টাইলস ইরানি স্থাপত্যে বিভিন্ন ধরনের নকশা বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের কারণে টাইলস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামী স্থাপত্যে নিজের গুরুত্ব বজায় রেখেছে। বর্তমানে আধুনিক ভবন নির্মাণেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে জানা যায় যে, ইরানে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ সাল নাগাদ চকচকে প্রলেপযুক্ত ইট, অলংকারমূলক টাইলস এবং এনামেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। সে সময় চুল্লিতে মাটি পুড়িয়ে শক্ত করার এবং তার ওপর চকচকে প্রলেপ দেওয়ার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল। পরে এই প্রযুক্তি ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানে ইসলাম প্রবেশের পর মসজিদ, পবিত্র স্থান এবং বাড়িঘরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অংশ সাজানোর জন্য টাইলসের কাজ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। ধীরে ধীরে এটি ইরানি স্থাপত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
এই সময়কালে টাইলসের ওপর চিত্রাঙ্কন ও নকশা তৈরির কাজও ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। ফলে বর্তমানে এই ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কৌশল ও শিল্পকলার সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ ধারা গড়ে উঠেছে এবং বহু শিল্পী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বর্তমানে ব্যাপক পরিমাণে টাইলস উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। তা সত্ত্বেও, শিল্পীর প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এমন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে টাইলস তৈরির প্রক্রিয়া আজও টিকে রয়েছে।
টাইলসের উৎপাদন ও নকশা
এই শিল্পশাখায় বিভিন্ন রঙের টাইলস বা পাত্র তৈরি ও প্রস্তুত করার কাজ করা হয়। ইরানের অধিকাংশ স্থাপত্যে পাশাপাশি সাজানো একাধিক টাইলসের সমন্বয়ে একটি নকশা বা চিত্র ফুটে ওঠে। তাই প্রতিটি টাইলসের ওপর সেই নকশা যথাযথভাবে অঙ্কন করা এবং কাজের পৃষ্ঠে সেগুলো সঠিকভাবে সাজানো বিশেষ শিল্পকলা ও দক্ষতার দাবি রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দক্ষতাগুলোর বিকাশ ও প্রসার ঘটেছে। তবে টাইলস উৎপাদন ও নকশা তৈরির বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পদ্ধতিতে প্রতিটি টাইলসই একজন শিল্পীর স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম হিসেবে তৈরি হয় এবং তার ওপর সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়।
১. সোনালি আভাযুক্ত টাইলস
সাদা মাটির সঙ্গে চকমকি পাথরের গুঁড়ো এবং টাইলসের প্রলেপে টিন যোগ করলে তাতে সোনালি বা সবুজ রঙের সৃষ্টি হয়। এই পণ্যকে ‘জারিনফাম টাইলস’ বলা হয়। এই ধরনের টাইলস প্রধানত ইসফাহান, খোরাসান ও মার্কাজি প্রদেশে তৈরি হয়। এর সোনালি রং ও উজ্জ্বলতার কারণে দর্শকের চোখে এটি সোনার পাতের মতো দেখায়।
২. মিনাই টাইলস
মিনাই টাইলস হলো একক টাইলস, যার ওপর জ্যামিতিক নকশা, ফুল-লতা-পাতা, ইসলামি অলংকরণধর্মী নকশা এবং খাতায়ি নকশা আঁকা হয়। এর প্রলেপ পাতলা হওয়ার কারণে এই ধরনের টাইলস ‘মিনাই’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
মিনাই টাইলস তৈরি করা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত কাজ। এই টাইলসের নকশা ও উৎপাদনের জন্য একজন শিল্পীকে বিভিন্ন নকশা এবং ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জন করতে হয়।
৩. সাত রঙের টাইলস
সাত রঙের টাইলস সাধারণত বৈচিত্র্যময় ও বহুরঙা নকশার হয়ে থাকে। এই নকশাগুলো টাইলসে ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রথমে কাগজের ওপর সেগুলো আঁকা হয়। এরপর নকশাযুক্ত কাগজটি টাইলসের কাঁচা মাটির ফলকের ওপর রাখা হয় এবং একটি সুঁই দিয়ে নকশাগুলো কাঁচা টাইলসের গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়।
পরবর্তী ধাপে টাইলসের ওপর কয়লার গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যাতে নকশাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবে শিল্পী তৈরি করা নকশাগুলো সহজে শনাক্ত করতে পারেন এবং সেগুলোতে রং করতে পারেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে টাইলসটি চুল্লিতে পোড়ানো হয়। পোড়ানোর পর এটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়।
৪. জালিকাযুক্ত টাইলস
টাইলস তৈরি ও নকশা করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আরেকটি হস্তশিল্প হলো জালিকাযুক্ত টাইলস। এতে সাত রঙের চকচকে প্রলেপযুক্ত টাইলস ব্যবহার করা হয়।
এই পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের ছেনি বা কাটার সাহায্যে টাইলসকে জালির মতো ছিদ্রযুক্ত করা হয়, যাতে এর মধ্য দিয়ে আলো প্রবেশ করতে পারে। স্থাপত্যের অলংকরণে এই ধরনের টাইলসের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
৫. মুআল্লাক্বি টাইলস
কখনো কখনো টাইলসের সঙ্গে অন্যান্য অলংকারমূলক উপাদান, বিশেষ করে ইটের সম্মুখভাগের অংশ যুক্ত করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। টাইলস ও ইটের সম্মুখভাগের এই সমন্বয়ে ‘মুআল্লাক্বি টাইলস’ অথবা ‘বিনায়ি টাইলস’ তৈরি হয়। এই ধরনের টাইলস প্রধানত ভবনের বাইরের সম্মুখভাগ সাজানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
৬. মোজাইক টাইলস
মোজাইক টাইলস তৈরির পদ্ধতি সাত রঙের টাইলস তৈরির পদ্ধতির অনুরূপ। এই পদ্ধতিতে প্রথমে কাগজের ওপর আঁকা নকশাটি প্রলেপযুক্ত টাইলসের মাটির ফলকের ওপর লাগানো হয়। এরপর বিভিন্ন আকারের ছেনি ব্যবহার করে টাইলসটিকে কেটে বিভিন্ন টুকরায় ভাগ করা হয়।
সবশেষে কাটা টুকরাগুলো ঘষে ও মসৃণ করে নেওয়া হয়, যাতে সেগুলো সহজেই একটির সঙ্গে অন্যটি নিখুঁতভাবে জুড়ে যায়।
টাইলসের টুকরাগুলো যাতে পরস্পরের সঙ্গে ভালোভাবে মিলে যায় এবং স্থাপত্যের গায়ে স্থাপন করা সম্ভব হয়, সে জন্য জোড়া লাগানো টাইলসগুলো মাটির ওপর এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে প্রলেপযুক্ত অংশটি নিচের দিকে থাকে। এরপর সেগুলোর ওপর জিপসাম বা প্লাস্টার অব প্যারিসের তরল মিশ্রণ ঢেলে দেওয়া হয় এবং মিশ্রণটি শক্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়।