রীতি-প্রথা

কিজিলবাশদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সাংস্কৃতিক ও আচারগত উপাদান

লাল রঙের ব্যবহারই কিজিলবাশদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য।

গোলেস্তান প্রদেশ ইরানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এবং গোরগান এই প্রদেশের রাজধানী। আনুমানিক ১৮ লাখ মানুষ গোলেস্তান প্রদেশে বসবাস করেন।

এই প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের মধ্যে রয়েছে তুর্কমেন, কাজাখ, কিজিলবাশ, তাত এবং আরও অনেকে। গোলেস্তানের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত।

মজার বিষয় হলো, এই প্রদেশে পশুপালনের একটি বড় অংশ এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানও পালন করা হয়।

গোলেস্তান প্রদেশের জাতিগত বৈচিত্র্য এবং প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী জীবনধারার কারণে এখানে ৮০টিরও বেশি ঐতিহ্যকে জাতীয় পর্যায়ে এবং ২টি ঐতিহ্যকে বিশ্ব পর্যায়ে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে।

এর মধ্যে ছয়টি ঐতিহ্য কিজিলবাশ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো হলো—

  • দোতার বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বাজানোর দক্ষতা
  • নামাদ বা ফেল্ট তৈরির কারুশিল্প
  • ‘কালা-গাফে’ পুতুল তৈরির দক্ষতা
  • ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরির ও সেলাইয়ের দক্ষতা
  • কোমর-বি-কোমর সিনেজানি বা বুকে আঘাত করে শোক/ধর্মীয় আচার পালনের অনুষ্ঠান
  • কিজিলবাশদের হেনা-বান্দান বা মেহেদি লাগানোর ঐতিহ্য

এখানে আমরা কিজিলবাশদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিয়ে আলোচনা করব। এটি একটি সুন্দর ও বর্ণিল পোশাকধারা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কিজিলবাশ নারী ও পুরুষদের প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এবং পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।

বর্তমানে শহরাঞ্চলে এই পোশাকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কমে গেছে এবং মূলত উৎসব ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে। তবে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও যাযাবর জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এখনও এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করেন।

কিজিলবাশ জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে তুর্কি কিজিলবাশদের সাফাভিদের সামরিক বাহিনী গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে তারা সাফাভি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ থেকেই বোঝা যায়, কিজিলবাশরা বহু শতাব্দী ধরে যোদ্ধাসুলভ মনোভাব ও সাহসিকতার জন্য পরিচিত ছিল।

ধারণা করা হয়, সাফাভি শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম কয়েক দশকেই কিজিলবাশরা ইস্তারাবাদ (বর্তমান গোরগান) অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। বলা হয়, এই অঞ্চলে কিজিলবাশদের বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সীমান্তব্যবস্থা সুসংগঠিত করা এবং আক্রমণকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগ্রাসন প্রতিহত করা। প্রথমদিকে কিজিলবাশরা পার্বত্য এলাকায় বসবাস করত। তবে ধীরে ধীরে তারা অপেক্ষাকৃত সমতল অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে গোলেস্তান প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে রামিয়ান ও মিনুদাশত শহর ও আশপাশের এলাকাগুলোকে কিজিলবাশদের প্রধান বসতিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিজিলবাশদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক: পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক

কিজিলবাশরা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক ধারণা ও পরিচয় প্রকাশের জন্য বিভিন্ন উপাদানকে ব্যবহার করেছে। তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক তেমনই একটি উপাদান, যা সময়ের সঙ্গে কিজিলবাশদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

কিজিলবাশদের পোশাক দেখে তাদের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক শ্রেণি, বৈবাহিক অবস্থা এবং কনের দেনমোহরের পরিমাণ সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানা যায়। কিজিলবাশদের পোশাক মূলত রেশমের তৈরি এবং এতে লাল, কখনও কখনও বেগুনি রঙের ব্যবহার দেখা যায়। এই ধরনের পোশাক পরার কারণে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে তাদের ‘কাবুদজামেগান’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। কিজিলবাশদের মিনুদাশত অঞ্চলে বসবাসের কারণে অতীতে এই এলাকাটিকেও ‘কাবুদজামে’ নামে ডাকা হতো।

মুদ্রা-সেলাই, সূচিশিল্প এবং ফিতা বোনা কিজিলবাশদের পোশাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অলংকরণ। কিজিলবাশ নারীরাই সাধারণত পোশাকে এসব নকশা ও অলংকরণ করেন।

কিজিলবাশ নারীদের পোশাকের মধ্যে রয়েছে পোশাক বা কইনেক, কুচি দেওয়া লম্বা স্কার্ট বা তাম্মান, বিভিন্ন ধরনের জ্যাকেট যেমন কুলুচে ও বাহারে এবং অবিবাহিত মেয়েদের জন্য বিশেষ টুপি বা কুলতে। এর সঙ্গে থাকে ওড়না বা ইয়ালখ, পুঁতির দানা ও ছোট অলংকার দিয়ে তৈরি হার, সামনের পোশাকের অংশ এবং কপালবন্ধনী, যা নারীর বিবাহিত হওয়ার পরিচায়ক।

কিজিলবাশ নারীরা কোমরের চারপাশে ‘চারশু’ বা ‘চাদরশব’ বাঁধেন। এর একটি উদ্দেশ্য হলো কোমরকে আঘাত বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করা।

কিজিলবাশ পুরুষদের মধ্যেও লাল রঙের পোশাকের পাশাপাশি সাদা রঙের পোশাক পরার প্রচলন রয়েছে। এই পোশাককে ‘আক তাফতান’ বলা হয়, যার অর্থ ‘সাদা রেশম’।

ঝালরযুক্ত মাথার বাঁধন এবং রেশমের কোমরবন্ধ পুরুষদের পোশাকের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোমরবন্ধটি পিঠের দিকে গিঁট দিয়ে বাঁধা হয়। অতীতে কিজিলবাশদের প্রতিটি গোত্রের পুরুষেরা নির্দিষ্ট রঙের কোমরবন্ধ ব্যবহার করতেন। পুরুষদের রেশমের তৈরি পায়জামাকে ‘তাম্মান’ এবং পশমের তৈরি পায়জামাকে ‘চোখা’ বলা হয়। বছরের বিভিন্ন ঋতু অনুযায়ী এগুলোর ব্যবহার করা হয়।

কিজিলবাশ পুরুষেরা পায়ে ‘চারুক’ নামের এক ধরনের জুতা এবং পায়ের কাপড় পরতেন। সাধারণত খাড়া পাহাড়ি গিরিপথ দিয়ে চলাচলের সময় পা সুরক্ষিত রাখা এবং দীর্ঘ পথ হাঁটার সময় পায়ে যেন কষ্ট না হয়, সেজন্য এগুলো ব্যবহার করা হতো। মিনুদাশত ও রামিয়ান অঞ্চলে বসবাসকারী কিজিলবাশদের পোশাকের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে পোশাকের অলংকরণ এবং কিজিলবাশ নারীদের ব্যবহৃত মাথার বাঁধনের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য দেখা যায়।

কিজিলবাশদের পোশাক তৈরির নকশা তুলনামূলকভাবে সরল। পোশাকের গোল গলার নকশা এই সরলতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

কিজিলবাশদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের জাতীয় স্বীকৃতি

কিজিলবাশদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরির দক্ষতা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯৮ ফারসি সন) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়।