দারায়ি বয়নশিল্প বা ইকাত
‘দারায়ি বয়নশিল্প’ বা ‘ইকাত’ হলো ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের সবচেয়ে সুন্দর ধরনগুলোর মধ্যে এক ধরনের কাপড় বোনার কৌশল। উষ্ণ ও আকর্ষণীয় রঙের সুন্দর সমন্বয়ের মাধ্যমে এই শিল্পে মূল্যবান ও মনোমুগ্ধকর কাপড় তৈরি করা হয়। দারায়ি বয়নশিল্পে সুতা রং করার সময় গিঁট তৈরি করে বোনার আগেই নকশাগুলো অনেকাংশে ফুটিয়ে তোলা হয়।
দারায়ি বয়নশিল্পের বৈশিষ্ট্য
দারায়ি বয়নশিল্প হলো এক ধরনের কাপড় বোনার কৌশল, যেখানে তুলার সুতা দিয়ে তৈরি তানা ও পোড়েন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে কাপড় তৈরি করা হয়। কখনো কখনো কাপড়ের মূল্য ও দাম বাড়ানোর জন্য রেশমি সুতা দিয়েও দারায়ি কাপড় বোনা হয়।
দারায়ি বয়নশিল্পকে ‘ইকাত’ও বলা হয়। এই শব্দের অর্থ হলো আগে থেকে প্রস্তুত করা নকশা অনুসারে তানা ও পোড়েনের সুতা বেঁধে রাখা। বোনার আগে সুতা রং করার মধ্যেই এই শিল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। গিঁট বাঁধার পদ্ধতির মাধ্যমে এই কৌশলটি সম্পন্ন করা হয়। এই বিশেষ রং করার পদ্ধতির কারণেই বোনা কাপড়ে বিভিন্ন রঙের নানা ধরনের শেড তৈরি হয়।
এই শিল্পকে ‘দারায়ি বয়নশিল্প’ এবং এর তৈরি কাপড়কে ‘দারায়ি’ বলা হয়। ‘দারায়ি’ শব্দের অর্থ সম্পদ বা সঞ্চিত ধন। এই নামকরণের কারণ হলো কাপড়টির উচ্চমূল্য ও বিশেষ মর্যাদা। অতীতে নববধূদের যৌতুকের সামগ্রীর মধ্যে এই ধরনের কাপড়কে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে রাখা হতো। দারায়ি কাপড়ের দাম বেশি হওয়ায় অধিকাংশ মানুষেরই এটি কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তাই সাধারণত ধনী ব্যক্তিরাই এই ধরনের কাপড়ের ক্রেতা ছিলেন। অতীতে দারায়ি কাপড় বিছানার চাদর বা টেবিলের আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সাধারণভাবে এটি এমনভাবে ব্যবহার করা হতো, যাতে অন্য কাপড়ের তুলনায় এটি বেশি দৃশ্যমান হয়।
বর্তমানে দারায়ি কাপড় শাল, ব্যাকপ্যাক, চাদর, পুঁটলি, লম্বা কোট এবং বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
দারায়ি বয়নশিল্পের কৌশল ও পদ্ধতি
দারায়ি বয়নশিল্প ‘দারায়ি বয়ন’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ তাঁতের সাহায্যে সম্পন্ন করা হয়। তবে বয়ন শুরু করার আগে রং করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। অতীতে উদ্ভিজ্জ ও প্রাকৃতিক রং দিয়ে সুতা রং করা হতো। কিন্তু বর্তমানে রাসায়নিক রং সেগুলোর জায়গা দখল করেছে এবং কাজকে আরও সহজ করে তুলেছে।
রং করার প্রক্রিয়ায় তুলা বা রেশমি সুতা ৩০ থেকে ৪০টি করে গোছায় সাজানো হয়। এরপর সেগুলো ছিদ্রযুক্ত দুটি কাঠের টুকরোর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানো হয়, যাতে সুতার গোছার শুরু ও শেষের অংশ কাঠের মধ্যে আটকে থাকে। একই রঙে রঞ্জিত হবে এমন সুতার গোছাগুলো কয়েকটি সুতা দিয়ে গিঁট বেঁধে রাখা হয়। এরপর সেগুলো রং করা হয়।
মাঝখানের গিঁটগুলো খুব নিখুঁতভাবে কাজ করে না। এ কারণে রং করার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রঙের নানা শেড তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে কাপড়ের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। এ ছাড়া রং সম্পূর্ণ শুকানোর আগেই গিঁট খুলে ফেললে বিভিন্ন রঙের সুতাগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় এবং আরও বেশি রঙের শেড তৈরি হয়।
রং করার পর কাপড় বোনার পালা আসে। এ কাজের জন্য প্রথমে তানা প্রস্তুত করতে হয়। দারায়ি কাপড়ের স্থিতিস্থাপকতা রয়েছে। এ কারণে এর ওপর ফুটিয়ে তোলা নকশাগুলোর সীমানা খুব স্পষ্ট হয় না। দারায়ি কাপড়ে সাধারণত সহজ, জ্যামিতিক এবং তুলনামূলকভাবে বড় আকারের নকশা ব্যবহার করা হয়। বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর রঙের সমন্বয়ের পাশাপাশি এসব নকশাও দারায়ি কাপড়ের অসাধারণ সৌন্দর্যের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বয়নপদ্ধতির দিক থেকে দারায়ি কাপড় তিনটি পদ্ধতিতে বোনা হয়। এগুলো হলো—‘তানা’, ‘পোড়েন’ এবং ‘দ্বৈত তানা ও পোড়েন’ পদ্ধতি। এই তিনটির মধ্যে দ্বৈত তানা ও পোড়েন পদ্ধতিতে দারায়ি বোনা সবচেয়ে কঠিন। তবে এ পদ্ধতিতে তৈরি কাপড় অধিকতর মূল্যবান ও সুন্দর হয়।
এই বিশেষ পদ্ধতিতে তানার সুতা রং করে তাঁতে বসানো হয় এবং পোড়েনের সুতা ছোট নলাকার রিলে পেঁচিয়ে রাখা হয়। এই পদ্ধতি এতটাই জটিল যে, কখনো কখনো কয়েক বর্গমিটার কাপড় বুনতে একজন শিল্পীর কয়েক মাস সময় লেগে যায়।
তিনটি পদ্ধতিতেই সুতা এমনভাবে তাঁতের কাঠামোর ওপর টেনে বসানো হয়, যাতে সেগুলো একত্র করে একটি সুসংগত নকশা তৈরির জন্য গিঁট বাঁধা যায়। দারায়ি কাপড়ের নকশা যত সূক্ষ্ম হয়, সুতা বাঁধা ও গিঁট দেওয়ার ক্ষেত্রে তত বেশি নিখুঁতভাবে কাজ করতে হয়। সাধারণত একজন তাঁতি ১০ থেকে ১৫টি তানার সুতা নিয়ে একটি গোছা তৈরি করেন। তবে নকশার সূক্ষ্মতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিটি গোছায় মাত্র তিনটি তানার সুতাও রাখা হতে পারে।
দারায়ি বয়নশিল্পের জাতীয় নিবন্ধন
২০১০ খ্রিষ্টাব্দে দারায়ি বয়নশিল্প ইরানের জাতীয় অবস্তুগত ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
ইয়াজদ ছাড়াও কাশান শহরে এই শিল্পের প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া গিলান প্রদেশে এবং তুর্কমেনদের মধ্যেও এই শিল্প দেখা যায়।