মিনাকারি, যা ‘মিনাগরি’ বা ‘মিনাসাজি’ নামেও পরিচিত, ধাতু ও মাটির তৈরি পাত্রের ওপর নকশা ও চিত্র আঁকার একটি শিল্প। তামা, সোনা ও রুপা এগুলোই একমাত্র ধাতু, যা মিনার সঙ্গে মিশ্রিত হলে জারিত হয় না। তাই এই শিল্পে এগুলো কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফারসি ভাষায় ‘মিনা’ বলতে নীল আকাশকে বোঝায়। এই শিল্পের নাম ‘মিনাকারি’ হওয়ার কারণ হলো, মিনাকারির কাজে নীল রঙের প্রাধান্য থাকে। এই রং এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করে, যেন দর্শক মিনাকারি করা কোনো শিল্পকর্মের গায়ে অসীম আকাশের এক টুকরো দেখতে পাচ্ছেন।
থালা, ফুলদানি, বাটি, ছবির ফ্রেম, দরজা-জানালা, মাজারের জালিযুক্ত ঘের, অলংকারের বাক্স, আয়না, কোমরবন্ধ এবং বিভিন্ন ধরনের অলংকার এমন অনেক জিনিসের ওপর মিনাকারির কাজ করা হয়।
মিনাকারি শিল্পের ইতিহাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিনাকারি শিল্পের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, ইরানই এই শিল্পের জন্মভূমি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে সাইপ্রাসে ছয়টি সোনার আংটির মতো নিদর্শন পাওয়া গেছে, যেগুলো খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীর বলে ধারণা করা হয়। এগুলোকে রত্নখচিত মিনাকারির নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দাবি সত্য হলে, ধারণা করা যায় যে মিনাকারি শিল্প ধীরে ধীরে ইরান থেকে ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ইরানে এখন পর্যন্ত পাওয়া মিনাকারি শিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো এক জোড়া কানের দুল, যেগুলোর বয়স খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হয়। এই কানের দুল ধাতুর ওপর কাচের প্রলেপ দেওয়ার শিল্পকৌশলের একটি উদাহরণ। হাখামানেশি বা আকেমেনীয় সাম্রাজ্যের (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০–৩৩০) সময়কার বেশ কয়েকটি নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সেই যুগে এই শিল্পের গুরুত্ব প্রমাণ করে। লস অ্যাঞ্জেলেসের মিউজিয়াম অব আর্টে সংরক্ষিত একটি ব্রোঞ্জের বাটি এবং লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি সোনার বাহুবন্ধ এই নিদর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। হাখামানেশি সাম্রাজ্যের পতনের পরও মিনাকারি শিল্পের চর্চা অব্যাহত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে ইরানের মিনাকারি শিল্পের বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলো বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
একাদশ শতাব্দীতে সেলজুক শাসনামল ইরানের মিনাকারি শিল্পের বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় মিনাকারি করা পাত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিল এবং সেগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ ও অঞ্চলেও রপ্তানি করা হতো। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে তিমুরীয় শাসনামলে মিনাকারি শিল্পে ধাতুশিল্পের বিভিন্ন কৌশল যুক্ত হয়, যা এই শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।
ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাফাভি শাসনামলে মিনাকারি শিল্প সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। এ সময় ইসফাহান ছিল মিনাকারি শিল্পীদের প্রধান কেন্দ্র। এই যুগের পর মিনাকারি শিল্পের অবনতি ঘটলেও বর্তমানে কর্মশালাভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রসারের ফলে শিল্পটি আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে মিনাকারি ইরানের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী, স্বতন্ত্র ও জনপ্রিয় শিল্প হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
মিনাকারি শিল্পের কাজ করার পদ্ধতি
মিনা হলো এক ধরনের স্বচ্ছ ও কাচের মতো প্রলেপ, যা কাচের গ্লেজ বা প্রলেপের সঙ্গে ধাতব অক্সাইড মিশিয়ে তৈরি করা হয়। এরপর এটিকে চুল্লিতে উচ্চ তাপে পোড়ানো হলে তা কাচের মতো শক্ত হয়ে যায়। সাধারণত মিনাকারি শিল্প দুটি পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় ‘খানাবন্দি’ বা ঘরবদ্ধ পদ্ধতি এবং ‘নকশা অঙ্কন’ বা চিত্রাঙ্কন পদ্ধতি।
১. খানাবন্দি পদ্ধতি (তারযুক্ত মিনাকারি)
এই পদ্ধতিতে সরু ধাতব তার ব্যবহার করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। তারগুলো শিল্পবস্তুর পৃষ্ঠের ওপর বসিয়ে আটকে দেওয়া হয় এবং তার ওপর কাচের প্রলেপ দেওয়া হয়। এরপর পাত্রটিকে চুল্লিতে রাখা হয়, যাতে ধাতব তারগুলো তাপের মাধ্যমে পৃষ্ঠের সঙ্গে ভালোভাবে জোড়া লেগে যায়। তারপর মিনাকারির গুঁড়ো রং দিয়ে নকশার ফাঁকা অংশগুলো পূরণ করা হয়। একবার তাপ দেওয়ার পর এবং প্রয়োজনে অ্যাসিড দিয়ে প্রক্রিয়াকরণ করার মাধ্যমে মিনাকারির কাজটি কাঙ্ক্ষিত রূপ লাভ করে। বর্তমানে মিনাকারি তৈরির এই পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহৃত হয়।
২. চিত্রাঙ্কন পদ্ধতি
বর্তমানে মিনাকারি তৈরির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটিই বেশি প্রচলিত। এ পদ্ধতিতে নকশাগুলো আগে থেকেই দক্ষ কারিগর বা ওস্তাদ শিল্পীরা তৈরি করে রাখেন। মিনাকারি শিল্পীর কাজ হলো প্রলেপ ও তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সেই নকশাগুলোতে রং করা। সাধারণত এই পদ্ধতিতে প্রলেপ দেওয়া এবং তাপ দেওয়ার কাজ তিন থেকে চারটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়।
মিনাকারি শিল্পের প্রকারভেদ
মিনাকারি শিল্পে ব্যবহৃত পদ্ধতি, কাজের পৃষ্ঠের ধরন এবং তৈরি পণ্যের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এই শিল্পকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়।
১. মিনায়ে মোরাস্সা (রত্নখচিত মিনাকারি)
এই ধরনের মিনাকারি শিল্পে শিল্পকর্মের ওপর মূল্যবান রত্নপাথর বসানো হয়। এ কারণে রত্নখচিত মিনাকারির মাধ্যমে তৈরি পণ্যগুলো অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে থাকে।
২. মিনায়ে মাশবাক (জালিকাযুক্ত মিনাকারি)
এই পদ্ধতিতে শিল্পবস্তুর পৃষ্ঠকে জালির মতো নকশায় তৈরি করা হয়। এই ধরনের মিনাকারির মাধ্যমে তৈরি উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মোমবাতিদানি, ফুলদানি এবং এ ধরনের অন্যান্য পাত্র।
৩. মিনায়ে সাবি
এই ধরনের মিনাকারি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সাবিয়ান বা মান্দায়ি সম্প্রদায়ের মানুষ তৈরি করেন। এই সম্প্রদায়ের নাম অনুসারেই শিল্পটির নামকরণ করা হয়েছে।
অতীতে বিভিন্ন ধরনের পাত্রের ওপর সাবি মিনাকারির কাজ করা হতো। তবে বর্তমানে এটি মূলত অলংকার তৈরির কাজে সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রচলিত মিনাকারিতে সাধারণত তামার পৃষ্ঠ ব্যবহার করা হলেও সাবি মিনাকারি করা হয় রুপা ও ২৪ ক্যারেট সোনার ওপর।
সাবি মিনাকারি প্রধানত ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে তৈরি হয়। তাই এই শিল্পে ব্যবহৃত নকশাগুলোও ওই অঞ্চলের প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতিনীতি থেকে অনুপ্রাণিত। খেজুরগাছ, ছোট নৌকা, আহভাজের সেতু এবং উট এই শিল্পের বহুল ব্যবহৃত নকশাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
ঐতিহ্যগতভাবে সাবি মিনাকারিতে কালো রং ব্যবহার করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই শিল্পে অন্যান্য রঙের ব্যবহারও শুরু হয়েছে।
মিনাকারি শিল্পের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বর্তমানে ইরানের মিনাকারি শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ইসফাহান শহর পরিচিত। ২০২৩ সালে শহরটি এই শিল্পের জন্য ইউনেস্কোর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এ ছাড়া, ২০১৯ সালে আহভাজ শহরকে সাবি মিনাকারির জাতীয় শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।