ও বিশ্বাসের একটি রঙধনু হিসেবে বর্ণনা করা যায়। এই বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু, ভৌগোলিক অবস্থান, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে।
এই কারণেই সমগ্র ইরানজুড়ে “নৃতত্ত্ব জাদুঘর” নামে বিভিন্ন জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনধারার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
“দক্ষিণ সাহান্দ নৃতত্ত্ব জাদুঘর”-ও এমন একটি প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে সেইসব পরিশ্রমী ও কর্মঠ মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক প্রদর্শন করা হয়েছে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করেছেন এবং তার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন।
দক্ষিণ সাহান্দ নৃতত্ত্ব জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?
এই জাদুঘরটি একটি পুরোনো ভবনে অবস্থিত, যা মেহরাবাদ হাম্মাম (Mehrabad Bathhouse) নামে পরিচিত। অতীতে, যখন শহুরে জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা তেমন বিস্তৃত ছিল না এবং সবার জন্য পাইপলাইনের পানি ও বাড়িতে ব্যক্তিগত গোসলখানার ব্যবস্থা ছিল না, তখন এই হাম্মামটি বেনাব (Bonab) শহরের মানুষের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ছিল।
অতীতে জ্বালানি সংগ্রহের উচ্চ খরচ এবং পানি স্থানান্তরের কঠিনতার কারণে হাম্মামগুলো এমনভাবে নকশা করা হতো, যাতে পানির সর্বোচ্চ সাশ্রয় এবং তাপ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা যায়। ইসলাম ধর্মে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বের কারণে হাম্মামগুলো সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। তাই এগুলো নির্মাণে প্রতিটি যুগের সর্বোচ্চ প্রকৌশল ও স্থাপত্য জ্ঞান ব্যবহার করা হতো।
এছাড়াও, হাম্মামের ভেতরের পরিবেশে উচ্চ আর্দ্রতা থাকার কারণে এর কাঠামো নির্মাণ ও নকশায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন হতো। মেহরাবাদ হাম্মামের নির্মাণেও এই সব বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
এই হাম্মামের মোট নির্মিত এলাকা ৩২৪ বর্গমিটার। এটি ইট, পাথর ও সারুজ (এক ধরনের প্রাচীন ইরানি নির্মাণ মিশ্রণ) দিয়ে তৈরি। ইরানি স্থাপত্যে ব্যবহৃত প্রাচীন এক ধরনের মর্টার সারুজ এবং ভবনের সব অংশে চুনের প্রলেপ ব্যবহারের কারণে স্থাপনাটি অত্যন্ত মজবুত হয়েছে। ভবনের বাইরের অংশে পাথরের ভিত্তি ও লালচে ইটের ব্যবহার এর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে।
কিছু ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মেহরাবাদ হাম্মামের ভিত্তি সাফাভি যুগে (১৬শ শতাব্দী) স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভবনটিতে কয়েকবার সংস্কার কাজ করা হয়।
অবশেষে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩৭৫ হিজরি সৌর সন) বেনাব পৌরসভা ভবনটি এর মালিকের কাছ থেকে কিনে নেয় এবং পুনর্নির্মাণের জন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে (১৩৮২ হিজরি সৌর সন) সংস্কার কাজ শেষ হয় এবং হাম্মামটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে এটি পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের প্রথম নৃতত্ত্ব জাদুঘর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
এই ভবনটি মেহরাবাদ মসজিদের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত। এই মসজিদটিও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। সেখানে থাকা একটি শিলালিপি অনুযায়ী, মসজিদটি ৯৫১ হিজরি (১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দে) নির্মিত হয়েছিল, যা শাহ তাহমাস্প প্রথমের শাসনামলের সময়কাল।
এই মসজিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সুন্দর স্তম্ভের শীর্ষভাগ (capital), যা কিছু বিশেষজ্ঞের মতে সাফাভি যুগের ইরানি শিল্পকলার অন্যতম সুন্দর নিদর্শন।
মেহরাবাদ মসজিদ ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে এবং মেহরাবাদ হাম্মাম ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩৭৮ হিজরি সৌর সন) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
দক্ষিণ সাহান্দ নৃতত্ত্ব জাদুঘর: বিভাগ ও বৈশিষ্ট্য
অন্যান্য নৃতত্ত্ব জাদুঘরের মতো এই জাদুঘরের উদ্দেশ্য হলো এই অঞ্চলের মানুষের রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা সম্পর্কে পরিচয় তুলে ধরা। এখানে হাশতারুদ, মারাগেহ, বেনাব, আজাবশির ও মালেকান শহরের মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, পোশাক এবং দৈনন্দিন জীবনের কার্যক্রম প্রদর্শন করা হয়েছে।
মোটের ওপর এই জাদুঘরে ১২টি বিভাগ রয়েছে। এই বিভাগগুলো মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজ, সরঞ্জাম ও উপকরণের ব্যবহারের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে।
জাদুঘরের ১২টি বিভাগ হলো:
- বাদ্যযন্ত্র
- কাপড় বয়ন শিল্প
- আলোকসজ্জা ও আলো ব্যবহারের সরঞ্জাম
- অলংকার
- পোশাক
- দাফন ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংক্রান্ত সামগ্রী
- ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি
- প্রার্থনা, তাবিজ ও মন্ত্রসংক্রান্ত সামগ্রী
- কৃষি সরঞ্জাম
- ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি বস্ত্র ও কারুশিল্প
- কামারশিল্প
- পানি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত পাত্র ও সরঞ্জাম
এই বিভাগগুলোর মাধ্যমে দক্ষিণ সাহান্দ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
| দক্ষিণ সাহান্দের নৃতত্ত্ব জাদুঘর, পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের প্রথম নৃতত্ত্ব জাদুঘর। | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| সাহান্দ |







