ইয়াজদের মুদ্রা জাদুঘর প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানি মুদ্রার গল্পের বর্ণনাকারী।
ইয়াজদের মতো ঐতিহাসিক শহরগুলো তাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ উপযোগী। এ কারণেই ইয়াজদ শহরে অনেক জাদুঘর রয়েছে, যার প্রতিটিতে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই মরু শহরের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। ইয়াজদের মুদ্রা ও নৃতত্ত্ব জাদুঘর, যা এই শহরের আরবজাদে বাড়িতে অবস্থিত এবং হায়দারজাদে মুদ্রা জাদুঘর নামেও পরিচিত, বিশেষভাবে মুদ্রা ও অর্থ প্রদর্শনের জন্য নিবেদিত। অর্থনৈতিক লেনদেনের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে মুদ্রা ও অর্থের ইতিহাস এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ইয়াজদের মুদ্রা ও নৃতত্ত্ব জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?
এই জাদুঘরটি শহরের অন্যতম প্রাচীন এলাকা ফাহাদান মহল্লায় অবস্থিত। অতীতে এই এলাকা ইয়াজদের অভিজাতদের বসবাসের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। জাদুঘরের অধিকাংশ নিদর্শন ১৯৫৬ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত হোসেইন হায়দারজাদে-র প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাই তাঁর নাম অনুসারে এই জাদুঘরের নাম রাখা হয়েছে হায়দারজাদে জাদুঘর। প্রায় ৮০০ বর্গমিটার আয়তনের এই বাড়িটি কাজার যুগের (১৮শ শতক) স্থাপত্য নিদর্শন।
অধ্যাপক হায়দারজাদে কে ছিলেন?
হোসেইন হায়দারজাদে ১৯৩৪ সালে ইয়াজদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়াজদ প্রদেশের কুস্তি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রেও কাজ করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্বর্ণকারের কাজও করতেন এবং তাঁর জীবন প্রাচীন ইরানি সভ্যতার নিদর্শন সংগ্রহে উৎসর্গ করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে "ইরানের জাদুঘরের জনক" হিসেবেও অভিহিত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে হৃদরোগজনিত কারণে হোসেইন হায়দারজাদে মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়াজদের মুদ্রা জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য
মুদ্রা ও নৃতত্ত্ব জাদুঘরটি আরবজাদে বাড়িতে অবস্থিত। প্রায় ৮০০ বর্গমিটার আয়তনের এই বাড়িটি কাজার যুগের (১৯শ শতক) স্থাপত্য নিদর্শন। জাদুঘরের নিদর্শনগুলো ১০টি হল ও একটি বড় প্রদর্শনী কক্ষে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এই জাদুঘরের বিশেষ আকর্ষণ হলো প্রায় ৫ হাজার প্রাচীন মুদ্রার সংগ্রহ। এসব মুদ্রা সোনা, রূপা, তামা ও পিতলের তৈরি এবং এগুলো ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ের অন্তর্ভুক্ত। জাদুঘরে থাকা মুদ্রার পাশাপাশি নৃতাত্ত্বিক বিভিন্ন সামগ্রীও প্রদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রান্নার পাত্র, অলংকার, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান পালনের সামগ্রী। এখানে ৪২টি ঐতিহাসিক যুগের (আকেমেনীয় যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত) প্রায় ১ হাজার নিদর্শন দেখা যায়। এছাড়াও জাদুঘরে রয়েছে রূপা, আগাত (আকিক), অ্যাম্বার ও পিতলের তৈরি অলংকার, বিভিন্ন নথিপত্র এবং হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি।
প্রদর্শিত অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে:
- রান্নার সরঞ্জাম (পাথরের ও তামার হাঁড়ি, মাটির বড় পাত্র)
- আগাত ও পিতলের আংটি
- চেইন
- আলোর সরঞ্জাম (তেলের প্রদীপ, মোমবাতির লণ্ঠন, কেরোসিন বাতি ও রেলগাড়ির সংকেত বাতি)
- কয়েক ডজন তালা
- যুদ্ধের সরঞ্জাম
- অন্যান্য ঐতিহাসিক ব্যবহার্য সামগ্রী
ইয়াজদের আরবজাদে বাড়ি
যে বাড়িটি বর্তমানে ইয়াজদের মুদ্রা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি ২০০৩ সালে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৪ সাল থেকে এটি ইয়াজদ মুদ্রা জাদুঘর বা হায়দারজাদে মুদ্রা জাদুঘর নামে পরিচিত। এই স্থাপনাটির নির্মাণকাল কাজার যুগের (১৯শ শতক)।

আরবজাদে বাড়ি, ইয়াজদের মুদ্রা জাদুঘরের আবাসস্থল।
এই বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারটি স্থাপনাটির দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত এবং এটি একটি হাশতির (অষ্টভুজাকার প্রবেশকক্ষ) দিকে খুলে যায়। হাশতির বাম পাশে ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়ির নিচে একটি আস্তাবল এবং হাশতির ডান পাশে একটি করিডোর নির্মিত হয়েছে, যা বাড়ির আঙিনার দিকে নিয়ে যায়। এই অংশের বাড়ির প্রধান অলংকরণ হলো প্লাস্টারের কারুকাজ (গচকারি)। একটি আলোকছিদ্রের মাধ্যমে বাড়ির প্রবেশপথে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আরবজাদে বাড়ির আঙিনাটি উত্তর-দক্ষিণমুখী আয়তাকার এবং এর মাঝখানে একটি বড় জলাধার রয়েছে। আঙিনার চারপাশে অবস্থিত প্রতিটি কক্ষের প্রবেশদ্বার সুন্দরভাবে অলংকৃত। এই ধরনের নকশা ভবনটিতে অনন্য ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে।
বাড়ির গ্রীষ্মকালীন হলটি উত্তর অংশে অবস্থিত। এতে কয়েকটি পাঁচ দরজার (পাঞ্জদারি) ও তিন দরজার (সেদারি) কক্ষ রয়েছে। পাঁচ দরজার কক্ষটির কাঠের দরজায় রঙিন কাচ ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ভবনে "বালাখানা" নামে একটি কক্ষ রয়েছে, যা অতিথিদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হতো। বাড়ির এক কোণে একটি বড় রান্নাঘর রয়েছে এবং পাঁচ দরজার কক্ষগুলোর নিচে একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষ বা তলঘর নির্মিত হয়েছে।
| ইয়াজদের মুদ্রা জাদুঘর প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানি মুদ্রার গল্পের বর্ণনাকারী। | |
| ইয়াজদ | |
| ইয়াজদ | |

