জউ (বার্লি) দিয়ে তৈরি স্যুপ ওয়াগেরে’ এবং এর অতুলনীয় স্বাদ ও সুবাস
প্রথম দর্শনে হয়তো মনে হতে পারে, খাবারের প্রধান কাজ হলো শরীরের চাহিদা পূরণ করা এবং ক্ষুধা নিবারণ করা। কিন্তু বাস্তবে খাদ্য ও তার বিভিন্ন রূপের ভূমিকা এর চেয়েও অনেক বিস্তৃত। খাদ্য হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত জ্ঞান ও দক্ষতার ফল এবং এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন ধরনের খাবার এবং সেগুলো প্রস্তুতের পদ্ধতি ভৌগোলিক পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং এমনকি বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের প্রভাবেই গড়ে উঠেছে। কোনো অঞ্চলের খাবার ও তার প্রস্তুতপ্রণালি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে সেই অঞ্চলের ক্ষুদ্র সংস্কৃতি, মানুষের বিশ্বাস এবং ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। তাই খাদ্যকে একটি আধ্যাত্মিক ও অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যার অন্তরালে বহু প্রজন্মের সম্মিলিত জ্ঞান, শ্রম ও অভিজ্ঞতা নিহিত রয়েছে। এ কারণেই ইউনেস্কো খাদ্য ও খাদ্যসংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনকে মানবিক সংস্কৃতি ও পরিচয় বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জোভেইন গ্রামের ওয়াগেরে স্যুপ এমন একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার, যা প্রাকৃতিক ও জৈব উপাদান দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। সরল উপকরণে তৈরি হলেও এই খাবারটি সেমনান অঞ্চলের যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনধারার প্রতিফলন ঘটায়। ওয়াগেরে স্যুপ অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং যারা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য হতে পারে।
জোভেইন গ্রাম কোথায় অবস্থিত?
জোভেইন গ্রাম ইরানের সেমনান প্রদেশের সারখের (سرخه) অন্তর্গত একটি গ্রাম। এটি সারখে শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। পার্বত্য অঞ্চলে এবং জোভেইন নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় গ্রামটি অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। গ্রামটি আলবোরজ পর্বতমালার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় দুই হাজার মিটার। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এখানে যাযাবর জনগোষ্ঠীও বসবাস বা অবস্থান করে।
ওয়াগেরে স্যুপ এবং এর বৈশিষ্ট্য
জোভেইন অঞ্চলের যাযাবরদের মধ্যে ওয়াগেরে স্যুপ রান্নার প্রচলন রয়েছে। এই আশ রান্নার সময় এমন এক মনোমুগ্ধকর সুগন্ধ ছড়ায়, যা উপস্থিত সবার ক্ষুধা বাড়িয়ে তোলে। এই সুবাসের মূল উৎস হলো ‘ওয়াগেরে’ নামের একটি বিশেষ পাহাড়ি শাক, যার নাম অনুসারেই এই আশের নামকরণ করা হয়েছে।
ওয়াগেরে পাহাড়ের ঢালে জন্মানো একটি বুনো শাক, যার স্বাদে রয়েছে স্বতন্ত্র টকভাব। রান্নার সময় শাকটি সেদ্ধ হলে তার এই বিশেষ স্বাদ আশের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশে যায় এবং খাবারটিকে অসাধারণ সুস্বাদু করে তোলে।
শুধু ওয়াগেরে নয়, এই স্যুপে ব্যবহৃত অন্যান্য শাক-সবজি ও উপাদানও আশপাশের পাহাড়ের ঢালেই স্বাভাবিকভাবে জন্মায়। তাই এই স্যুপের প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে হলে জোভেইন গ্রামেই গিয়ে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। এতে যেমন স্থানীয় প্রাকৃতিক ও জৈব উপাদানে তৈরি খাবারের আসল স্বাদ পাওয়া যায়, তেমনি উপভোগ করা যায় অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি ও নয়নাভিরাম পাহাড়ি দৃশ্য।
ওয়াগেরে স্যুপ রান্নার প্রণালি
চারজনের জন্য ওয়াগেরে স্যুপ রান্না করতে নিম্নলিখিত উপকরণ লাগবে:
- হলুদ গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো, তেল ও লবণ পরিমাণমতো
- পেঁয়াজ ১টি
- স্যুপের শাক ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম
- সাদা আটা, মসুর ডাল এবং লোবিয়া (কালো চোখওয়ালা শিম) প্রতিটি আধা কাপ
স্যুপের শাকের মধ্যে থাকে পালং শাক বা বিটের পাতা, তরে (লিক), ধনেপাতা, পার্সলে, শুলফা (ডিল) এবং ওয়াগেরে শাক। এই শাকগুলো সমান পরিমাণে ব্যবহার করুন। তবে নিজের স্বাদ অনুযায়ী কোনো কোনো শাকের পরিমাণ সামান্য কম-বেশি করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো একটি শাক অতিরিক্ত ব্যবহার করলে খাবারের আসল স্বাদ পরিবর্তিত হতে পারে। রান্নার আগের রাতে লোবিয়া পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এই সময় কয়েকবার পানি বদলে দিলে এর গ্যাস সৃষ্টিকারী উপাদান দূর হয়ে যায়।
স্যুপ রান্নার পদ্ধতি খুবই সহজ। প্রথমে একটি হাঁড়ি অর্ধেক পর্যন্ত পানি দিয়ে ভরুন। তাতে লোবিয়া দিয়ে প্রায় ২০ মিনিট সিদ্ধ করুন। এরপর মসুর ডাল যোগ করে আরও ১৫ মিনিট রান্না করুন, যাতে ডালও সিদ্ধ হয়ে যায়। তারপর ডাল ও লোবিয়া ছেঁকে নিন।
এরপর হাঁড়িতে আবার অর্ধেক পর্যন্ত পানি দিন। পানি ফুটে উঠলে তাতে লোবিয়া ও কুচি করা শাক-সবজি যোগ করুন। এদিকে এগুলো ফুটতে থাকাকালীন একটি প্যানে তেলে পেঁয়াজ ভেজে নিন। পেঁয়াজ সোনালি রং ধারণ করলে তাতে হলুদ ও লবণ মিশিয়ে দিন। এরপর ভাজা পেঁয়াজ হাঁড়িতে ঢেলে দিন এবং আশটি ভালোভাবে সিদ্ধ হয়ে ঘন হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
এরপর সাদা আটা সামান্য ঠান্ডা পানির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন, যাতে কোনো দলা না থাকে এবং মিশ্রণটি সম্পূর্ণ মসৃণ হয়। রান্নার শেষ ১০ মিনিটে এই মিশ্রণটি আশে যোগ করুন, যাতে আশটি জেলির মতো হালকা ঘন ও মোলায়েম হয়।
কখনও কখনও ওয়াগেরে শাক অন্য শাকগুলোর সঙ্গে না দিয়ে আলাদাভাবে আশে যোগ করা হয়। সেক্ষেত্রে এটি পেঁয়াজ ভাজার সঙ্গে স্যুপে মেশানো হয়।
| জউ (বার্লি) দিয়ে তৈরি স্যুপ ওয়াগেরে’ এবং এর অতুলনীয় স্বাদ ও সুবাস | |
| সেমনান | |
| Soup snack and appetizer | |
| Registration |

