রীতি-প্রথা

চৌগান খেলাধুলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রাচীন ইরানি খেলা

চৌগান ইরানের ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত একটি ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি এমন একটি খেলা, যার ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত।

চৌগান শুধু একটি খেলাধুলা নয়, বরং এটি ইরানভূমির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতীক। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে এই খেলাটি জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে রয়েছে। এই খেলায় অশ্বারোহীর দক্ষতা এবং তার সঙ্গে ঘোড়ার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই কয়েক শতাব্দী ধরে শাসকেরা সৈন্যদের যুদ্ধের প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ হিসেবে চৌগানকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং এর প্রসার ঘটেছে।

চৌগান: ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ভূমিকা

কিছু ঐতিহাসিক নথি রয়েছে, যার ভিত্তিতে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে চৌগান খেলার উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে, অর্থাৎ হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের সময়ে। তবে বলা হয়, এই খেলাটির প্রাথমিক শিকড় এরও আগের সময়ে বিস্তৃত।

কয়েক শতাব্দী ধরে রাজারা চৌগান খেলাকে এতটাই গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়েছিলেন যে এটি রাজাদের খেলা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১২১৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানে মঙ্গোলদের আক্রমণের পর তারাও এই খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। মঙ্গোলরা চৌগান খেলাকে ভারতে নিয়ে যায়। ভারতেও, বিশেষ করে সুলতানদের দরবারে, চৌগান বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।

চৌগানের স্বর্ণযুগ হিসেবে সাধারণত সাফাভি যুগকে (খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দী) বিবেচনা করা হয়। এই সময় সাফাভি রাজারা সংগীত ও বর্ণনাকারীদের উপস্থিতিতে বড় বড় চৌগান প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন এবং নিজেরাও সেসব প্রতিযোগিতা দেখতে উপস্থিত থাকতেন।

আপনি যদি ইসফাহানে ভ্রমণ করেন, তাহলে সাফাভি আমলে ইসফাহানের নকশে জাহান (ইমাম খোমেইনি) চত্বরে অবস্থিত চৌগান মাঠের প্রবেশদ্বারের কিছু নিদর্শন এখনও দেখতে পাবেন। সে সময় ইরান ভ্রমণকারী পর্যটক ও ভ্রমণলেখকেরা সাহসিকতার সঙ্গে চৌগানের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ইরানি অশ্বারোহীদের প্রশংসা করেছেন।

ভারত দখলের পর ব্রিটিশরা এই খেলার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং পরবর্তীতে এটিকে ইউরোপে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। তখনও এই খেলাটিকে পোলো (Polo) নামে ডাকা হতো না। কলকাতা ও দিল্লির পুরোনো ক্লাব ভবনগুলোর প্রবেশপথে আজও কোথাও কোথাও চৌগান নামটি দেখা যায়। পোলো ছিল একটি গাছের নাম। সেই গাছের শিকড় থেকে চৌগানের বল তৈরি করা হতো। ধীরে ধীরে সহজ উচ্চারণের কারণে ইংরেজদের মধ্যে এই নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং প্রচলিত নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

১৮৬০-এর দশক থেকে ইংল্যান্ডে চৌগান ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিশ্বের ৭৫টিরও বেশি দেশে চৌগান প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। খেলাটির বিস্তার এতটাই ব্যাপক হয়েছিল যে আধুনিক অলিম্পিকের সূচনালগ্ন থেকেই ১৮৯৬ সাল থেকে এটি অলিম্পিকের একটি খেলা ছিল। তবে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের পর চৌগান অলিম্পিক থেকে বাদ পড়ে।

চৌগানের শিকড় ও এর কার্যাবলি

ইরানিরা ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার পর একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। চৌগান খেলাটির উদ্ভাবনও ইরানিদের অন্যতম অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি এমন একটি খেলা, যেখানে মানুষ ও ঘোড়া একসঙ্গে সমন্বিত হয়ে প্রতিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে জয়লাভের চেষ্টা করে।

এই খেলাটি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল। আজও চৌগানে ব্যবহৃত অনেক পরিভাষা সামরিক পরিভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত করে যে চৌগানের প্রবর্তকেরা এই খেলার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য অনুসরণ করেছিলেন।

এই খেলা অশ্বারোহীর শারীরিক দক্ষতা ও ঘোড়ার সঙ্গে তার সমন্বয় বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ঘোড়ার সক্ষমতাও বাড়ায়। ফলে ঘোড়া বিভিন্ন বাধার সামনে আরও নমনীয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে শেখে। যে ঘোড়া চৌগানের মাঠে খেলেছে, যুদ্ধ ও আক্রমণের সময় সে প্রতিপক্ষকে ভয় পাবে না এবং অশ্বারোহীর নির্দেশও ভালোভাবে পালন করবে।

কিছু গ্রিক ঐতিহাসিক গ্রন্থে ইরানি সৈন্যদের মধ্যে চৌগান খেলার প্রচলনের উল্লেখ রয়েছে এবং ইরানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দেশ জয়ের সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবেও এটিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফারসি সাহিত্যেও চৌগান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এমন ইরানি সাহিত্যিক খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি তাঁর কবিতা বা লেখায় চৌগানের কোনো উল্লেখ করেননি। গীতিকবিতা ও বীরগাথামূলক সাহিত্যের পাশাপাশি লোকসাহিত্যেও এই খেলার বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। এছাড়াও মিনিয়েচার চিত্রকলাসহ অন্যান্য শিল্পেও চৌগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চৌগান খেলা সম্পর্কিত অসংখ্য মিনিয়েচার চিত্রের উদাহরণ পাওয়া যায়।

চৌগান খেলার পদ্ধতি

চৌগান সাধারণত ২৭৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪৫ মিটার প্রস্থের একটি মাঠে খেলা হয়। তবে কিছু দেশে মাঠের এই মাপ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

খেলাটি ছয়টি পর্বে (চৌকে) অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি পর্বের সময়কাল সাত মিনিট। প্রতিটি দলে চারজন করে খেলোয়াড় থাকে।

প্রতিটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য দুইজন সহকারী রেফারি ও একজন প্রধান রেফারি থাকেন। প্রধান রেফারিরা ঘোড়ায় চড়ে মাঠের বিভিন্ন অংশে চলাচল করেন।

এই খেলায় দুই দল অশ্বারোহী খেলোয়াড় একটি বল প্রতিপক্ষের গোললাইনের মধ্য দিয়ে পাঠানোর চেষ্টা করেন। যে দল বেশি পয়েন্ট অর্জন করতে পারে, সেই দল বিজয়ী হয়।

বর্তমানে বল ব্যবহার করে খেলা হয় এমন প্রায় সব খেলাতেই এই ধরনের কাঠামো দেখা যায়। এ কারণে চৌগানকে এমন একটি খেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার কাঠামো পরবর্তীকালের বহু বলভিত্তিক খেলাকে প্রভাবিত করেছে।

চৌগানের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন

চৌগান: সংগীত ও বর্ণনাসহ অশ্বারোহী খেলা শিরোনামের ঐতিহ্যটি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯৪ ফারসি সন) ইরানের নামে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।