বোনাবের সাফাভি জাদুঘর: একটি ঐতিহাসিক বাড়িতে সংরক্ষিত প্রাচীন নিদর্শনের সমাহার
পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের শহরগুলোর মধ্যে বোনাব তার ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পর্যটন আকর্ষণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। শহরটি উরুমিয়া হ্রদের পূর্বদিকে, সাহান্দ পর্বতমালার পাদদেশে এবং তাবরিজ শহরের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান এবং উর্বর ভূমির কারণে ইতিহাসজুড়ে বোনাবে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং শহরটি সমৃদ্ধি লাভ করে। কারেহ-ঘোশুন কবরস্থানের দক্ষিণাঞ্চলের উঁচু স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া প্রত্ননিদর্শন থেকে জানা যায় যে, সাফাভি যুগে (ষোড়শ খ্রিস্টাব্দ) এই শহর ছিল সমৃদ্ধ ও জনবহুল। তবে বোনাবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবনযাপনেরও বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।
বোনাবের সাফাভি জাদুঘর এই শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এখানে বোনাবের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত মূল্যবান প্রত্নবস্তু ও ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রদর্শিত হয়।
বোনাবের সাফাভি জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?
এই জাদুঘরটি বোনাব শহরের কেন্দ্রস্থলের অন্যতম এলাকায়, বেহেশতি সড়কের গেজাভাশ্ত পুরোনো মহল্লায় অবস্থিত। বোনাবের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি সাইফুল উলামা ভবনে সাফাভি জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এটি পরিদর্শনের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই ভবনটি কাজার যুগে (উনবিংশ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত হয় এবং এর বয়স প্রায় দেড়শ বছর। বাড়িটি শেখ আলী কাজি নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল। তিনি বোনাবের অন্যতম খ্যাতিমান আলেম ছিলেন। কাজার সম্রাট নাসিরুদ্দিন শাহ (শাসনকাল ১৮৩১–১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ) তাঁকে “সাইফুল উলামা” উপাধিতে ভূষিত করেন। শেখ আলী কাজি তাঁর সময়ে শেখ উবাইদুল্লাহ শামজিনি-এর নেতৃত্বে সংঘটিত এক বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন।
বোনাবের সাফাভি জাদুঘরের মোট আয়তন প্রায় ৪৯০ বর্গমিটার। সাইফুল উলামা ভবনটি দুই তলাবিশিষ্ট। এই ঐতিহাসিক স্থাপনা নির্মাণে প্রধানত কাঁচা ইট (খেশ্ত) ও পোড়া ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনের সামনের বারান্দার ছাদ চারটি উঁচু কাঠের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা ভবনটির সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে।
বোনাব শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে ইসমাঈল বেগ মসজিদ-এর সঙ্গে এই ঐতিহাসিক বাড়িটির অনেক মিল রয়েছে। মসজিদটি সাফাভি যুগে নির্মিত হয়েছিল।
স্থাপত্যের দিক থেকে বাড়িটিতে সমৃদ্ধ অলংকরণ দেখা যায়। এর বাইরের অংশে জ্যামিতিক নকশার ইটের কারুকাজ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভবনের সম্মুখভাগ ও নকশা সম্পূর্ণ সমমিতিক (প্রতিসম) পরিকল্পনায় নির্মিত। প্রাচীন ইরানি বাড়িগুলোর মতো এখানেও একটি প্রশস্ত আঙিনা রয়েছে, যার মাঝখানে একটি পুকুর এবং চারপাশে ছোট ছোট বাগান রয়েছে।
সাইফুল উলামা ভবনটি ২০০১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৮০ সৌর হিজরি) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ২০১১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯০ সৌর হিজরি) এটিকে “সাফাভি জাদুঘর” হিসেবে রূপান্তর করা হয়।
বোনাবের সাফাভি জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য ও সংরক্ষিত নিদর্শন
সাফাভি জাদুঘরের ভূতল তলায় বোনাবের আশপাশের এলাকায় পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে উদ্ধার হওয়া নিদর্শনগুলো প্রদর্শিত হয়েছে। এসব নিদর্শন তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ, ইসলাম-পূর্ব যুগ এবং ইসলামি যুগ।
প্রাগৈতিহাসিক অংশে মাটির তৈরি কলস ও অবসিডিয়ান (আগ্নেয় কাচ) পাথর প্রদর্শিত হয়েছে। ইসলাম-পূর্ব অংশে ধূসর মৃৎপাত্র দিয়ে তৈরি প্রদীপ, কলস, পানপাত্র ও জগ রাখা হয়েছে। আর ইসলামি যুগের অংশে কুফি লিপির প্লাস্টার অলংকরণ, নকশাখচিত শিলালিপি, বাটি এবং বিভিন্ন মাটির পাত্র প্রদর্শিত হয়েছে।
জাদুঘরের প্রথম তলায় সাফাভি যুগের নিদর্শন আটটি বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে—
১. হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, ক্যালিগ্রাফি ও লিপিশিল্প
২. কাঠের অলংকরণ ও স্থাপত্য উপাদান
৩. শাহনামা-ই তাহমাসবি-এর চিত্রসমূহ
৪. সাফাভি দরবারের বিখ্যাত লিপিশিল্পীদের ক্যালিগ্রাফির নমুনা, যেমন আলীরেজা আব্বাসি, মির ইমাদ এবং মোহাম্মদ রেজা তাবরিজি
৫. মুদ্রা
৬. মৃৎপাত্র ও টাইলস
৭. ধাতব নিদর্শন
৮. ঐতিহাসিক সমাধিফলক ও শিলালিপি, পাথরের সিংহ ও ভেড়ার ভাস্কর্য এবং স্তম্ভের ভিত্তি।
জাদুঘরের একটি অংশ শাহনামা-ই তাহমাসবি-এর বিভিন্ন পৃষ্ঠার চিত্র প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত। এটি ফেরদৌসীর শাহনামা-র একটি অমূল্য পাণ্ডুলিপি, যা ষোড়শ খ্রিস্টাব্দে লিপিশিল্পের মাধ্যমে রচিত হয়েছিল। এতে ২৫৮টি অলংকৃত চিত্র রয়েছে, যেখানে শাহনামা-র কিংবদন্তি, পৌরাণিক কাহিনি ও বীরগাথাগুলো চিত্ররূপে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অসাধারণ শিল্পমূল্যের কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান দশটি শিল্পগ্রন্থের অন্যতম। এই অমূল্য গ্রন্থের বিভিন্ন পৃষ্ঠা বর্তমানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও কাতারের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে জাদুঘরের আকর্ষণ এখানেই শেষ নয়। জাদুঘরের আঙিনায় সাফাভি যুগের সৈনিকদের ভাস্কর্যের পাশাপাশি সাফাভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শাহ ইসমাইল সাফাভি (শাসনকাল ১৫০১–১৫২৪ খ্রিস্টাব্দ)-এর ঘোড়ার পিঠে আরোহী ও হাতে তলোয়ারধারী একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।
| বোনাবের সাফাভি জাদুঘর: একটি ঐতিহাসিক বাড়িতে সংরক্ষিত প্রাচীন নিদর্শনের সমাহার | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| বনাব | |









