পশুপালনের মাধ্যমে মানুষ খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পশম, চামড়া এবং আরও কিছু কাঁচামাল পেতে শুরু করে, যা তারা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করত। এসব কাঁচামালকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্পের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেগুলোর বিকাশ ঘটে। এসব শিল্পের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পণ্য তৈরির জন্য প্রাথমিক পর্যায়ের যন্ত্রপাতি ও মানুষের হাতের শ্রম ব্যবহার করা হতো।
মোতাবি এমনই একটি শিল্প, যেখানে সাধারণ ও সরল যন্ত্রপাতি এবং হাতের শ্রমের সাহায্যে ছাগল ও উটের লোম সুতা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।
মোতাবি কী?
মোতাবি হলো এক ধরনের সুতা কাটার প্রক্রিয়া, যেখানে হাতচালিত চরকার সাহায্যে ছাগলের লোম থেকে সুতা, জাল ও দড়ি তৈরি করা হয়। মোতাবি শিল্পের মাধ্যমে তৈরি পণ্যগুলো অত্যন্ত মজবুত ও টেকসই। এসব পণ্য যাযাবর ও পশুপালক জনগোষ্ঠীর তাঁবু স্থাপন, গৃহপালিত পশুকে বেঁধে রাখা, কৃষিকাজের সরঞ্জাম শক্ত করে বাঁধা, উটের পিঠে মালপত্র বাঁধা এবং ‘শাল-এ চাহারতাখতে’ নামে পরিচিত এক ধরনের বস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।
যাযাবর জনগোষ্ঠীর তাঁবু তৈরিতে ছাগলের লোম ব্যবহারের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। গরম আবহাওয়ায় ছাগলের লোমের বুনন কিছুটা প্রসারিত হয়, ফলে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং তাঁবুর ভেতরের পরিবেশ ঠান্ডা থাকে। এ ছাড়া, বৃষ্টির পর ছাগলের লোমের তন্তুগুলো পরস্পরের সঙ্গে আরও আঁটসাঁটভাবে লেগে যায়, যা তাঁবুর ভেতরে পানি প্রবেশে বাধা দেয়।
ছাগলের লোম দিয়ে যাযাবরদের তাঁবু বোনার ঐতিহ্য আজও চালু রয়েছে। তবে মোতাবি শিল্পের প্রচলন কমে যাওয়ায় যাযাবর নারীরা এই কাজের জন্য ‘আশতি-রিসি’ নামে পরিচিত অন্য একটি বয়নকৌশলের দিকে ঝুঁকেছেন। তা সত্ত্বেও, অত্যন্ত মজবুত ও কার্যকর পণ্য তৈরির কৌশল হিসেবে মোতাবি শিল্প এখনো গুরুত্ব বহন করে।
মোতাবি শিল্পের কাজের পদ্ধতি
মোতাবি শিল্পীরা তাঁদের কাজে এমন একটি যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা হাতে চালিত সাধারণ সুতা কাটার চরকার তুলনায় বেশি জটিল। এ ছাড়া, মোতাবি শিল্পে ছাগলের লোম ব্যবহার করা হয়, যেখানে হাতে চালিত সাধারণ চরকায় তুলা থেকে সুতা তৈরি করা হয়।
কাঁচামাল প্রস্তুত করার জন্য প্রথমে ছাগলের কালো ও অন্যান্য রঙের লোম আলাদা করা হয়। এই লোম জীবিত ছাগলের শরীর থেকে অথবা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার পর তা থেকে সংগ্রহ করা হতে পারে। তবে মোতাবি শিল্পীরা জীবিত ছাগলের শরীর থেকে সংগ্রহ করা লোমকে উন্নত মানের বলে মনে করেন।
প্রথম ধাপে লোমগুলোকে ‘তাখত-এ জিগা’ নামক একটি কাঠের পাটাতনের ওপর রেখে ভালোভাবে পেটানো হয়। এর ফলে লোমের সঙ্গে লেগে থাকা ময়লা ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় অংশ দূর হয় এবং জট পাকানো লোমগুলো আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তী ধাপে একটি বিশেষ ধনুকসদৃশ যন্ত্রের সাহায্যে লোমগুলোকে ধুনে নেওয়া হয়। এরপর সেগুলোকে পাকিয়ে ফিতার মতো গঠন তৈরি করা হয় এবং সুতা হিসেবে কাটা হয়।
মোতাবি শিল্পে উটের লোমও ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে উটের কুঁজের অংশের লম্বা লোম এই কাজে ব্যবহারের উপযোগী।
মোতাবি শিল্পের পণ্যগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর অসাধারণ মজবুতি। এমনকি বৈদ্যুতিক যন্ত্রে তৈরি বস্ত্রজাত পণ্যের মধ্যেও এই ধরনের দৃঢ়তা দেখা যায় না। এ কারণেই হাতে তৈরি মোতাবি পণ্যগুলো বিশেষ ও স্বতন্ত্র মূল্য বহন করে।
মোতাবি শিল্প কোথায় প্রচলিত?
আধুনিক সুতা কাটার যন্ত্রের প্রচলন শুরু হওয়ার আগে গ্রামাঞ্চলের মানুষ অবসর সময়ে কিংবা একে অপরের সঙ্গে গল্পগুজব ও সামাজিক মেলামেশার সময় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল ব্যবহার করে হাতে চালিত চরকার সাহায্যে সুতা কাটা ও মোতাবি শিল্পের কাজ করতেন। এ ছাড়া, বিভিন্ন অঞ্চলে এমন কিছু কর্মশালাও ছিল, যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সুতা কাটা ও মোতাবির কাজ করা হতো।
বর্তমানে এই পেশার প্রচলন অনেক কমে গেছে। ইরানের হামেদান, ইয়াজদ ও লোরেস্তান প্রদেশের কয়েকটি অঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও এই শিল্পের তেমন প্রচলন দেখা যায় না।
এ ক্ষেত্রে ইয়াজদ প্রদেশের মেইবোদ শহরের বাফরুইয়ে গ্রামে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী মোতাবি শিল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অতীতে মেইবোদ শহরের প্রতিটি গ্রামের মানুষ নির্দিষ্ট কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় বাফরুইয়ে গ্রামে মোতাবি শিল্পের ব্যাপক প্রচলন ছিল।
মোতাবি শিল্পের জাতীয় স্বীকৃতি
এ পর্যন্ত ইরানের কয়েকটি শহর ও অঞ্চলের নামে বিভিন্ন সময়ে মোতাবি শিল্প জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে।
-
- লোরেস্তান প্রদেশ: ২০২২ সালে ‘মোতাবি শিল্পকৌশল ও দক্ষতা’ লোরেস্তান প্রদেশের নামে জাতীয়ভাবে নিবন্ধিত হয়।
- হামেদান: ২০১২ সালে হামেদানের মোতাবি শিল্প ইরানের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
- বাফরুইয়ে গ্রাম: ২০১৪ সালে এই গ্রামের মোতাবি শিল্প ইরানের জাতীয় অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।