হস্তশিল্প

পেপিয়ার-মাশে, আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ একটি শিল্প।

পাপিয়ের-মাশে শিল্প ইরানে ‘গোল ও মোর্গ’ (ফুল ও পাখি) চিত্রকলার মতো শিল্পের সঙ্গে মিশে গিয়ে অন্যান্য দেশের তুলনায় একটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছে।

পাপিয়ের-মাশে কী?

কাগজের টুকরো বা কাগজের মণ্ড হলো পাপিয়ের-মাশে শিল্পীদের কাজের প্রধান উপকরণ। কখনও কখনও এই উপকরণগুলো কাপড় ও আঠালো পদার্থের সাহায্যে শক্ত করা হয় এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন আকৃতি ও পাত্র তৈরি করা হয়। পাপিয়ের-মাশের পণ্য তৈরির জন্য কাগজকে প্রথমে মণ্ড করে সিরিশের সঙ্গে মেশানো হয় এবং চাপ প্রয়োগ করা হয়, যাতে পণ্যের প্রাথমিক আকৃতি তৈরি হয়।

বর্তমানে শিল্পীরা খবরের কাগজ বা ব্যবহৃত কাগজের মাধ্যমে তাঁদের কাজের কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। প্রথমে তাঁরা কাগজের ছোট ছোট টুকরোকে পানি ও কাঠের আঠার মিশ্রণে ভিজিয়ে নেন এবং তা তারের বা মোটা কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি একটি ছাঁচের ওপর বসিয়ে দেন। এরপর মণ্ডটি শুকিয়ে কাজের পৃষ্ঠের আকৃতি ভালোভাবে ধরে রাখার জন্য কয়েক দিন সময় প্রয়োজন হয়। কিছু পাপিয়ের-মাশে শিল্পকর্মে রং করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে কাগজের ওপর দুই বা তিন স্তর সাদা রং দিতে হয়। এরপর চূড়ান্ত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল রংগুলো ব্যবহার করা হয়।

পাপিয়ের-মাশের ইতিহাস

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাপিয়ের-মাশে নামটি ফরাসি হলেও এর উৎপত্তি এশিয়ায় এবং এর ইতিহাস বহু প্রাচীন। ধারণা করা হয়, চীনে কাগজ তৈরির সূচনার সময়ই পাপিয়ের-মাশের উদ্ভব হয় এবং ধীরে ধীরে এটি অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, এই শিল্পকৌশল বিস্তারের সূচনা হয়েছিল খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ইরান ও চীনের যুদ্ধের সময়।

খ্রিস্টীয় দশম শতকে পাপিয়ের-মাশে মরক্কোতে এবং সেখান থেকে স্পেন, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, ভেনিসের মানুষজন পূর্বদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে পাপিয়ের-মাশে শিল্পকৌশল শিখেছিল এবং পরে তা ভারত ও ইরানে নিয়ে যায়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে ইউরোপে পাপিয়ের-মাশে কৌশল ব্যবহার করে ছোট ছোট মূর্তি তৈরি করা হতো, যেগুলোর অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় প্রকৃতির।

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই কাগজের মূর্তি তৈরির জন্য পাপিয়ের-মাশে ব্যবহার করা হয়। পাপিয়ের-মাশের তৈরি পণ্যের বৈচিত্র্য এত বেশি যে এটি ঘর সাজানোর সামগ্রী, টেবিলের অলংকার এবং এমনকি আসবাবপত্র তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পাপিয়ের-মাশে প্রযুক্তির ভিত্তিতে জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাংকও তৈরি করা হয়েছিল। এসব ট্যাংক বিমানে স্থাপন করা হতো। এগুলো ওজনে হালকা হওয়ায় বিমানকে আরও দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে এবং বেশি গতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করত।

ইরানে পাপিয়ের-মাশে

খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে ইরানি শিল্পীরাও এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ইসফাহান ও কাজভিন পাপিয়ের-মাশের তৈরি পণ্য উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সাফাভি শাসক শাহ তাহমাস্পের সময় (১৫১৪–১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ) কাজভিন পাপিয়ের-মাশে-ভিত্তিক পণ্য, বিশেষ করে কলমদান তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কাজভিন কাজভিনের এই অবস্থান কাজার শাসনামলের শেষভাগ (বিংশ শতকের শুরু) পর্যন্ত বজায় থাকে। এরপর ধীরে ধীরে এই শহরের শিল্পীদের মধ্যে এই শিল্পের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, ইরানে পাপিয়ের-মাশের আগমন সাফাভি যুগেরও আগে। তাঁদের মতে, প্রথমে হেরাত শহরে পাপিয়ের-মাশে একটি শিল্পকৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং তিমুরীয় ইরানে (১৩৭০–১৫০৬ খ্রিস্টাব্দ) এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, ‘মির সাইয়্যেদ আলি হামাদানি’ নামে একজন ব্যক্তি চতুর্দশ শতকে ইরানে এই শিল্পের আগমনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ইরানি সুফি ও কবি, যিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে বহু ভ্রমণ করেছিলেন। সম্ভবত এসব ভ্রমণের কোনো একটির সময় তিনি পাপিয়ের-মাশে শিল্পকৌশলের সঙ্গে পরিচিত হন এবং ইরানি শিল্পীদের এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হতে উৎসাহিত করেন।

 

তিমুরীয় যুগে ক্যালিগ্রাফি একটি রাজদরবার-সমর্থিত শিল্প হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেত। আর ক্যালিগ্রাফির কলম রাখার জন্য কলমদান তৈরিতে পাপিয়ের-মাশেকে সবচেয়ে উপযোগী কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইরানে প্রচলিত অন্যান্য ব্যবহারের পাশাপাশি পাপিয়ের-মাশে কলমদান, কোরআনের ফ্রেম এবং বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ‘লাকি’ (ল্যাকার) বা ‘ফুল ও পাখির চিত্রকলা’ নামে পরিচিত শিল্পকর্মেও পাপিয়ের-মাশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাযহিব (অলংকরণ), তাশির (অলংকরণমূলক সূক্ষ্ম নকশা), মিনিয়েচার এবং বাঁধাই ও রং মেশানোর মতো বিভিন্ন কৌশলের সঙ্গে ইরানি শিল্পকলার সমন্বয় পাপিয়ের-মাশের শিল্পকর্মকে ইতিহাসজুড়ে ব্যাপক বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে।

পাপিয়ের-মাশের জাতীয় নিবন্ধন

ইরানে পাপিয়ের-মাশে দুইবার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রাদেশিক পর্যায়ে নিবন্ধিত হয়েছে কাজভিন প্রদেশে ২০১২ খ্রিস্টাব্দ এবং ইসফাহান প্রদেশে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ।